আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার
এইচআরসিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি) আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।
আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনার

গত নভেম্বরে পাকিস্তানের দক্ষিণ পাঞ্জাবের ভাওয়ালপুর শহরে জুবায়দা বিবির বাড়িতে হানা দেয় একদল সশস্ত্র পুলিশ। তারা আলমারির নগদ টাকা থেকে শুরু করে মেয়ের বিয়ের গয়না ও যৌতুকের সরঞ্জাম পর্যন্ত সব লুটে নেয়। ধরে নিয়ে যায় জুবায়দার তিন ছেলেকে। পরের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় কথিত ‘পুলিশ এনকাউন্টারে’ জুবায়দার পরিবারের পাঁচজন সদস্য মারা যান।
জুবায়দার তিন ছেলে ইমরান, ইরফান ও আদনানের বয়স ছিল যথাক্রমে ২৫, ২৩ ও ১৮ বছর। বাকি দুজন ছিলেন তাঁর মেয়ের জামাই। জুবায়দা বিবির এই হাহাকার আজ পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পাঞ্জাব বর্তমানে বন্দুকযুদ্ধের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অফ পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি) আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। গত বছরের এপ্রিলে এই বিশেষ ইউনিট গঠনের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র আট মাসে তারা অন্তত ৬৭০টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় ৯২৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জুবায়দা বিবি এই নির্মমতার বিচার চেয়ে আদালতে পিটিশন দাখিল করেছিলেন। তবে পুলিশ পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, এই মামলা তুলে না নিলে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাঁর স্বামী আব্দুল জব্বার দাবি করেছেন, তাঁর সন্তানদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের ‘সেফ পাঞ্জাব’ বা নিরাপদ পাঞ্জাব গড়ার স্বপ্নের অংশ হিসেবে সিসিডি গঠিত হয়। এই বাহিনী মূলত দুর্ধর্ষ অপরাধী ও আন্তঃজেলা ডাকাত দল দমনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। নিয়মিত পুলিশ যাদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খায়, তাদের দমনেই এই বিশেষায়িত বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে এই বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো প্রদেশজুড়ে বন্দুকযুদ্ধের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। মাত্র আট মাসে ৯০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে মাত্র দুজন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৬ জন।
বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই প্রাণহানির সংখ্যা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল পুরো বছরজুড়ে পাঞ্জাব ও সিন্ধু মিলিয়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ৩৪১ জন। অথচ সিসিডি একাই মাত্র আট মাসে সেই সংখ্যাকে দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে লাহোরে। এর পরেই আছে ফয়সালাবাদ ও শেখুপুরার নাম। নিহতদের মধ্যে ৩৬৬ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও সশস্ত্র লুটের অভিযোগ ছিল। ১১৪ জনের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত মামলা এবং ৯৯ জনের নামে হত্যা মামলা ছিল।
মানবাধিকার কমিশন একাধিক পুলিশ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখেছে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বয়ান প্রায় একই। প্রতিটি ঘটনায় সিসিডি দল দাবি করে তারা সন্দেহভাজনদের পথে আটকেছে। সন্দেহভাজনরা সাধারণত মোটরসাইকেলে থাকে এবং রাতের আঁধারে তাদের গতিবিধি রহস্যময় বলে দাবি করা হয়। পুলিশ আটকাতে গেলে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং প্রথমে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার খাতিরে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে অপরাধীদের মৃত্যু হয়। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অন্য সহযোগীরা পালিয়ে যায়।
এইচআরসিপি পুলিশের এই সব এজাহারের (এফআইআর) ভাষায় অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে গুলিতে আহত ব্যক্তি মৃত্যুর ঠিক আগে নিজের নাম-ধাম ও অপরাধের ইতিহাস পুলিশের কাছে গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। বিভিন্ন জেলা ও ভিন্ন ভিন্ন তারিখের রিপোর্টে হুবহু একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। যা প্রমাণ করে পুলিশ সুনির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার বদলে একই ধরনের বয়ান বারবার ‘কপি-পেস্ট’ করছে। পুলিশের তরফ থেকে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে নিহতের অপরাধের ওপর জোর দেওয়া হলেও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য থাকে না।
লাহোরভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল দীর্ঘদিন ধরে বন্দুকযুদ্ধের মামলা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ বারবার দাবি করেছেন পাঞ্জাবে অপরাধের হার কমেছে। জামালের মতে, বন্দুকযুদ্ধের এইসব ঘটনা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত। সরকার মনে করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে যদি অপরাধ কমানো যায় তবে সেই কাজ আইনত বৈধ। তারা তদন্তের মান উন্নয়ন বা ফরেনসিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার চেয়ে সংক্ষিপ্ত পথে অপরাধী নিধনকেই শ্রেয় মনে করছে।
বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণেই মানুষ এমন সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির ওপর ভরসা করতে শুরু করেছে। আদালতের বিলম্ব সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। ফলে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অন্যায় পথকে বৈধতা দিতে শুরু করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঞ্জাব পুলিশের এক কর্মকর্তা
সিসিডি অবশ্য আদালতের কাছে তাদের অভিযানের পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছে। তারা দাবি করেছে গত বছরের তুলনায় সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ ৬০ শতাংশ কমেছে। ডাকাতির সাথে জড়িত খুনের ঘটনাও একই হারে হ্রাস পেয়েছে। বাহিনীটি মনে করে তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে ভয়ংকর সব গ্যাং বা ডাকাত দলকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তারা এইচআরসিপির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে এই কমিশনের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
মানবাধিকার কমিশনের দাবি হলো অপরাধ কমার চেয়ে পদ্ধতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে অপরাধ দমন করবে সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। অপরাধীকে তদন্ত ও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে নাকি সরাসরি গুলি করে মারা হবে সেটি পাঞ্জাব রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর নির্ভর করে। অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে ময়নাতদন্তের আগেই তাদের জোর করে লাশ দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
এইচআরসিপি পাঞ্জাব পুলিশের কাছে এনকাউন্টারের পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য চেয়ে কোনো সাড়া পায়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রাদেশিক মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাতের আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। আল জাজিরাও এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী আজমা বোখারি ও সিনিয়র মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেবের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। পাঞ্জাব পুলিশের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণেই মানুষ এমন সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির ওপর ভরসা করতে শুরু করেছে। আদালতের বিলম্ব সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। ফলে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অন্যায় পথকে বৈধতা দিতে শুরু করে।
বিগত এক দশকে পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ হাজার বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পাঞ্জাব একাই প্রায় দুই হাজার হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাবে প্রতি বছর গড়ে ৪০০ জনের বেশি মানুষ এমন যুদ্ধে মারা গেছেন। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে এই গ্রাফ হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আইনজীবী রিদা হোসাইন মনে করেন এই বন্দুকযুদ্ধ মূলত ঔপনিবেশিক আমলের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ। এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে নিছক প্রজা বা বস্তু হিসেবে গণ্য করা হয়।
পাঞ্জাব সরকার এই নিষ্ঠুরতাকে ‘জিরো ক্রাইম’ বা অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার পথ হিসেবে প্রচার করছে। রিদা হোসাইনের মতে এটি আসলে রাষ্ট্রীয় মদদে অপরাধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার নামান্তর। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা কেবল অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজ যাদের অপরাধী বলে মারা হচ্ছে কাল হয়তো ভিন্নমতাবলম্বী বা নিরীহ পথচারীরাও সেই তালিকায় যুক্ত হবে। দোষী সাব্যস্ত করার দায়িত্ব আদালতের। পুলিশ যদি নিজেই বিচারকের ভূমিকা নেয় তবে পুরো আইনি ব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পাঞ্জাবের এই চিত্র কেবল পাকিস্তানের সমস্যা নয়। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক সতর্কবার্তা। বন্দুকের নল দিয়ে শান্তি আনার চেষ্টা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজে চরম অস্থিরতা ও অবিচারের জন্ম দেয়। জুবায়দা বিবির মতো মায়েদের চোখের জল আর পাঞ্জাবের বারুদের গন্ধ মিলেমিশে যে ইতিহাস তৈরি হচ্ছে তা এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত করছে। শৃঙ্খলার নামে জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। এইচআরসিপির প্রতিবেদন তাই কেবল অভিযোগ নয় বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক করুণ আর্তনাদ।

গত নভেম্বরে পাকিস্তানের দক্ষিণ পাঞ্জাবের ভাওয়ালপুর শহরে জুবায়দা বিবির বাড়িতে হানা দেয় একদল সশস্ত্র পুলিশ। তারা আলমারির নগদ টাকা থেকে শুরু করে মেয়ের বিয়ের গয়না ও যৌতুকের সরঞ্জাম পর্যন্ত সব লুটে নেয়। ধরে নিয়ে যায় জুবায়দার তিন ছেলেকে। পরের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় কথিত ‘পুলিশ এনকাউন্টারে’ জুবায়দার পরিবারের পাঁচজন সদস্য মারা যান।
জুবায়দার তিন ছেলে ইমরান, ইরফান ও আদনানের বয়স ছিল যথাক্রমে ২৫, ২৩ ও ১৮ বছর। বাকি দুজন ছিলেন তাঁর মেয়ের জামাই। জুবায়দা বিবির এই হাহাকার আজ পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পাঞ্জাব বর্তমানে বন্দুকযুদ্ধের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অফ পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি) আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। গত বছরের এপ্রিলে এই বিশেষ ইউনিট গঠনের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র আট মাসে তারা অন্তত ৬৭০টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় ৯২৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জুবায়দা বিবি এই নির্মমতার বিচার চেয়ে আদালতে পিটিশন দাখিল করেছিলেন। তবে পুলিশ পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, এই মামলা তুলে না নিলে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাঁর স্বামী আব্দুল জব্বার দাবি করেছেন, তাঁর সন্তানদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের ‘সেফ পাঞ্জাব’ বা নিরাপদ পাঞ্জাব গড়ার স্বপ্নের অংশ হিসেবে সিসিডি গঠিত হয়। এই বাহিনী মূলত দুর্ধর্ষ অপরাধী ও আন্তঃজেলা ডাকাত দল দমনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। নিয়মিত পুলিশ যাদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খায়, তাদের দমনেই এই বিশেষায়িত বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে এই বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো প্রদেশজুড়ে বন্দুকযুদ্ধের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। মাত্র আট মাসে ৯০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে মাত্র দুজন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৬ জন।
বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই প্রাণহানির সংখ্যা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল পুরো বছরজুড়ে পাঞ্জাব ও সিন্ধু মিলিয়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ৩৪১ জন। অথচ সিসিডি একাই মাত্র আট মাসে সেই সংখ্যাকে দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে লাহোরে। এর পরেই আছে ফয়সালাবাদ ও শেখুপুরার নাম। নিহতদের মধ্যে ৩৬৬ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও সশস্ত্র লুটের অভিযোগ ছিল। ১১৪ জনের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত মামলা এবং ৯৯ জনের নামে হত্যা মামলা ছিল।
মানবাধিকার কমিশন একাধিক পুলিশ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখেছে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বয়ান প্রায় একই। প্রতিটি ঘটনায় সিসিডি দল দাবি করে তারা সন্দেহভাজনদের পথে আটকেছে। সন্দেহভাজনরা সাধারণত মোটরসাইকেলে থাকে এবং রাতের আঁধারে তাদের গতিবিধি রহস্যময় বলে দাবি করা হয়। পুলিশ আটকাতে গেলে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং প্রথমে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার খাতিরে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে অপরাধীদের মৃত্যু হয়। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অন্য সহযোগীরা পালিয়ে যায়।
এইচআরসিপি পুলিশের এই সব এজাহারের (এফআইআর) ভাষায় অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে গুলিতে আহত ব্যক্তি মৃত্যুর ঠিক আগে নিজের নাম-ধাম ও অপরাধের ইতিহাস পুলিশের কাছে গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। বিভিন্ন জেলা ও ভিন্ন ভিন্ন তারিখের রিপোর্টে হুবহু একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। যা প্রমাণ করে পুলিশ সুনির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার বদলে একই ধরনের বয়ান বারবার ‘কপি-পেস্ট’ করছে। পুলিশের তরফ থেকে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে নিহতের অপরাধের ওপর জোর দেওয়া হলেও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য থাকে না।
লাহোরভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল দীর্ঘদিন ধরে বন্দুকযুদ্ধের মামলা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ বারবার দাবি করেছেন পাঞ্জাবে অপরাধের হার কমেছে। জামালের মতে, বন্দুকযুদ্ধের এইসব ঘটনা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত। সরকার মনে করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে যদি অপরাধ কমানো যায় তবে সেই কাজ আইনত বৈধ। তারা তদন্তের মান উন্নয়ন বা ফরেনসিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার চেয়ে সংক্ষিপ্ত পথে অপরাধী নিধনকেই শ্রেয় মনে করছে।
বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণেই মানুষ এমন সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির ওপর ভরসা করতে শুরু করেছে। আদালতের বিলম্ব সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। ফলে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অন্যায় পথকে বৈধতা দিতে শুরু করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঞ্জাব পুলিশের এক কর্মকর্তা
সিসিডি অবশ্য আদালতের কাছে তাদের অভিযানের পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছে। তারা দাবি করেছে গত বছরের তুলনায় সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ ৬০ শতাংশ কমেছে। ডাকাতির সাথে জড়িত খুনের ঘটনাও একই হারে হ্রাস পেয়েছে। বাহিনীটি মনে করে তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে ভয়ংকর সব গ্যাং বা ডাকাত দলকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তারা এইচআরসিপির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে এই কমিশনের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
মানবাধিকার কমিশনের দাবি হলো অপরাধ কমার চেয়ে পদ্ধতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে অপরাধ দমন করবে সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। অপরাধীকে তদন্ত ও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে নাকি সরাসরি গুলি করে মারা হবে সেটি পাঞ্জাব রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর নির্ভর করে। অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে ময়নাতদন্তের আগেই তাদের জোর করে লাশ দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
এইচআরসিপি পাঞ্জাব পুলিশের কাছে এনকাউন্টারের পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য চেয়ে কোনো সাড়া পায়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রাদেশিক মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাতের আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। আল জাজিরাও এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী আজমা বোখারি ও সিনিয়র মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেবের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। পাঞ্জাব পুলিশের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণেই মানুষ এমন সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির ওপর ভরসা করতে শুরু করেছে। আদালতের বিলম্ব সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। ফলে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অন্যায় পথকে বৈধতা দিতে শুরু করে।
বিগত এক দশকে পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ হাজার বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পাঞ্জাব একাই প্রায় দুই হাজার হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাবে প্রতি বছর গড়ে ৪০০ জনের বেশি মানুষ এমন যুদ্ধে মারা গেছেন। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে এই গ্রাফ হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আইনজীবী রিদা হোসাইন মনে করেন এই বন্দুকযুদ্ধ মূলত ঔপনিবেশিক আমলের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ। এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে নিছক প্রজা বা বস্তু হিসেবে গণ্য করা হয়।
পাঞ্জাব সরকার এই নিষ্ঠুরতাকে ‘জিরো ক্রাইম’ বা অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার পথ হিসেবে প্রচার করছে। রিদা হোসাইনের মতে এটি আসলে রাষ্ট্রীয় মদদে অপরাধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার নামান্তর। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা কেবল অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজ যাদের অপরাধী বলে মারা হচ্ছে কাল হয়তো ভিন্নমতাবলম্বী বা নিরীহ পথচারীরাও সেই তালিকায় যুক্ত হবে। দোষী সাব্যস্ত করার দায়িত্ব আদালতের। পুলিশ যদি নিজেই বিচারকের ভূমিকা নেয় তবে পুরো আইনি ব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পাঞ্জাবের এই চিত্র কেবল পাকিস্তানের সমস্যা নয়। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক সতর্কবার্তা। বন্দুকের নল দিয়ে শান্তি আনার চেষ্টা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজে চরম অস্থিরতা ও অবিচারের জন্ম দেয়। জুবায়দা বিবির মতো মায়েদের চোখের জল আর পাঞ্জাবের বারুদের গন্ধ মিলেমিশে যে ইতিহাস তৈরি হচ্ছে তা এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত করছে। শৃঙ্খলার নামে জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। এইচআরসিপির প্রতিবেদন তাই কেবল অভিযোগ নয় বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক করুণ আর্তনাদ।

বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই শপথ বাক্য পাঠ করান। বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।
২ দিন আগে
মন্ত্রিসভায় কীভাবে টেকনোক্র্যাট নেওয়া হয়, কারা এরা, আর ঠিক কী কারণেই ভোটের লড়াইয়ে না নামা এই ব্যক্তিরা হয়ে ওঠেন সরকারপ্রধানের তুরুপের তাস—এমন হাজারো প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
৩ দিন আগে
সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট বড় ব্যবধানে বিজয় অর্জনের পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
৪ দিন আগে
ছায়া মন্ত্রিসভা বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা। এটি ওয়েস্টমিনিস্টার শাসন ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই মন্ত্রিসভার সদস্যদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা থাকে না, কিন্তু তারা ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
৪ দিন আগে