জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে কেন গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এখন কী ঘটবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা মুখোমুখি অবস্থানে। ছবি: দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস

গত শুক্রবার গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভোরের আগে রাজধানী কারাকাস বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানান, ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগে নিউইয়র্কে তাঁদের বিচার করা হবে। শনিবার তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগপত্র বা ইনডিক্টমেন্টও জারি করা হয়েছে।

পরে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ‘নিকোলাস মাদুরো এখন ইউএসএস আইয়ো জিমায় (যুদ্ধজাহাজ)।’ ক্যাপশনে একটি ছবি পোস্ট করেন। শনিবার রাতে হোয়াইট হাউসের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, হাতকড়া পরা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) এজেন্টরা পাহারা দিচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন কোনো দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এই হামলা গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের চূড়ান্ত ফলাফল। সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারকারী সন্দেহে বিভিন্ন নৌকায় হামলাও চালানো হয়। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও আটক করা হয়। এসব অভিযানে চালানো হামলায় অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছেন।

‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্ট।
‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্ট।

১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণের পর লাতিন আমেরিকায় এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও সরাসরি হস্তক্ষেপ। এই আকস্মিক অভিযান বা ‘লাইটনিং স্ট্রাইক’ পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্রে এমন নগ্ন হস্তক্ষেপ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও শত্রু—উভয় পক্ষই বিস্মিত।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলায় নতুন নেতৃত্ব না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ‘দেশটি পরিচালনা করবে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকা যা করে দেখিয়েছে, বিশ্বের কোনো দেশ তা পারত না।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করবে।

তবে ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ট্রাম্প বলছেন যুক্তরাষ্ট্রই দেশটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, দেশটির সেনাবাহিনী ও সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীরই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

শনিবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে মাদুরোর ‘সাময়িক অনুপস্থিতিতে’ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আসলে তাঁর কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই।’

ডেলসি রদ্রিগেজের বাবা ছিলেন মার্ক্সবাদী গেরিলা নেতা। বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরাধিকার বহন করলেও রদ্রিগেজ ফ্রান্সে শিক্ষিত একজন টেকনোক্র্যাট। ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণি, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও কূটনীতিকদের সঙ্গে তিনি ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বিরোধীদের খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোকেও তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করেন না।

কীভাবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাল?

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাদুরো ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে আমেরিকা অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, মাদক পাচার ও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাদক-সম্রাট আখ্যা দেয়। তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয় ৫ কোটি ডলার।

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার গ্যাং ‘ট্রেন ডি আরাগুয়া’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। তারা ক্যারিবিয়ান সাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। এরপর ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাঙ্কারগুলো আটক করতে থাকে। একই সঙ্গে দেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করে।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। তাঁকে নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। মাদুরো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সমর্থকদের বলেন, তিনি ‘ক্রীতদাসের শান্তি’ চান না। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমাগত চাপের মুখে কারাকাস সরকার কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। মাদুরো বারবার বলছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চান না। এমনকি এক অনুষ্ঠানে তিনি ছাত্রদের সামনে ‘নো ওয়ার, ইয়েস পিস’ গানের তালে নেচেছিলেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের প্রচারণায় করা নাচের নকলও করেছিলেন। শোনা যায়, মাদুরোর এই আচরণ ট্রাম্প মোটেও পছন্দ করেননি। এই নাচই মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্তে ইন্ধন জুগিয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে, বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎকারে মাদুরো বলেছিলেন, তিনি ভেনেজুয়েলার তেল খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের উন্মুক্ত করা অভিযোগপত্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতিপরায়ণ ও অবৈধ সরকার’ পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাদুরো বিশাল মাদক পাচার নেটওয়ার্ক চালান। এর মাধ্যমেই হাজার হাজার টন কোকেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে।

কেন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা মুখোমুখি অবস্থানে?

১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় আসেন। তখন থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। চাভেজ নিজেকে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী নেতা হিসেবে দাবি করতেন। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করেন। এ ছাড়া কিউবা ও ইরানের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলার কারণে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। ২০০২ সালে চাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টা হয়েছিল। ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ ছিল বলে চাভেজ অভিযোগ করেছিলেন।

চাভেজের উত্থান ও মাদুরোর আগমন

হুগো চাভেজ কেবল একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তিনি ভেনেজুয়েলায় 'বলিভারিয়ান বিপ্লব'-এর সূচনা করেছিলেন। তিনি দেশের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন। সেই অর্থ তিনি গরিব মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে শুরু করেন। এতে তিনি নিম্নবিত্তের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে দেশের ধনী শ্রেণি ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চাভেজ হয়ে ওঠেন চক্ষুশূল।

হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো। ছবি: সংগৃহীত
হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো। ছবি: সংগৃহীত

চাভেজ তাঁর শাসনামলে বিরোধীদের কঠোরভাবে দমন করেন। বেসরকারি খাতকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। ২০১১ সালে চাভেজ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি তাঁর বিশ্বস্ত অনুসারী নিকোলাস মাদুরোকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। মৃত্যুর আগে চাভেজ স্পষ্টভাবে মাদুরোকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি ঘোষণা করে যান। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে চাভেজ মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর মাদুরো অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেন ও পরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন।

মাদুরো আমল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের কারণে রিপাবলিকান দলের কট্টরপন্থীদের কাছে ভেনেজুয়েলা ও তার মিত্র কিউবা 'স্বভাবজাত শত্রু' হিসেবে বিবেচিত।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে তৎকালীন সংসদ স্পিকার হুয়ান গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাদুরো ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত হন বলে মনে করা হয়। কারণ ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসন ও অর্থনৈতিক ধসের কারণে জনগণের ক্ষোভ ছিল চরমে। বাইডেন প্রশাসনবিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিরোধী দল ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে গঞ্জালেস জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু মাদুরো দমনপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন।

নতুন নীতি: ‘ডন-রো ডকট্রিন’

ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামে নতুন নীতি ঘোষণা করে। এতে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে হবে। এই নীতির অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলের খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে প্রবেশের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা যাবে।

মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ১৯ শতকের কুখ্যাত ‘মনরো ডকট্রিন’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্য বজায় থাকবে। তিনি নতুন এই রীতিকে ‘ডন-রো ডকট্রিন’ (Don-Roe doctrine) নাম দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবে না।’

কে এই নিকোলাস মাদুরো এবং কেন ট্রাম্প তাঁকে গ্রেপ্তার করলেন?

নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। একসময় তিনি বাস চালক হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে শ্রমিক নেতা হিসেবে রাজনীতিতে আসেন ও হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তিনি চাভেজ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। পরে চাভেজের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হন।

মাদুরোর শাসনকে অনেকেই স্বৈরাচারী হিসেবে বিবেচনা করেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের হিসাবে দেখা যায়, মাদুরোর শাসনামলে ২০ হাজারের বেশি মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা বা ‘এক্সট্রাজুডিশিয়াল কিলিং’-এর শিকার হতে হয়েছে। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর সময়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভেনেজুয়েলার কারাকাসে মার্কিন হামলা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
ভেনেজুয়েলার কারাকাসে মার্কিন হামলা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ডাক দিয়ে আসছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অপরাধী পাঠাচ্ছেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণের অভাব আছে। ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন, মাদুরো আমেরিকার তেল চুরি করছেন।

তবে শনিবারের এই অভিযান ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক। ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা বুঝতেই পারেননি এমন কিছু হতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস ভেনেজুয়েলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই হামলায় বেসামরিক নাগরিক ও সৈন্যসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

এখন কী ঘটবে?

ভবিষ্যৎ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছেন। তিনি নাগরিকদের বিদেশি ‘আক্রমণের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাকে তিনি ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলে ঘোষণা করেছেন।

মাদুরো গ্রেপ্তার হলেও ভেনেজুয়েলার সামরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো টিকে আছে। শনিবারের এই হামলা কি আরও বড় যুদ্ধের শুরু? নাকি কেবল একক অভিযান ছিল? তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক অভিযান চালাবে।

একটি বিষয় পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। তা সামরিক শক্তি দিয়েই হোক বা অন্য উপায়ে। ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করবে। তিনি বলেন, ‘অন্য কেউ এসে ক্ষমতা দখল করুক বা মাদুরো যা রেখে গেছেন তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলুক—এই ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না।’

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’, তা এখনো ধোঁয়াশা। কারাকাসের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সেনাদের হাতে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ভেনেজুয়েলার সৈন্যরা এখনো তাদের ঘাঁটিতে অবস্থান করছে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার মাটিতে সেনা বা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ পাঠানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা তাঁর সব দাবি মেনে নিচ্ছেন। অথচ মাদুরো আটকের পর সেখানকার কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্য ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র এমন যুদ্ধ পরিস্থিতি বা ‘ওয়ার গেমস’-এর মহড়া করেছিল। সেখানে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যপটের অনুকরণ করা হয়। সেই মহড়ার ফলাফলে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা বা ‘ক্যাওস’ দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, এর ফলে দলে দলে শরণার্থী দেশত্যাগ করবে। এ ছাড়া ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে লড়াই শুরু হবে।

ওই ওয়ার গেমস পরিচালনাকারী লাতিন আমেরিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডগলাস ফারা সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা দেখবেন... যা থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই।’ ইতিমধ্যে কলম্বিয়া তাদের সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। তারা শরণার্থীর ঢল নামার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার। অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

Ad 300x250

সম্পর্কিত