কৃষি বিপ্লবে ‘কৃষক কার্ড’ যেভাবে নতুন আশা জাগাচ্ছে

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৪৩
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকেই কৃষি আমাদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করে আত্মনির্ভরতার দিকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার যে গল্প, তার কেন্দ্রে রয়েছেন এই দেশের পরিশ্রমী কৃষকেরা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো এই খাতের প্রধান চালিকাশক্তি কৃষক বরাবরই নানা অনিশ্চয়তা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপে পিছিয়ে থেকেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা, ন্যায্য মূল্য এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন যুগের পর যুগ।

আধুনিক প্রযুক্তি ও নীতিগত সহায়তা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রয়াস ছিল না বললেই চলে। কৃষি বিষয়ক জ্ঞান এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে কৃষকের ভাগ্য বদলায়নি এত বছরেও। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগটি এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, যা কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি ডিজিটাল রূপান্তরের সূচনা করতে চলেছে।

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিনেই ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করতে চলেছেন। টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। সরকারি তথ্যমতে, কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাক-পাইলটিং (পরীক্ষামূলক), পাইলটিং এবং পরে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ।

প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এই কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এখানে শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকরাই নন, বরং মৎস্যচাষি ও আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি, এমনকি দগ্ধ খামারি, ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ কৃষক সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষীরাও এই উদ্যোগের আওতায় এসেছেন, যা এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময় শেষে এর অভিজ্ঞতা ও বাস্তব শিক্ষা কাজে লাগিয়ে আগামী আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। পরে ধাপে ধাপে আগামী চার বছরের মধ্যে সারা দেশে কৃষক কার্ড বিতরণ এবং একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষক কার্ডের সুবিধাগুলো বহুমুখী ও সময়োপযোগী। এটি মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যার মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সহায়তা সহজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চলতি বছরের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন, যারা এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। ইতোমধ্যে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখাগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যা কৃষকদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছে। ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সহায়তাপ্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তায় থাকা কৃষকেরাই এই উদ্যোগের মূল সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কার্ডের মাধ্যমে যেসব আর্থিক লেনদেন ও ভর্তুকি প্রদান করা হবে, সেগুলো যেন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

এই কার্ডধারী কৃষকেরা মোট ১০ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন, যা কৃষি উৎপাদনকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী এবং আধুনিক করে তুলবে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি, সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সুযোগ এবং সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনার সুবিধা।

এছাড়াও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের কাছে স্থাপিত পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, মৎস্য ও প্রাণিখাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সহজেই ক্রয় করা সম্ভব হবে। ফলে পুরো কৃষি সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা, দ্রুততা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।

এছাড়া, কৃষক কার্ডের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল সেবা কৃষকের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষকেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য পাবেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

একই সঙ্গে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিমা সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুযোগও এই কার্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। আগে যেখানে চাষাবাদ অনেকাংশে অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে এখন তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর একটি নতুন কৃষি সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এটি উৎপাদন বৃদ্ধি, খরচ কমানো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আবার, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেইজে কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণের ফলে নীতি নির্ধারণ হবে আরও বাস্তবভিত্তিক ও লক্ষ্যনির্ভর। উদাহরণস্বরূপ, কোন অঞ্চলে কোন ফসলের উৎপাদন বেশি, কোথায় কী ধরনের জলবায়ু ঝুঁকি রয়েছে কিংবা কোন শ্রেণির কৃষক সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন—এসব তথ্য সহজেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং সম্পদের অপচয় কমে আসবে। এই তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে পরিণত করতে সহায়তা করবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তারেক রহমানের সরকার ইতোমধ্যে ১২ লাখ কৃষকের প্রায় ১,৫৫০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার আওতায় কৃষকদের ভূমির পরিমাণের ভিত্তিতে ভূমিহীন (৫ শতাংশের কম জমির মালিক), প্রান্তিক (৫–৪৯ শতাংশ), ক্ষুদ্র (৫০–২৪৯ শতাংশ) এবং অন্যান্য কৃষক শ্রেণিতে বিভক্ত করে একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কৃষি সহায়তা কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, নির্ভুল ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

এছাড়াও, সরকার আগামী চার বছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮১ কোটি টাকা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি খাতে একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল সহায়তা ব্যবস্থার ভিত শক্তিশালী হবে, যা কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে যেকোনো বড় উদ্যোগের মতোই কৃষক কার্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, কৃষকদের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এই উদ্যোগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা। পাশাপাশি, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং পিওএস মেশিন ব্যবহারে কৃষক ও ডিলারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কার্ডের মাধ্যমে যেসব আর্থিক লেনদেন ও ভর্তুকি প্রদান করা হবে, সেগুলো যেন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ডিজিটাল রূপান্তরের পথে অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি খাতে কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটি শুধু কৃষির উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং গ্রামীণ সমাজে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করবে।

দূরদর্শী এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। আমি মনে করি, কৃষকের হাতে শুধু একটি কার্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে তা নয়, বরং তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা, নতুন ক্ষমতা এবং সম্মানজনক ভবিষ্যতের পথ। কৃষি বিপ্লবে এই উদ্যোগ যে নতুন আশা জাগিয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নিতে পারলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী, স্বনির্ভর এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে, যেখানে কৃষক হবেন উন্নয়নের প্রকৃত অংশীদার, কোনো প্রান্তিক চরিত্র নয়।

ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত