স্ট্রিম প্রতিবেদক

সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জওয়ান বা কর্মকর্তাদের মন থেকে মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয় এবং এই প্রক্রিয়ার বাইরে তিনিও ছিলেন না— আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরার মুখে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, জবানবন্দিতে তিনি যে ‘তাঁরা’ শব্দের উল্লেখ করে বলেছিলেন ‘তাঁরা মানুষকে টার্গেট মনে করতে থাকে’—সেই ‘তাঁরা’র মধ্যে তিনি নিজেও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের আইনজীবীদের জেরার মুখে তিনি এসব কথা বলেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জেরা অনুষ্ঠিত হয়। আসামিপক্ষে জেরা পরিচালনা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো।
‘তাঁরা’ কারা? মনস্তাত্ত্বিক বাধার আইনি জেরা
জেরার শুরুতে আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো সাবেক সেনাপ্রধানের আগের জবানবন্দির একটি অংশের প্রতি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছিলেন, ‘‘তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ বলতে ভুলে যায়, তাঁরা মানুষকে টার্গেট মনে করতে থাকে।’’
আইনজীবী প্রশ্ন রাখেন, ‘তাঁরা বলতে আপনি কাকে বুঝাচ্ছেন?’ উত্তরে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘তাঁরা বলতে এখানে আমি এবং আমি অন্তর্ভুক্ত সেনাবাহিনীর সবাই।’
এরপর আইনজীবী সামরিক প্রশিক্ষণের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, ‘প্রশিক্ষণের সময় ফায়ার রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাঁদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এই প্রশিক্ষণ কি আপনিও নিয়েছেন?’
উত্তরে ইকবাল করিম ভূঁইয়া আদালতের সামনে স্বীকার করেন, ‘‘প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, আমি নিজেও এই প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমারও মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর হয়েছে।’’
‘সিরিয়াল কিলার’ ও প্রমোশন বোর্ডের আপসকামিতা
আসামি পক্ষের জেরায় উঠে আসে জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি প্রসঙ্গ। আইনজীবী জানতে চান, জিয়াউল আহসানের পদোন্নতির সময় সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা কী ছিল।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘জিয়াউল আহসান আমার সময়কালে একটি পদোন্নতি (লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল) পান। আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে ডেকে বলেছিলাম, জিয়াউল আহসান একজন ‘সিরিয়াল কিলার’ আমি তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে নই। তুমি বোর্ডে বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করবে।’’
সাবেক সেনাপ্রধান দাবি করেন, জেনারেল মোমেন নির্দেশ অনুযায়ী বোর্ডে বিষয়টি তুলে ধরলেও বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য জিয়াউলকে ‘ভালো অফিসার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘‘বোর্ডের অনেক সদস্যই নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ চিন্তা করে পদোন্নতির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। যদিও জিয়াউল স্টাফ কলেজ না করায় কর্নেল হওয়ার যোগ্য ছিলেন না।’’ তিনি আরও জানান, জিয়াউল আহসানের বিষয়ে মত দেওয়ায় কিছুদিন পরই জেনারেল মোমেনকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে বাহরাইনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ‘ডাম্পিং পোস্টে’ পাঠানো হয়।
‘সুপার চিফ’ ও চেইন অব কমান্ড
জেরায় উঠে আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ক্ষমতার পরিধি। আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘‘মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে আপনি ‘সুপার চিফ’ মনে করতেন কি না?’’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আর্মিতে সুপার চিফ নামে কোনো পদ নেই। কিন্তু বাস্তবে লিটারেলি সেন্সে তারিক আহমেদ সিদ্দিক সুপার চিফ ছিলেন।’’ তিনি স্বীকার করেন, প্রমোশন বোর্ডের সদস্য থাকাকালে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তাবিত তালিকায় তিনি ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ অনুমোদন দিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (তারিক আহমেদ সিদ্দিক) কাছ থেকে তালিকার বাইরে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এ বিষয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৌখিকভাবে জানালেও কোনো লিখিত প্রতিবাদ বা আদেশ অমান্যের দালিলিক প্রমাণ আদালতে দেখাতে পারেননি।
ইকবাল করিমের নিজের পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা
জেরার শেষ অংশে আসামিপক্ষ ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নিজস্ব পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আইনজীবী টিটো জানতে চান, সেনাপ্রধান হওয়ার সময় তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কতজন কর্মকর্তা ছিলেন। জবাবে তিনি স্বীকার করেন, ‘‘আমি সেনাপ্রধান হওয়ার সময় আমার চেয়ে সিনিয়র অফিসার বাহিনীতে ছিলেন।’’
জেরার একপর্যায় আসামিপক্ষ আরও জেরার জন্য সময় প্রার্থনা করলে ট্রাইব্যুনাল আগামী সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) পরবর্তী জেরার দিন ধার্য করেন এবং সেদিন পুরো জেরা সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন ।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।
গেল ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। শুনানিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম-খুনের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের প্রথমটি হলো— ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিন হত্যা।
দ্বিতীয় অভিযোগের ঘটনাস্থল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খাল ঘেঁষা বলেশ্বর নদের মোহনা। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বরগুনার বলেশ্বর নদ ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। ওই দিনই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান সবশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ১৬ অগাস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।
প্রথমে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হকার শাহজাহানকে হত্যার অভিযোগে ঢাকার নিউ মার্কেট থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতবছর ১২ নভেম্বর তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, “বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা। আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে।”
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যাব-২ এর উপঅধিনায়ক হন।
ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র্যাবেই রেখে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে।
পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক।
দুদকের আবেদনে ঢাকার জজ আদালত জিয়াউল আহসানের তিনটি ফ্ল্যাট, পাঁচটি বাড়ি ও প্রায় ১০০ বিঘা জমি জব্দ এবং তার নয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে।

সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জওয়ান বা কর্মকর্তাদের মন থেকে মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয় এবং এই প্রক্রিয়ার বাইরে তিনিও ছিলেন না— আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরার মুখে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, জবানবন্দিতে তিনি যে ‘তাঁরা’ শব্দের উল্লেখ করে বলেছিলেন ‘তাঁরা মানুষকে টার্গেট মনে করতে থাকে’—সেই ‘তাঁরা’র মধ্যে তিনি নিজেও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের আইনজীবীদের জেরার মুখে তিনি এসব কথা বলেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জেরা অনুষ্ঠিত হয়। আসামিপক্ষে জেরা পরিচালনা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো।
‘তাঁরা’ কারা? মনস্তাত্ত্বিক বাধার আইনি জেরা
জেরার শুরুতে আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো সাবেক সেনাপ্রধানের আগের জবানবন্দির একটি অংশের প্রতি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছিলেন, ‘‘তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ বলতে ভুলে যায়, তাঁরা মানুষকে টার্গেট মনে করতে থাকে।’’
আইনজীবী প্রশ্ন রাখেন, ‘তাঁরা বলতে আপনি কাকে বুঝাচ্ছেন?’ উত্তরে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘তাঁরা বলতে এখানে আমি এবং আমি অন্তর্ভুক্ত সেনাবাহিনীর সবাই।’
এরপর আইনজীবী সামরিক প্রশিক্ষণের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, ‘প্রশিক্ষণের সময় ফায়ার রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাঁদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এই প্রশিক্ষণ কি আপনিও নিয়েছেন?’
উত্তরে ইকবাল করিম ভূঁইয়া আদালতের সামনে স্বীকার করেন, ‘‘প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, আমি নিজেও এই প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমারও মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর হয়েছে।’’
‘সিরিয়াল কিলার’ ও প্রমোশন বোর্ডের আপসকামিতা
আসামি পক্ষের জেরায় উঠে আসে জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি প্রসঙ্গ। আইনজীবী জানতে চান, জিয়াউল আহসানের পদোন্নতির সময় সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা কী ছিল।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘জিয়াউল আহসান আমার সময়কালে একটি পদোন্নতি (লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল) পান। আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে ডেকে বলেছিলাম, জিয়াউল আহসান একজন ‘সিরিয়াল কিলার’ আমি তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে নই। তুমি বোর্ডে বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করবে।’’
সাবেক সেনাপ্রধান দাবি করেন, জেনারেল মোমেন নির্দেশ অনুযায়ী বোর্ডে বিষয়টি তুলে ধরলেও বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য জিয়াউলকে ‘ভালো অফিসার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘‘বোর্ডের অনেক সদস্যই নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ চিন্তা করে পদোন্নতির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। যদিও জিয়াউল স্টাফ কলেজ না করায় কর্নেল হওয়ার যোগ্য ছিলেন না।’’ তিনি আরও জানান, জিয়াউল আহসানের বিষয়ে মত দেওয়ায় কিছুদিন পরই জেনারেল মোমেনকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে বাহরাইনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ‘ডাম্পিং পোস্টে’ পাঠানো হয়।
‘সুপার চিফ’ ও চেইন অব কমান্ড
জেরায় উঠে আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ক্ষমতার পরিধি। আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘‘মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে আপনি ‘সুপার চিফ’ মনে করতেন কি না?’’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আর্মিতে সুপার চিফ নামে কোনো পদ নেই। কিন্তু বাস্তবে লিটারেলি সেন্সে তারিক আহমেদ সিদ্দিক সুপার চিফ ছিলেন।’’ তিনি স্বীকার করেন, প্রমোশন বোর্ডের সদস্য থাকাকালে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তাবিত তালিকায় তিনি ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ অনুমোদন দিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (তারিক আহমেদ সিদ্দিক) কাছ থেকে তালিকার বাইরে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এ বিষয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৌখিকভাবে জানালেও কোনো লিখিত প্রতিবাদ বা আদেশ অমান্যের দালিলিক প্রমাণ আদালতে দেখাতে পারেননি।
ইকবাল করিমের নিজের পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা
জেরার শেষ অংশে আসামিপক্ষ ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নিজস্ব পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আইনজীবী টিটো জানতে চান, সেনাপ্রধান হওয়ার সময় তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কতজন কর্মকর্তা ছিলেন। জবাবে তিনি স্বীকার করেন, ‘‘আমি সেনাপ্রধান হওয়ার সময় আমার চেয়ে সিনিয়র অফিসার বাহিনীতে ছিলেন।’’
জেরার একপর্যায় আসামিপক্ষ আরও জেরার জন্য সময় প্রার্থনা করলে ট্রাইব্যুনাল আগামী সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) পরবর্তী জেরার দিন ধার্য করেন এবং সেদিন পুরো জেরা সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন ।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।
গেল ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। শুনানিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম-খুনের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের প্রথমটি হলো— ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিন হত্যা।
দ্বিতীয় অভিযোগের ঘটনাস্থল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খাল ঘেঁষা বলেশ্বর নদের মোহনা। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বরগুনার বলেশ্বর নদ ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। ওই দিনই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান সবশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ১৬ অগাস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।
প্রথমে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হকার শাহজাহানকে হত্যার অভিযোগে ঢাকার নিউ মার্কেট থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতবছর ১২ নভেম্বর তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, “বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা। আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে।”
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যাব-২ এর উপঅধিনায়ক হন।
ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র্যাবেই রেখে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে।
পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক।
দুদকের আবেদনে ঢাকার জজ আদালত জিয়াউল আহসানের তিনটি ফ্ল্যাট, পাঁচটি বাড়ি ও প্রায় ১০০ বিঘা জমি জব্দ এবং তার নয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে।

ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে নতুন সরকার। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সচিবালয়ে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এই তথ্য জানান।
১ ঘণ্টা আগে
দৈনিক প্রথম আলোর আগুনে পোড়ানার ভবনে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান এই শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন।
২ ঘণ্টা আগে
নানা জল্পনা-কল্পনা ও প্রকাশকদের একাংশের আপত্তি এবং শর্তের মুখে অবশেষে চূড়ান্ত হলো অমর একুশে বইমেলার দিনক্ষণ। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে এবারের বইমেলা। এদিনই হবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।
২ ঘণ্টা আগে