সারাক্ষণ বাবার ছায়াসঙ্গী হয়ে আলোচনায় এসেছেন জাইমা রহমান। বিএনপি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানও এক সময় এভাবে মা খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ছিলেন। ছেলেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে নিজের সঙ্গে রাখতেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। জাইমার গতিবিধিও একই।
মাইদুল ইসলাম

জাইমা রহমান। বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে। ব্যারিস্টারি শেষে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান দম্পতির একমাত্র মেয়ে জাইমা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা। এরপর মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসপাতালে তার শয্যাপাশে সময় কাটানো। এমনকি মৃত্যুর পর তারেক রহমানের চরম সংকটময় প্রতিটা মুহূর্তে ছায়াসঙ্গী থাকছেন জাইমা। হোক তা কফিনের সামনে কিংবা বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে বৈঠকে।
সারাক্ষণ বাবার ছায়াসঙ্গী হয়ে আলোচনায় এসেছেন জাইমা রহমান। বিএনপি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানও এক সময় এভাবে মা খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ছিলেন। ছেলেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে নিজের সঙ্গে রাখতেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। এভাবেই তিনি রাজনৈতিক হাতেখড়ি দেন তারেক রহমানকে। জাইমার গতিবিধিও একই। তবে তিনি বাবার মতো রাজনীতিতে আসবেন কিনা, তা আগ বাড়িয়ে বলার সময় আসেনি।
আজ বিকেলে দাদীর বিদায়লগ্নে জাইমা রহমান তাঁর স্মৃতির মণিকোঠা থেকে এক নিভৃত মুহূর্তের ছবি শেয়ার করেছেন, যেখানে চায়ের টেবিলে দাদী-নাতনিকে এক প্রাণবন্ত ও ঘরোয়া আলাপে মগ্ন দেখা যায়। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা এই ছবির ক্যাপশনে দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদায়-বেলায়’ কবিতার বিষাদমাখা পঙক্তিমালা। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই এক হাহাকার ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

অবশ্য দেশে ফেরার আগে গত অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘সময় এবং পরিস্থিতিই তা বলে দেবে।’
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা থেকে গত এক সপ্তাহে জাইমা রহমানের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দাদি খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছে জাইমা রহমানকে। যেমনটি বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম।
স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘দেশে তরুণ নেতৃত্বের জোয়ার চলছে। তারেক রহমান নিজেও তরুণদের রাজনীতিতে প্রাধান্য দিচ্ছেন। জিয়া পরিবার থেকে জাইমা রহমানকেও রাজনীতিতে প্রত্যাশা করছেন অনেকে। ফলে সামনের দিনে জাইমা রহমান রাজনীতিতে যুক্ত হবেন এবং দাদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবেন, এমন ধারণা অমূলক নয়।’
২৯ বছর বয়সী জাইমা রহমান যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক করেন। এর পর ২০১৯ সালে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ব্যারিস্টার হিসেবে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত তিনি।
গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) খালেদা জিয়ার দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিয়ে জাইমা রহমান বাবার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে পরিচিত হন। দেশে ফেরার আগে গত ২৩ নভেম্বর তিনি দলীয় সভায় অংশ নেন এবং পরে ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্টে বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করার বার্তা দেন। এছাড়া গত বছরের শুরুতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ কর্মসূচিতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জাইমা উপস্থিতি থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন।

গত ২৩ নভেম্বর ফেসবুক পোস্টে জাইমা লিখেছিলেন, ‘লন্ডনের দিনগুলো আমাকে বাস্তববাদী করেছে, একটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে শিখেছি মানুষের সমস্যার যৌক্তিক ও আইনগত সমাধান খোঁজা।’
আশাবাদী অধ্যাপক সেলিম বলেন, বাংলাদেশে মতো দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যম এবং ধৈর্য ধরে যৌক্তিক সমাধান খোঁজা নেতৃত্বের অন্যতম গুণাবলী। সত্যিই রাজনীতিতে এলে জাইমা রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন বলে আমি আশা করি।
বিএনপির দলীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেভাবে জাইমা রহমান এখন তাঁর বাবার ছায়াসঙ্গী হচ্ছেন; নব্বইয়ের দশকে একইভাবে তারেক রহমানকে রাজনীতির ময়দানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী থানা কমিটির সদস্য হন তারেক রহমান। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া তাঁকে নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ান।
বাংলাদেশে মতো দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন।... সত্যিই রাজনীতিতে এলে জাইমা রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন বলে আমি আশা করি। অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
এরপর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফর ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে সঙ্গে নিতেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর এবং পরে খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সফরের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তারেক রহমান।

সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ঘুরছে। তাতে দেখা যায়, এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ ৩১ ডিসেম্বর সকালে গুলশানের বাসভবনে আনা হয়। সেখানে চেয়ারে বসা তারেক রহমান, তাঁকে ঘিরে পরিবারের সদস্য ও নেতারা। বিমর্ষ বাবার কাঁধে হাত জাইমার, যেন আরেক মা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এ সময় জাইমাকে অন্যদের সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায়।
পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতির শীর্ষে ওঠার নজির বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য। অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়কই তাঁদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সঙ্গে রাখতেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের নেতা হয়ে ওঠার পথ সুগম করেছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবার। জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তাঁর ছেলে জর্জ ওয়াকার বুশকে প্রায়ই বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যেত। সেই হাতেখড়ির জের ধরেই পরবর্তীতে তিনি দুই মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। তাঁর বাবা পিয়েরে ট্রুডো দেশটির দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জাস্টিন ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে বিশ্বনেতাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন, যা তাঁকে দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
একইভাবে ভারতের নেহেরু-গান্ধী পরিবারে ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে রাজীব গান্ধী, কিংবা পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ এবং বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো—সবারই রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটেছে বাবা বা মায়ের হাত ধরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিভাবকদের এই ‘প্রটোকল’ বা ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকাটাই মূলত উত্তরসূরিদের আগামীর নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার একটি বিশ্বজনীন কৌশল।
গত ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে খালেদা জিয়ার জানাজার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় জাইমা রহমানকে বাবার ঠিক পরের আসনেই দেখা গেছে। এর পরে বসেছিলেন বিএনপির নেতারা।
আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায় প্রিয় বাংলাদেশকে নতুন করে জানতে চাই। জাইমা রহমান, ফেসবুক পোস্টে
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর যখন তারেক রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দিচ্ছিলেন, তখন জাইমা ছিলেন তাঁর ঠিক পাশে। এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অংশ নিয়ে জাইমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির পক্ষ থেকে শক্তিশালী বার্তা দেন।
গত ২৩ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বিএনপির একটি দলীয় সভায় অংশ নেন জাইমা রহমান। ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়া ওই বৈঠকের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মী এবং ইউরোপভিত্তিক একটি প্রতিনিধি দলের উপস্থিতির ওই বৈঠকে ভোটাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ঢাকা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
বৈঠকে জাইমা রহমান সবার সমস্যা, সুবিধা ও মতামত শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা কে কতটুকু করতে পারি তা দেখব।’ তিনি বলেন, ‘কাজ এগিয়ে নিতে হবে। সবাই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং যতটা সম্ভব সাহায্য করা উচিত। প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়ে আমাদের দেরি করা উচিত নয়। অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’

একই দিন ফেসবুকের দীর্ঘ পোস্টে জাইমা রহমান নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায় প্রিয় বাংলাদেশকে নতুন করে জানতে চাই।’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন– ঈঙ্গিত দিয়ে জাইমা রহমান আরও লেখেন, ‘দাদুর কাছেই আমি নেতৃত্বের প্রথম শিক্ষা পাই– নম্রতা, আন্তরিকতা আর মন দিয়ে শোনার মানসিকতা।’
বাংলাদেশে ফিরে বাবার সঙ্গেই ভোটার হয়েছেন জাইমা রহমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের পরে এদেশে বিএনপির রাজনীতির কাণ্ডারি ডা. জুবাইদা রহমান– এ নীতি থেকে হয়তো সরে এসেছে হাইকমান্ড। খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি হিসেবে জাইমা রহমানকে সামনে আনছেন। এদেশে নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে তার মতো তরুণ নেতৃত্ব দরকার। জাইমা রহমান কবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধ্যায়ে নাম লেখান, এখন সেটিই দেখার।

জাইমা রহমান। বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে। ব্যারিস্টারি শেষে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান দম্পতির একমাত্র মেয়ে জাইমা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা। এরপর মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসপাতালে তার শয্যাপাশে সময় কাটানো। এমনকি মৃত্যুর পর তারেক রহমানের চরম সংকটময় প্রতিটা মুহূর্তে ছায়াসঙ্গী থাকছেন জাইমা। হোক তা কফিনের সামনে কিংবা বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে বৈঠকে।
সারাক্ষণ বাবার ছায়াসঙ্গী হয়ে আলোচনায় এসেছেন জাইমা রহমান। বিএনপি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানও এক সময় এভাবে মা খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ছিলেন। ছেলেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে নিজের সঙ্গে রাখতেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। এভাবেই তিনি রাজনৈতিক হাতেখড়ি দেন তারেক রহমানকে। জাইমার গতিবিধিও একই। তবে তিনি বাবার মতো রাজনীতিতে আসবেন কিনা, তা আগ বাড়িয়ে বলার সময় আসেনি।
আজ বিকেলে দাদীর বিদায়লগ্নে জাইমা রহমান তাঁর স্মৃতির মণিকোঠা থেকে এক নিভৃত মুহূর্তের ছবি শেয়ার করেছেন, যেখানে চায়ের টেবিলে দাদী-নাতনিকে এক প্রাণবন্ত ও ঘরোয়া আলাপে মগ্ন দেখা যায়। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা এই ছবির ক্যাপশনে দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদায়-বেলায়’ কবিতার বিষাদমাখা পঙক্তিমালা। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই এক হাহাকার ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

অবশ্য দেশে ফেরার আগে গত অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘সময় এবং পরিস্থিতিই তা বলে দেবে।’
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা থেকে গত এক সপ্তাহে জাইমা রহমানের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দাদি খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছে জাইমা রহমানকে। যেমনটি বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম।
স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘দেশে তরুণ নেতৃত্বের জোয়ার চলছে। তারেক রহমান নিজেও তরুণদের রাজনীতিতে প্রাধান্য দিচ্ছেন। জিয়া পরিবার থেকে জাইমা রহমানকেও রাজনীতিতে প্রত্যাশা করছেন অনেকে। ফলে সামনের দিনে জাইমা রহমান রাজনীতিতে যুক্ত হবেন এবং দাদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবেন, এমন ধারণা অমূলক নয়।’
২৯ বছর বয়সী জাইমা রহমান যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক করেন। এর পর ২০১৯ সালে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ব্যারিস্টার হিসেবে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় যুক্ত তিনি।
গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) খালেদা জিয়ার দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিয়ে জাইমা রহমান বাবার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে পরিচিত হন। দেশে ফেরার আগে গত ২৩ নভেম্বর তিনি দলীয় সভায় অংশ নেন এবং পরে ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্টে বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করার বার্তা দেন। এছাড়া গত বছরের শুরুতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসের ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ কর্মসূচিতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জাইমা উপস্থিতি থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন।

গত ২৩ নভেম্বর ফেসবুক পোস্টে জাইমা লিখেছিলেন, ‘লন্ডনের দিনগুলো আমাকে বাস্তববাদী করেছে, একটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে শিখেছি মানুষের সমস্যার যৌক্তিক ও আইনগত সমাধান খোঁজা।’
আশাবাদী অধ্যাপক সেলিম বলেন, বাংলাদেশে মতো দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যম এবং ধৈর্য ধরে যৌক্তিক সমাধান খোঁজা নেতৃত্বের অন্যতম গুণাবলী। সত্যিই রাজনীতিতে এলে জাইমা রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন বলে আমি আশা করি।
বিএনপির দলীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেভাবে জাইমা রহমান এখন তাঁর বাবার ছায়াসঙ্গী হচ্ছেন; নব্বইয়ের দশকে একইভাবে তারেক রহমানকে রাজনীতির ময়দানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী থানা কমিটির সদস্য হন তারেক রহমান। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া তাঁকে নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ান।
বাংলাদেশে মতো দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন।... সত্যিই রাজনীতিতে এলে জাইমা রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন বলে আমি আশা করি। অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
এরপর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফর ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে সঙ্গে নিতেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর এবং পরে খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সফরের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তারেক রহমান।

সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ঘুরছে। তাতে দেখা যায়, এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ ৩১ ডিসেম্বর সকালে গুলশানের বাসভবনে আনা হয়। সেখানে চেয়ারে বসা তারেক রহমান, তাঁকে ঘিরে পরিবারের সদস্য ও নেতারা। বিমর্ষ বাবার কাঁধে হাত জাইমার, যেন আরেক মা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এ সময় জাইমাকে অন্যদের সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায়।
পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতির শীর্ষে ওঠার নজির বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য। অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়কই তাঁদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সঙ্গে রাখতেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের নেতা হয়ে ওঠার পথ সুগম করেছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবার। জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তাঁর ছেলে জর্জ ওয়াকার বুশকে প্রায়ই বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যেত। সেই হাতেখড়ির জের ধরেই পরবর্তীতে তিনি দুই মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। তাঁর বাবা পিয়েরে ট্রুডো দেশটির দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জাস্টিন ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে বিশ্বনেতাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন, যা তাঁকে দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
একইভাবে ভারতের নেহেরু-গান্ধী পরিবারে ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে রাজীব গান্ধী, কিংবা পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ এবং বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো—সবারই রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটেছে বাবা বা মায়ের হাত ধরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিভাবকদের এই ‘প্রটোকল’ বা ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকাটাই মূলত উত্তরসূরিদের আগামীর নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার একটি বিশ্বজনীন কৌশল।
গত ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে খালেদা জিয়ার জানাজার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় জাইমা রহমানকে বাবার ঠিক পরের আসনেই দেখা গেছে। এর পরে বসেছিলেন বিএনপির নেতারা।
আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায় প্রিয় বাংলাদেশকে নতুন করে জানতে চাই। জাইমা রহমান, ফেসবুক পোস্টে
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর যখন তারেক রহমানের হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দিচ্ছিলেন, তখন জাইমা ছিলেন তাঁর ঠিক পাশে। এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অংশ নিয়ে জাইমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির পক্ষ থেকে শক্তিশালী বার্তা দেন।
গত ২৩ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বিএনপির একটি দলীয় সভায় অংশ নেন জাইমা রহমান। ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়া ওই বৈঠকের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মী এবং ইউরোপভিত্তিক একটি প্রতিনিধি দলের উপস্থিতির ওই বৈঠকে ভোটাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ঢাকা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
বৈঠকে জাইমা রহমান সবার সমস্যা, সুবিধা ও মতামত শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা কে কতটুকু করতে পারি তা দেখব।’ তিনি বলেন, ‘কাজ এগিয়ে নিতে হবে। সবাই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং যতটা সম্ভব সাহায্য করা উচিত। প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়ে আমাদের দেরি করা উচিত নয়। অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’

একই দিন ফেসবুকের দীর্ঘ পোস্টে জাইমা রহমান নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায় প্রিয় বাংলাদেশকে নতুন করে জানতে চাই।’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন– ঈঙ্গিত দিয়ে জাইমা রহমান আরও লেখেন, ‘দাদুর কাছেই আমি নেতৃত্বের প্রথম শিক্ষা পাই– নম্রতা, আন্তরিকতা আর মন দিয়ে শোনার মানসিকতা।’
বাংলাদেশে ফিরে বাবার সঙ্গেই ভোটার হয়েছেন জাইমা রহমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের পরে এদেশে বিএনপির রাজনীতির কাণ্ডারি ডা. জুবাইদা রহমান– এ নীতি থেকে হয়তো সরে এসেছে হাইকমান্ড। খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি হিসেবে জাইমা রহমানকে সামনে আনছেন। এদেশে নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে তার মতো তরুণ নেতৃত্ব দরকার। জাইমা রহমান কবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধ্যায়ে নাম লেখান, এখন সেটিই দেখার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসন থেকে বিজয়ী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামানকে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দপ্তর বণ্টনে তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ ৪২ জনই নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। নতুনদের মধ্যে ১৭ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
৮ ঘণ্টা আগে
সরকারি দল জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি এই মন্তব্য করেন।
৯ ঘণ্টা আগে