জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কেন লড়ছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ১০
পাক-আফগান সীমান্তে দুই পাকিস্তানী সেনা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় যেন দুই ভাই পিঠাপিঠি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই দুই ভাইয়ের মধ্যে গত সাত দশক ধরে যে সম্পর্ক মোটেই ভাল যাচ্ছে না। এক কথায় সেই ইতিহাসকে বলা যায় রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস। রোববারের (২২ ফেব্রুয়ারি) বিমান হামলা আর ১৭ জন মানুষের মৃত্যু সেই পুরনো আগুনেই নতুন করে ঘি ঢেলেছে। কিন্তু কেন এই লড়াই? কেন একসময়ের ‘বন্ধু’রা আজ একে অপরের দিকে যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে?

একটি দাগ ও দুই দেশের জেদ

সবকিছুর শুরু ব্রিটিশ আমলে। ১৮৯৩ সালে স্যার মর্টিমার ডুরান্ড কলমের এক খোঁচায় পাহাড়ের বুক চিরে একটি সীমানা এঁকে দেন, যা আজ ‘ডুরান্ড লাইন’। এই দাগটি একটি পশতু জনগোষ্ঠীকে দুই টুকরো করে দেয়। এক অংশ পড়ে আফগানিস্তানে, অন্য অংশ এখনকার পাকিস্তানে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান একে সীমান্ত হিসেবে মানলেও আফগানিস্তান কোনোদিন তা মনে নেয়নি। তাদের মতে, এটা তাদের পশতু ভাইদের আলাদা করার এক ষড়যন্ত্র। এই এক ‘দাগ’ নিয়ে জেদই হচ্ছে সব ঝগড়ার গোড়া।

সোভিয়েত হাওয়া ও ‘মুজাহিদিন’ কারখানা

আসল নাটক শুরু হয় ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করল। পাকিস্তান ভয় পেল। এরপর হয়তো রাশিয়ার নজর পড়বে পাকিস্তানের সমুদ্রের ওপর। তখন পাকিস্তান আমেরিকার টাকায় হাজার হাজার ‘মুজাহিদিন’ বা ধর্মযোদ্ধা তৈরি করল।

পাকিস্তান তখন আফগান শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দিল। মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় যুদ্ধের পাঠ দেওয়া হলো। কিন্তু পাকিস্তান বুঝতে পারেনি, যে বন্দুক তারা রাশিয়ার দিকে তাক করতে শিখিয়েছে, একদিন সেই বন্দুকের নল ঘুরে যাবে নিজেদের দিকেই।

তালেবান: বন্ধু যখন শত্রু

নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানে যখন গৃহযুদ্ধ তুঙ্গে, তখন পাকিস্তান ‘তালেবান’ নামক এক ছাত্রগোষ্ঠীকে সমর্থন দিল। উদ্দেশ্য ছিল, কাবুলে এমন এক সরকার রাখা যারা পাকিস্তানের কথা শুনবে। কিন্তু ২০০১ সালের ৯/১১-র পর আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা করল। পাকিস্তান ভয়ে আমেরিকার বন্ধু হয়ে গেল।

এই ‘ডিগবাজি’ বা বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারল না একদল জঙ্গি। তারা পাকিস্তানেই তৈরি করল টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান)। তারা বলল, ‘পাকিস্তান কেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে আমেরিকার হয়ে লড়ছে?’ এরপর শুরু হলো পাকিস্তানের ভেতরে ভয়াবহ রক্তক্ষরণ—স্কুলে হামলা, মসজিদে বিস্ফোরণ।

আজকের সংকট: ‘উপকার’ যখন কাল হলো

২০২১ সালে তালেবান আবার কাবুলে ফিরল। পাকিস্তান ভেবেছিল এবার শান্তিতে ঘুমানো যাবে। কিন্তু হলো উল্টো। আফগান তালেবান এখন আর পাকিস্তানের হুকুম মানতে রাজি নয়। তারা ডুরান্ড লাইনের কাঁটাতার উপড়ে ফেলছে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা—পাকিস্তান বলছে, টিটিপি জঙ্গিরা আফগানিস্তানে লুকিয়ে থেকে পাকিস্তানে হামলা করছে।

গত রবিবার পাকিস্তান যখন বিমান পাঠিয়ে বার্তা দিল যে—‘তোমরা আমাদের ঘরে ঢুকে মারলে আমরাও তোমাদের ছেড়ে দেব না।’ অন্যদিকে তালেবানের মেজাজ এখন তুঙ্গে। তারা একে সার্বভৌমত্বের অপমান হিসেবে দেখছে।

গত রবিবারের বিমান হামলা কোনো আকস্মিক উত্তেজনা নয়। এটি মূলত গত ২০ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা অবিশ্বাসের এক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। যে তালেবানকে পাকিস্তান একসময় নিজের ‘রণকৌশলগত সম্পদ’ মনে করত, আজ তারাই পাকিস্তানের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। এই নাটকীয় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বুঝতে হলে আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করতে হবে।

‘ডবল গেম’ এবং টিটিপির জন্ম (২০০১ - ২০০৭)

৯/১১ হামলার পর পাকিস্তান এক অদ্ভুত সংকটে পড়ে। একদিকে তারা আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে’র সঙ্গী হয়, অন্যদিকে তারা গোপনে আফগান তালেবান নেতাদের আশ্রয় দিতে থাকে। পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল—আমেরিকা চলে যাওয়ার পর যেন আফগানিস্তানে তাদের অনুগত তালেবানরা ক্ষমতায় ফেরে।

কিন্তু এই ‘দ্বিমুখী নীতি’র মধ্যেই জন্ম নেয় এক বিষাক্ত সাপ। একদল পাকিস্তানি কট্টরপন্থী ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলল— "পাকিস্তান কেন মুসলিম ভাইদের (আফগান তালেবান) বিরুদ্ধে আমেরিকাকে সাহায্য করছে?" এই ক্ষোভ থেকেই ২০০৭ সালে গঠিত হয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) । তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা। শুরু হয় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ।

২০ বছরের আশ্রয় ও ‘অকৃতজ্ঞতা’র বীজ (২০০৭ - ২০২১)

গত দুই দশক ধরে আফগান তালেবান যখন ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, তখন পাকিস্তান তাদের জন্য ছিল নিরাপদ আশ্রয়। পাকিস্তান ভেবেছিল, তালেবান যখন আবার ক্ষমতায় ফিরবে, তারা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ টিটিপি-কে দমন করবে এবং আফগান মাটিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না।

কিন্তু ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান যখন কাবুল দখল করল, তখনই পাশার দান উল্টে গেল। ক্ষমতায় বসার পরই আফগান তালেবান তাদের জেলখানাগুলো খুলে দেয়। সেখান থেকে মুক্তি পায় হাজার হাজার টিটিপি জঙ্গি। পাকিস্তান বুঝতে পারল, তাদের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ করা ‘বন্ধুরা’ আসলে তাদের শত্রু, মানে টিটিপিকে বুকে টেনে নিয়েছে।

বর্তমান সংঘাতের মূল বিন্দু: কেন এই রক্তক্ষয়

২০২১-এর পর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কে চিড় ধরার মূল কারণ তিনটি:

টিটিপি-র অভয়ারণ্য: আফগান তালেবান এখন টিটিপি-কে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘দরকষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তান বারবার প্রমাণ দিচ্ছে যে, টিটিপি আফগানিস্তানে বসে হামলার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু তালেবান তা অস্বীকার করছে।

ডুরান্ড লাইন ও সার্বভৌমত্ব: ক্ষমতায় বসার পর তালেবানের মধ্যে কট্টর জাতীয়তাবাদ জেগে উঠেছে। তারা এখন আর পাকিস্তানের অনুগত হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা ডুরান্ড লাইনের কাঁটাতারের বেড়া উপড়ে ফেলছে। একে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে মানতে অস্বীকার করছে।

সীমান্ত সংঘর্ষ ও বিমান হামলা: ২০২২ সাল থেকেই ছোটখাটো সংঘর্ষ চলছিল। কিন্তু ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদ ও বাজাউরে বড় ধরণের আত্মঘাতী হামলার পর পাকিস্তান চরম ধৈর্য হারায়। গত রবিবারের বিমান হামলা ছিল পাকিস্তানের তরফ থেকে একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা— ‘তোমরা যদি আমাদের ঘর পুড়িয়ে দাও, আমরা তোমাদের ঘরে এসে জবাব দেব।’

সাপ ও ওঝার গল্প

একসময় পাকিস্তান যে তালেবানকে ‘সাপ’ হিসেবে পুষেছিল অন্যকে কামড় দেওয়ার জন্য, আজ সেই সাপই ওঝাকে কামড়াতে শুরু করেছে। আফগান তালেবান এখন এক স্বাধীন সত্তা। তারা আর পাকিস্তানের হুকুম মানে না। অন্যদিকে টিটিপি এখন আফগান তালেবানের আশ্রয়ে থেকে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার নীল নকশা সাজাচ্ছে।

রবিবারের ১৭টি লাশ শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি সতর্ক সংকেত যে—এই দুই প্রতিবেশীর ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। সংলাপের টেবিল যতক্ষণ না কার্যকর হবে, ততক্ষণ ডুরান্ড লাইনের দুই পাশেই লাশের মিছিল কেবল দীর্ঘই হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত