
ফিলিস্তিনি পরিচয়, ভূমি ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠা শিল্পী স্লিমান মানসুর মারা গেছেন। দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-মাকাসেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) তাঁর মৃত্যু হয়।
চিত্রকর, ভাস্কর, লেখক ও কার্টুনিস্ট হিসেবে কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনের শিল্পচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মানসুর। তাঁর শিল্পে উঠে এসেছে ফিলিস্তিনের ভূমি, গ্রামীণ জীবন, বাস্তুচ্যুতি, ঐতিহ্য ও মানুষের সামষ্টিক স্মৃতি।
১৯৪৭ সালে রামাল্লার কাছে বিরজেইত শহরে জন্ম মানসুরের। তাঁর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পরিচিত প্রতীকগুলোকে নতুন অর্থে তুলে ধরা। ফিলিস্তিনি নারী, ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্ম, গ্রাম, জলপাই ও কমলাগাছ বারবার ফিরে এসেছে তাঁর কাজে।

মানসুর মনে করতেন, শিল্প শুধু সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি প্রতিরোধেরও ভাষা। ২০২৪ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নিজের কাজের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ভূমির প্রতি টান, তা রক্ষার সংকল্প এবং ফিলিস্তিনের সৌন্দর্য তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। মানসুর বলতেন, ‘জেরুজালেম ফিলিস্তিনের প্রতীক, আর ডোম অব দ্য রক জেরুজালেমের প্রতীক’।
মানসুরের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজগুলোর একটি ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’। ১৯৭৩ সালে আঁকা তার এই চিত্রকর্মে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ ফিলিস্তিনি বিশাল এক ভার কাঁধে নিয়ে নুয়ে আছেন। সেই ভারের আকৃতি চোখের মতো; যার ভেতরে রয়েছে জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক। এই চিত্রকর্মটি পরে ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয় ও প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

মানসুরের শিল্পে ফিলিস্তিনকে বেশিরভাগ সময়েই ক্লান্ত ও নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের অবয়বে দেখা গেছে। আবার অঞ্চলটির বিভিন্ন প্রতীক পেয়েছে আলাদা ঐতিহাসিক অর্থ। ১৯৪৮ সালের নাকবা বা বিপর্যয়ের স্মারক হিসেবে এসেছে কমলাগাছ। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে মানসুর ব্যবহার করেছেন জলপাইগাছ।

১৯৭০-এর দশক থেকে এভাবেই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের নিজস্ব দৃশ্যমান ভাষা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মানসুর। তাঁর ছবিতে ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে পরিচয়, স্মৃতি ও ভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রকাশ।
জেরুজালেমের বেজালেল একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড ডিজাইনে চারুকলায় পড়াশোনা করেছেন মানসুর। শিল্পী হিসেবে কাজের পাশাপাশি কার্টুনিস্ট হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘ কর্মজীবনে রোম প্রাইজ, ইউনেসকো পুরস্কার, নাইল অ্যাওয়ার্ড ফর আরব ক্রিয়েটরস এবং প্যালেস্টাইন প্রাইজ ফর প্লাস্টিক আর্টসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্মাননা পেয়েছেন মানসুর।

শিল্পচর্চার পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পকলার পাঠ দিয়েছেন। আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন মানসুর। তাঁর কাছ থেকেই হাতে-কলমে শিক্ষা নিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের বহু ফিলিস্তিনি শিল্পী।
ফিলিস্তিনি জীবন, বাস্তুচ্যুতি ও ভূমির প্রতি মানুষের গভীর টানকে ক্যানভাসে ধারণ করে স্লিমান মানসুর নির্মাণ করেছেন স্মৃতি, পরিচয় ও প্রতিরোধের এক স্বতন্ত্র ভাষা। তাই মানসুরের শিল্প শুধু শিল্পকর্ম নয় বরং হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনি ইতিহাস ও সামষ্টিক স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ী এক দলিল।
(ডেইলি সাবাহ থেকে অনূদিত ও পরিমার্জিত)
.png)






