জাকাতের অর্থনীতি: বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ২২: ০৪
জাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, এটি গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার। ছবি: এআই জেনারেটেড
জাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, এটি গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার। ছবি: এআই জেনারেটেড

চলুন একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বাংলাদেশে প্রতি বছর কত টাকার জাকাত আদায় হওয়ার কথা? গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয় কত? মাত্র বারো কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যবধানটি কেবল সংখ্যার পার্থক্য নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন না খেয়ে ঘুমাতে যায়, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মানুষের ভল্টে, ব্যাংকের লকারে এবং সোনার গয়নার বাক্সে অচল হয়ে পড়ে থাকে।

পৃথিবীতে সম্পদের অসম বণ্টন নিয়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে চিন্তা করেছে। কেউ মনে করেছে পুঁজিবাদই মুক্তির পথ, আবার কেউ বিশ্বাস করেছে সমাজতন্ত্রই সমাধান। কিন্তু বাস্তবে এই দুই পথেই চলতে গিয়ে মানুষ বারবার সমস্যায় পড়েছে। পুঁজিবাদ সম্পদকে ধীরে ধীরে অল্প কিছু মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে, আর সমাজতন্ত্র সম্পদকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষকে অনেক সময় যান্ত্রিক কাঠামোর অংশে পরিণত করেছে। এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে ইসলাম প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার কথা বলেছিল, যার নাম জাকাত। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় পেরিয়েও এই ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট রয়েছে।

জাকাত শব্দটির মধ্যেই এর দর্শন লুকিয়ে আছে। আরবি ভাষায় এই শব্দের অর্থ পবিত্রতা এবং বৃদ্ধি। যে সম্পদ থেকে জাকাত দেওয়া হয়, সেই সম্পদ কমে যায় না বরং বৃদ্ধি পায়। অনেকের কাছে এটি হয়তো কেবল আধ্যাত্মিক একটি ধারণা মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে একটি গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। যখন সমাজের বড় একটি অংশের মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা পৌঁছে যায়, তখন বাজার সক্রিয় হয়, উৎপাদন বাড়ে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। মূলত জাকাত সেই অর্থনৈতিক চক্রটিকেই সচল রাখে।

এখন একটু ভাবা দরকার। একজন মানুষ সারাজীবন কষ্ট করে সম্পদ গড়ে তোলেন, তার থেকে কেন দেবেন? এই প্রশ্নটা স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলাম বলে, পৃথিবীর সব সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। মানুষ শুধু আমানতদার। যিনি আমানত রেখেছেন, তিনি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন কার কতটুকু পাওনা। এই বোধটি যখন একজন মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তখন সে সম্পদ আঁকড়ে ধরার মনোবৃত্তি থেকে মুক্তি পায়। সে বোঝে, তার উপার্জনে সমাজের দুর্বল মানুষের একটি ন্যায্য অংশ আছে। জাকাত তাই কোনো দয়া নয়, দান নয়, এটা একটা অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

নিসাবের হিসাবটা বুঝলে আরও পরিষ্কার হয়। সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমাণ সম্পদ যদি কারো কাছে পূর্ণ এক বছর থাকে, তাহলে সে সম্পদের আড়াই শতাংশ জাকাত হিসেবে দিতে হবে। শুধু নগদ টাকা নয়, ব্যাংকের সঞ্চয়, ব্যবসার পণ্য, সোনাদানা সব মিলিয়েই হিসাব। বাংলাদেশে যদি সব জাকাতযোগ্য সম্পদ ধরা হয়, তাহলে বছরে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা তো সহজেই আদায় হওয়া সম্ভব শুধু রক্ষণশীল হিসাবেই। আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে এই সংখ্যাটা পৌঁছে যাবে এক লাখ কোটিতে।

তাহলে কী হবে এই এক লাখ কোটি টাকা দিয়ে? প্রশ্নটা মাথায় আসাটাই স্বাভাবিক। সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের হিসাব বলছে, এই অর্থ যদি সমভাবে পনেরো লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে প্রতিটি পরিবার পাবে দেড় লাখ টাকারও বেশি। এই টাকা দিয়ে একজন বেকার তরুণ একটা রিকশাভ্যান কিনতে পারে, একজন বিধবা মহিলা একটা সেলাই মেশিন পেতে পারে, একজন প্রান্তিক কৃষক পাঁচটা ছাগল কিনে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই মানুষগুলো নিজেই হয়ে উঠবে স্বনির্ভর, এমনকি কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতে নিজেই জাকাতদাতায় পরিণত হবে।

ইতিহাস এই স্বপ্নকে উড়িয়ে দেয় না, বরং সত্য বলে প্রমাণ করে। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনকালে জাকাত ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর হয়েছিল যে রাজ্যের কর্মকর্তারা জাকাতের অর্থ বিতরণ করতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতেন, কারণ গ্রহণ করার মতো যোগ্য দরিদ্র মানুষ পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা ইতিহাসের নথিতে লেখা আছে, কোনো কল্পকথা নয়। সেই একই পরিণতি পেয়েছিল মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলেও।

কিন্তু বাংলাদেশের ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৮২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে জাকাত ফান্ড গঠিত হয়েছিল। চার দশকে এই ফান্ডে জমা পড়েছে মাত্র একাত্তর কোটি টাকা। যেখানে সম্ভাবনা এক লাখ কোটি, সেখানে বাস্তবতা একাত্তর কোটি। এই বিশাল ব্যবধানের কারণ কি শুধু মানুষের অনীহা? না, কারণ আরও গভীরে।

সমস্যার শিকড়টা খুঁজতে গেলে কয়েকটি স্তরে দেখতে হয়। প্রথমত, স্বচ্ছতার অভাব। মানুষ জানে না তার দেওয়া জাকাতের টাকা কোথায় যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিতরণের ভুল পদ্ধতি। রমজান মাসে সারিবদ্ধ দরিদ্র মানুষদের হাতে পঞ্চাশ একশো টাকা ধরিয়ে দেওয়া বা শাড়িলুঙ্গি বিতরণ করা জাকাতের উদ্দেশ্য পূরণ করে না। এই টাকায় কোনো পরিবারের জীবন বদলায় না। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। জাকাত ফান্ড বিভাগটি সারা বছর ঘুমিয়ে থাকে, রমজান এলে একটু নড়েচড়ে বসে।

তবে এই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই আসছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে একটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাকাত ব্যবস্থাপনাকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে ধর্মমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠকে আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ জাকাত তহবিল দিয়ে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থায়ী দারিদ্র বিমোচনের একটি কার্যকর মডেল উপস্থাপন করেন। তার সংস্থার অভিজ্ঞতা বলছে, মাত্র ১৩ কোটি টাকা খরচ করে গত এক বছরে ২১০০ বেকার তরুণকে দক্ষ করে কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যারা মিলে সেই এক বছরেই আয় করেছেন ৪২ কোটি টাকা। এই সংখ্যাটি কেবল একটি সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি প্রমাণিত পথের ঠিকানা। বৈঠকে চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা তৈরি এবং একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও উঠে এসেছে। পাশাপাশি ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকে বার্ষিক জাকাতের অর্থ বাংলাদেশে আনার একটি পথ তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

সমাধান কি তাহলে নেই? আছে, এবং খুব সুনির্দিষ্টভাবেই আছে। মালয়েশিয়া দেখিয়ে দিয়েছে পথটা। সেখানে সরকারিভাবে Zakat Malaysia নামে একটি দপ্তর জাকাত সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থ শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান খাতে পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করে। সৌদি আরবে কেন্দ্রীয় জাকাত কর্তৃপক্ষ কর্পোরেট পর্যায়েও জাকাত সংগ্রহ করে। এই দেশগুলো প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা থাকলে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্য পথটা আসলে খুব কঠিন নয়। প্রথম দরকার একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল জাকাত ব্যবস্থাপনা, যেখানে দাতা অনলাইনে দেখতে পাবেন তার টাকা কোথায় গেল, কোন পরিবারের জীবন বদলে দিল। দ্বিতীয়ত দরকার বিতরণের পদ্ধতি পরিবর্তন। নগদ টাকা বা কাপড় বিতরণের বদলে দরিদ্র মানুষকে উৎপাদনমুখী সম্পদ দেওয়া, তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। তৃতীয়ত দরকার আলেমসমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা, যাতে মানুষ জাকাতের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বুঝতে পারে।

জাকাত ব্যবস্থার একটি দিক প্রায়ই আলোচনায় আসে না। এটি শুধু গরিবকে উপকার করে না, ধনীকেও পরিবর্তন করে। যে মানুষ নিয়মিত তার সম্পদের একটি অংশ সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, সে ধীরে ধীরে লোভ থেকে মুক্তি পায়। সম্পদ তার কাছে বোঝা হয় না, হয় দায়িত্ব। কুরআন এই সত্যটি বলেছে অসাধারণ ভাষায়, আল্লাহ সুদ ধ্বংস করেন আর দান বৃদ্ধি করেন। যা বাহ্যত কমে, আসলে তা বাড়ে।

বাংলাদেশে যদি সঠিকভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টন করা যায়, তাহলে মাত্র সাত থেকে দশ বছরের মধ্যেই দেশ থেকে দারিদ্র্য অনেকটাই দূর করা সম্ভব। এটি কোনো কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত হিসাব। বাংলাদেশে জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ প্রায় দেখা যায় না। অথচ সত্যিকারের সদিচ্ছা থাকলে এই আইনকে কার্যকর করে তুলেই একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের পথচলা শুরু করা সম্ভব।

শেষে আবার শুরুতে করা প্রশ্নটিতেই ফিরে আসা যাক। এক লাখ কোটি টাকার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে কেন মাত্র বারো কোটি টাকা আদায় হয়? কারণটি খুবই সহজ। আমরা জাকাতকে ফরজ হিসেবে স্বীকার করি, কিন্তু অনেক সময় সেটিকে ঐচ্ছিক কাজের মতো করে পালন করি। কারও ইচ্ছা হলে দেন, ইচ্ছা না হলে দেন না। অথচ জাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, এটি গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার। সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা শুধু ধর্মীয় দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং সমাজের প্রতিও একটি গুরুতর অন্যায়। সম্পদের প্রকৃত নিরাপত্তা ব্যাংকের ভল্টে লুকিয়ে রাখার মধ্যে নেই। প্রকৃত নিরাপত্তা রয়েছে সেই সম্পদে, যা মানুষের কল্যাণে প্রবাহিত হয়। জাকাত আমাদের ঠিক সেই পথের দিকেই নির্দেশনা দেয়।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত