জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কীভাবে পরিচালিত হয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক

আগামী ১২ মার্চ অথবা এর দু-একদিন আগেই বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। গতকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নতুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নানা দিক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আসন্ন এই অধিবেশনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও শোক প্রস্তাবও সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ কেবল আইন তৈরির জায়গা নয়; বরং সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

এই সংসদ আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়? সেখানে কী আলোচনা হয়, কে সিদ্ধান্ত নেন এবং আইন পাসের প্রক্রিয়াই বা কেমন?

সংসদ পরিচালনার মূল কান্ডারি কে

রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তিনি এই কাজ করেন। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসতে হয়। বছরে সাধারণত তিনটি অধিবেশন বসে।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন স্পিকার। তিনি সংসদের অভিভাবক ও সভাপতি। সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। অধিবেশন কক্ষে কে কথা বলবেন, কতক্ষণ বলবেন এবং কোন বিষয় আলোচনার জন্য গৃহীত হবে—সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন স্পিকার। নিয়ম অনুযায়ী, স্পিকারকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।

স্পিকারের ডানদিকে সরকারি দলের সদস্যরা এবং বামদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বসেন। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, স্পিকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্যই অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে পারেন না। তাঁর প্রধান দায়িত্ব হলো সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ভোটাভুটি ও বিল পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার এই দায়িত্ব পালন করেন।

আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া: বিল থেকে আইনে রূপান্তর

সংসদের অন্যতম প্রধান কাজ হলো নতুন আইন তৈরি করা বা পুরনো আইন সংশোধন করা। আইনের যেকোনো খসড়া বা প্রস্তাবকে বলা হয় ‘বিল’। একটি বিল আইনে পরিণত হতে তিনটি ধাপ বা ‘রিডিং’ পার করতে হয়। প্রথম ধাপে বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে বিলের ওপর বিস্তারিত আলোচনা, যাচাই-বাছাই এবং সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অনেক সময় বিল অধিকতর পরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তৃতীয় ও শেষ ধাপে বিল পাসের জন্য ভোটে দেওয়া হয়। সংসদে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিল পাস হলে তা রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি সই করার পর সেটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে আইনে পরিণত হয়।

সরকারের জবাবদিহি ও প্রশ্নোত্তর পর্ব

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার বা নির্বাহী বিভাগ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম হলো ‘প্রশ্নোত্তর পর্ব’। সংসদ অধিবেশনের প্রতিটি কার্যদিবসের প্রথম ঘণ্টা এই পর্বের জন্য বরাদ্দ থাকে। এ সময় সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কাছে বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। মন্ত্রীরা সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে বাধ্য থাকেন। এর মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং জনগণের সমস্যার কথা সরাসরি সরকারের নজরে আনা যায়। এছাড়াও জরুরি কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জাতীয় সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য সদস্যরা ‘মুলতবি প্রস্তাব’ আনতে পারেন, যা নিয়মিত কার্যসূচি স্থগিত রেখে আলোচনার সুযোগ করে দেয়।

বাজেট ও অর্থ নিয়ন্ত্রণ

সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের অনুমোদন ছাড়া সরকার জনগণের কাছ থেকে কোনো কর আদায় করতে পারে না বা এক পয়সাও খরচ করতে পারে না। প্রতি বছর জুন মাসে অর্থমন্ত্রী যে জাতীয় বাজেট পেশ করেন, তা সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর পাস হতে হয়। বাজেট বা অর্থ সংক্রান্ত বিলগুলো কেবল রাষ্ট্রপতির সুপারিশক্রমে মন্ত্রীরাই উত্থাপন করতে পারেন, যা ‘অর্থ বিল’ নামে পরিচিত। এই ক্ষেত্রে সংসদের ক্ষমতাই চূড়ান্ত।

সংসদীয় কমিটি: সংসদের চোখ ও কান

সংসদ কেবল অধিবেশন কক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। এর কাজের একটি বিশাল অংশ সম্পাদিত হয় বিভিন্ন ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র মাধ্যমে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করার জন্য সংসদ সদস্যদের নিয়ে ছোট ছোট কমিটি থাকে। এগুলোকে বলা হয় সংসদের ‘চোখ ও কান’। এই কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এবং সংসদে প্রতিবেদন পেশ করে। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আসে।

ভোটাভুটি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ

সংসদে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত উপায় হলো ভোট। কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে স্পিকার সদস্যদের মতামত জানতে চান। সাধারণত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ধ্বনি ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। তবে সাধারণ বিল পাসের জন্য উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটই যথেষ্ট। কোরাম পূর্ণ হতে বা অধিবেশন চালাতে হলে অন্তত ৬০ জন সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

জাতীয় সংসদ হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। ৩০০ জন নির্বাচিত এবং ৫০ জন সংরক্ষিত নারী সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এই ৩৫০ জনের আইনসভা কেবল বিতর্কের মঞ্চ নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচন, অধ্যাদেশ অনুমোদন এবং শোক প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু হবে, তা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত