জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: একষট্টি সালের ‘আরেক ফাল্গুন’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ৪৪
বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন। সংগৃহীত ছবি

মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত ঝরার ইতিহাস পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রফিক, জব্বার, শফিক, সালাম, বরকতসহ অনেকে। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। সেইসঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকেও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঝরার ইতিহাস যে কেবল বায়ান্নতেই থেমে থাকেনি, আমরা কয়জন তা জানি?

বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য আরও একটি রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাকের রাজপথে প্রাণ দেওয়া ১১ ভাষা শহীদ আজ আমাদের কাছে বিস্মৃতির অতলে। অথচ এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষার জন্য শহীদ হওয়া বিশ্বের প্রথম নারীর নাম।

আজকের লেখায় আমরা জানব সেদিন কী ঘটেছিল আর এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট-ই বা কী।

অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত ও প্রেক্ষাপট

এ আন্দোলনের রয়েছে দীর্ঘ পটভূমি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এই রাজ্যের দুটি প্রধান উপত্যকা হলো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকা। বরাক উপত্যকার প্রধান তিনটি জেলা—শিলচর (কাছাড়), করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে যুগ যুগ ধরে বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষের বসবাস। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এ অঞ্চলের বাঙালিরাই আসাম প্রদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বারবার অসমিয়াদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের স্বকীয় সত্তা টিকিয়ে রাখতে বেছে নিতে হয়েছে আন্দোলন সংগ্রামের পথ।

১৮৭৪ সালে যখন বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে শ্রীহট্টসহ কাছাড় জেলা বিচ্ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন থেকেই এ সংগ্রাম আরও তীব্রতর হয়। এ সময় অসমিয়ারা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত হয়ে বাঙালি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে অসমিয়াকরণের প্রয়াস চালায়।

স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে অসমিয়া শেখানো হয়। এর ফলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে মাত্র চার বছরে ২৫০টি বাংলা মাধ্যম স্কুলের ২৪৭টিই বন্ধ হয়ে যায়। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব বাড়তেই থাকে। ১৯৫০ সালের দিকে উগ্রপন্থি অসমিয়ারা শুরু করে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন। সেই সঙ্গে শুরু হয় অহমিয়াকে শিক্ষার বাহন ও সরকারি ভাষা করার প্রচেষ্টা।

১৯৫৩ সাল পর্যন্ত আসাম বিধানসভায় বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে বক্তব্য দেওয়ার বিধান ছিল। কিন্তু নতুন আইন পাস করে তা রহিত করা হয়। এরপরেও আইসভার অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে বাংলায় বক্তব্য দেওয়া যেত। ১৯৫৪ সালে অসমিয়াকে সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও শেষ পর্যন্ত সে উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৬০ সালের ৩ মার্চ আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধান সভায় অসমিয়াকে রাজ্যের সরকারি ভাষা করা হবে বলে এক বক্তৃতায় ঘোষণা করেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাবটি ছিল বরাক উপত্যকার লাখ লাখ বাংলাভাষী মানুষের জন্য এক অশনিসংকেত।

এর কিছুদিন পরে, অর্থাৎ—১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস অসমিয়াকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর প্রতিবাদে প্রদেশজুড়ে আন্দোলন দানা বাঁধে। বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবিতে সভা-সমাবেশ, সম্মেলন চলতেই থাকে। সে বছর ২ ও ৩ জুলাই আয়োজন করা হয় ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’। চপলাকান্তের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সম্মেলনে রাজ্যের অগণিত মানুষ সমবেত হয়। অনুষ্ঠানটি শুরু করা হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’ গানটি গেয়ে।

এছাড়া সেখানে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন লুসাই, খাসিয়া, গারো, মণিপুরি, বাঙালি—সবাই।

সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয়, ভাষা প্রশ্নে সবাই আপসহীন ভূমিকায় থাকবে।

কিন্তু সম্মেলনের পর বাঙালিদের ওপর শুরু হয় নির্বিচার হামলা ও অত্যাচার-নির্যাতন। এমন অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধানসভায় ভাষাসংক্রান্ত বিলটি উত্থাপন করেন এবং তা পাস করে আইনে পরিণত করেন।

এই ‘আসাম অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার ফলে বরাক উপত্যকার লাখ লাখ বাঙালি নিজ বাসভূমে রাতারাতি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হওয়ার এক ভয়ানক শঙ্কায় পড়ে যান। চরম বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ জনগণ। আসামজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক দাঙ্গা, লুটতরাজ ও বাঙালি উচ্ছেদ অভিযান। নিজেদের ভিটেমাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করা বাঙালিরা হঠাৎ করেই হামলার শিকার হতে থাকেন।

পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ও অমানবিক রূপ নেয় যে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে প্রতিবেশি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ ছাড়া আরও প্রায় ৯০ হাজার বাঙালি নিজেদের সবকিছু হারিয়ে বরাক উপত্যকায় এসে উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেন।

বাঙালিদের সব দাবি উপেক্ষা করে ২৪ অক্টোবর বিলটি পাস হয়। উপেক্ষিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর দাবি। এর প্রতিবাদে আইনসভার অনেক সদস্য সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। বিল পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরাক উপত্যকার বাঙালিদের আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে উঠে।

আন্দোলনের রূপরেখা ও কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ

আইন পাস করা হলেও থামানো যায়নি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রাণের আকুতি।

বাংলা ভাষাকেও একইভাবে সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের দাবিতে কতকগুলো প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। একটি প্রস্তাবে বলা হয়—‘যদি এ আইন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেওয়া না হয়, তবে বাঙালি সমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা রক্ষার্থে আসামের বাংলা ভাষা-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে।’

আপন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বরাক উপত্যকার বিশাল জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসমিয়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবিতে সোচ্চার হয়।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৬১ সালের শুরু থেকে বাংলা ভাষা-আন্দোলন ক্রমশ প্রবল হতে থাকে। একের পর এক গড়ে ওঠে বাংলা ভাষা রক্ষা সমিতি। ১৪ এপ্রিল কাছাড় জেলার সর্বত্র শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘোষিত হয় এ সংকল্প ‘জান দেব, জবান দেব না।’

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে রথীন্দ্রনাথ সেনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। এই সংগঠনটি মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে।

কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ ভাষা আইন সংশোধনের দাবিতে আসাম সরকারকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়। কিন্তু সরকার সেই দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত না করায়, সংগঠনটি ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরসহ পুরো বরাক উপত্যকায় একটি সর্বাত্মক হরতাল ও সত্যাগ্রহের ডাক দেয়। এই সত্যাগ্রহের মূল উদ্দেশ্য ছিল অহিংস উপায়ে সরকারি অফিস-আদালত এবং ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে নিজেদের অধিকারের দাবি সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু প্রশাসন এই অহিংস আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চরম দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। হরতালের আগের দিন, অর্থাৎ ১৮ মে রাতেই পুলিশ রাতের অন্ধকারে অভিযান চালিয়ে রথীন্দ্রনাথ সেন, বিধুভূষণ চৌধুরীসহ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। প্রশাসনের ধারণা ছিল, নেতাদের গ্রেপ্তার করলে আন্দোলনকারীরা পিছু হটবে। কিন্তু নেতাদের এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দমার বদলে জনরোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সাধারণ ছাত্র, নারী, বৃদ্ধ সবাই পরের দিনের হরতাল সফল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।

উনিশে মে: শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের সেই রক্তাক্ত দুপুর

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৯৬১ সালের ১৯ মে। দিনটি ছিল শুক্রবার। সকাল থেকেই শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হতে থাকে। শিলচরের তারাপুর রেলওয়ে স্টেশনে (যা বর্তমানে শিলচর রেলওয়ে স্টেশন নামে পরিচিত) হাজারো হাজার মানুষ জড়ো হন। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে স্টেশন চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা রেললাইনের ওপর বসে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়ে সত্যাগ্রহ পালন করছিলেন। সকালের দিকে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেও পরিবেশ মোটামুটি শান্তই ছিল।

কিন্তু বেলা আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি হঠাৎ এক নাটকীয় রূপ নেয়। সেসময় পুলিশের একটি ট্রাক স্টেশনে এসে পৌঁছায়। ওই ট্রাকে করে এর আগে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন সত্যাগ্রহী ও পিকেটারদের নিয়ে আসা হচ্ছিল। ট্রাক থেকে তাদের নামানোর সময় আকস্মিকভাবেই ট্রাকটিতে আগুন ধরে যায়। কীভাবে এই আগুন লেগেছিল, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে, তবে এই আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ট্রাকে আগুন লাগার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার নামে সেখানে উপস্থিত পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী (আসাম রাইফেলস) নিরস্ত্র জনতার ওপর কোনো উস্কানি ছাড়াই বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে অনেকেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে শুরু হয় মানুষের আর্তনাদ ও দৌড়াদৌড়ি। ঠিক সেই চরম বিশৃঙ্খল মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিস ডাকার জন্য পুলিশের এক পদস্থ কর্মকর্তা ইংরেজিতে 'ফায়ার, ফায়ার' বলে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা শব্দটির ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে। তারা এটিকে সাধারণ জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ (ওপেন ফায়ার) ভেবে মারাত্মক এক ভুল করে বসে। কোনো আগাম সতর্কবাণী ছাড়াই তারা স্টেশনে উপস্থিত নিরস্ত্র, নিরীহ ও অহিংস জনতার ওপর বন্দুক তাক করে। শুরু হয় ইতিহাসের এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ২টা বেজে ৩৫ মিনিট। মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা ১৭ রাউন্ড নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে।

আসাম রাইফেলসের সেই পৈশাচিক গুলিবর্ষণে মুহূর্তের মধ্যে শিলচর স্টেশনের মাটি রক্তে লাল হয়ে যায়। প্রাণ হারান ১১ জন অকুতোভয় বাঙালি। এই শহীদদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী স্কুলছাত্রী, যার নাম কমলা ভট্টাচার্য। গুলির বিকট শব্দ আর চারদিকের হুড়োহুড়ির মধ্যে কমলা দেখতে পান তাঁর ছোট বোন মঙ্গলা মাটিতে পড়ে গেছে। বিপদ বুঝে কমলা তাঁর ছোট বোনকে বাঁচাতে নিজের জীবন তুচ্ছ করে ছুটে যান। ঠিক তখনই পুলিশের বন্দুক থেকে ছুটে আসা একটি বুলেট কমলার চোখ ভেদ করে তাঁর মাথায় বিদ্ধ হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কমলা, নিভে যায় একটি তাজা প্রাণ। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রাণ দেওয়া এই কমলা ভট্টাচার্যকেই বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম নারী ভাষা শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সেদিনের সেই ভয়াল হত্যাযজ্ঞে কমলা ছাড়াও আরও ১০ বীর সন্তান নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। মোট ১১ শহীদের মধ্যে ঘটনাস্থলে ৯ জন এবং পরে আরো দু-জন মৃত্যুবরণ করেন। নিহতেরা হলেন—কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং সুকোমল পুরকায়স্থ। আহত হয়েছিলেন আরও অসংখ্য সাধারণ মানুষ।

এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় বলা হয় : ‘বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবিতে কাছাড় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে যে আন্দোলন শুরু হইয়াছে, আজ প্রথম দিনেই সশস্ত্র পুলিশ শিলচর শহরে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সত্যাগ্রহীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চালাইয়া বালিকা ও শিশুসহ আটজনকে ঘটনাস্থলে নিহত করিয়াছে। শিলচর রেলওয়ে স্টেশন কম্পাউন্ডে এই বর্বর ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। চারজন বালিকাসহ প্রায় ৩০ [জনের] শরীরের ঊর্ধ্বাশ গুরুতররূপে আহত হইয়াছে।’

আন্দোলনের পরিণতি

উনিশে মের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বরাক উপত্যকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আসাম সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাতৃভাষার প্রতি এই অবিস্মরণীয় ভালোবাসার কাছে নতি স্বীকার করে সরকার আসাম ভাষা আইন সংশোধন করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে প্রশাসনিক ও সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

ভাষার জন্য এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা, দুই জায়গাতেই রক্ত ঝরেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে এই ১১ জন ভাষা শহীদের নাম আমাদের প্রজন্মের কাছে সেভাবে পৌঁছায়নি।

পূর্ব-বাংলার বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি যেমন আমাদের অহংকার, ঠিক তেমনি বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনও বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক মর্মস্পর্শী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত