জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

স্বার্থপর মানুষকে উদার বানাবে ‘ব্রেন স্টিমুলেশন’

শুনলে অবাক লাগতে পারে, গবেষকেরা এমন একটি পদ্ধতির প্রভাব পরীক্ষা করেছেন, যা সাময়িকভাবে মানুষের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দাবি করেছেন, মস্তিষ্কে মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠিয়ে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মানুষের স্বার্থপরতা কমানো সম্ভব।

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ০৩
স্বার্থপর মানুষকে উদার বানাবে ‘ব্রেন স্টিমুলেশন’। এআই জেনারেটেড ছবি

আপনার বন্ধুটি কি কৃপণ? কিংবা পরিচিত কেউ কি নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না? আমরা প্রায়ই ভাবি, ইস! যদি মানুষের স্বভাবটা একটু বদলে দেওয়া যেত! যদি স্বার্থপর মানুষগুলোকে একটু উদার বানানো যেত!

শুনলে অবাক লাগতে পারে, গবেষকেরা এমন একটি পদ্ধতির প্রভাব পরীক্ষা করেছেন, যা সাময়িকভাবে মানুষের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দাবি করেছেন, মস্তিষ্কে মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠিয়ে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মানুষের স্বার্থপরতা কমানো সম্ভব।

টাকা ভাগের অদ্ভুত খেলা

গবেষণাটি কীভাবে কাজ করে, তা দেখার জন্য বিজ্ঞানীদের দল ৪৪ জন স্বেচ্ছাসেবককে বেছে নেন। তাঁদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়। বলা হয়, তাঁরা যেন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিজেদের এবং এক অজানা সঙ্গীর মধ্যে ভাগ করে নেয়। স্বাভাবিকভাবেই, মানুষ নিজের জন্য বেশি রেখে অন্যকে কম দিতে চায়।

কিন্তু চমকটা ঘটে তখন, যখন গবেষকরা ওই স্বেচ্ছাসেবকদের মস্তিষ্কের সামনের (ফ্রন্টাল) এবং পেছনের (প্যারাইটাল) অংশে মৃদু বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা (সিমুলেশন) দিতে শুরু করেন। দেখা গেল, বিদ্যুৎ প্রবাহ চলাকালীন অংশগ্রহণকারীরা গড়ে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ সঙ্গীকে দিয়েছেন।

গবেষকদের প্রধান অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান রাফ বিবিসিকে বলেন, ‘হয়ত এর প্রভাব খুব বিশাল কিছু নয়। কিন্তু ফলাফলগুলো বেশ ধারাবাহিক। পরিসংখ্যান বলছে, মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট অংশে উদ্দীপনা দেওয়ার পর মানুষের অন্যের জন্য খরচ করার ইচ্ছা স্পষ্টভাবে বেড়েছে।’

স্বভাব বদলাতে দরকার ‘জিম’ ফর্মুলা

এখন প্রশ্ন হলো, একবার থেরাপি দিলেই কি একজন মানুষ আজীবনের জন্য দানবীর হয়ে যাবেন? গবেষকরা বলছেন, না। বিষয়টি অনেকটা জিমে যাওয়ার মতো।

কিন্তু চমকটা ঘটে তখন, যখন গবেষকরা ওই স্বেচ্ছাসেবকদের মস্তিষ্কের সামনের (ফ্রন্টাল) এবং পেছনের (প্যারাইটাল) অংশে মৃদু বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা (সিমুলেশন) দিতে শুরু করেন। দেখা গেল, বিদ্যুৎ প্রবাহ চলাকালীন অংশগ্রহণকারীরা গড়ে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ সঙ্গীকে দিয়েছেন।

যেমন আপনি যদি একদিন জিমে গিয়ে ব্যায়াম করেন, তবেই কি আপনার শরীর ফিট হয়ে যাবে? না। শরীর গঠন করতে হলে যেমন মাসের পর মাস নিয়মিত জিমে ঘাম ঝরাতে হয়, মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনও ঠিক তেমনই। দীর্ঘমেয়াদে আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে এ ধরনের উদ্দীপনা বারবার প্রয়োগ করতে হতে পারে, তবে বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন।

চিকিৎসায় নতুন আশার আলো

স্বার্থপরতা কমানোর এই প্রযুক্তি কি শুধু দানের জন্যই? মোটেও না। গবেষকেরা বলছেন, এই ধরনের পদ্ধতি ভবিষ্যতে মস্তিষ্কজনিত কিছু সমস্যার চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা অন্যের আবেগ বুঝতে পারেন না কিংবা সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে অক্ষম। তাঁদের মস্তিষ্কের যে অংশটি সহানুভূতির সিগন্যাল দেয়, সেটি হয়ত ঠিকমতো কাজ করে না।

এই বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনার প্রবণতা বাড়তে পারে।

আচরণে প্রভাব, কিন্তু ভয়ের কারণ নেই

‘মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ’—কথাটা শুনলেই অনেকের মনে ইলেকট্রিক শকের ভীতি জাগতে পারে। কিন্তু এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সেই ভয় দূর করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মোটেও ভয়ের ছিল না। মনে হচ্ছিল মাথার ওপর উষ্ণ ঝরনার পানি বা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি যখন টাকা ভাগ করে দিচ্ছিলাম, একবারও মনে হয়নি কেউ আমাকে জোর করে কিছু করাচ্ছে। সিদ্ধান্তগুলো আমি নিজেই নিচ্ছিলাম।’

এখন প্রশ্ন হলো, একবার থেরাপি দিলেই কি একজন মানুষ আজীবনের জন্য দানবীর হয়ে যাবেন? গবেষকরা বলছেন, না। বিষয়টি অনেকটা জিমে যাওয়ার মতো।

গবেষকেরা মনে করেন, একাধিক মানুষের মধ্যে একই ধরনের মস্তিষ্কীয় কার্যকলাপ পাওয়া থেকে জোরালো ইঙ্গিত মেলে যে পরোপকারিতা মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের অংশ হতে পারে। বিবর্তনের ধারায় এটি গড়ে উঠেছে, যাতে আমরা একে অপরের যত্ন নিই।

তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মানুষের আচরণে এভাবে প্রভাব ফেলা কি উদ্বেগের কারণ নয়? গবেষক রাফ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘একেবারেই না।’ তাঁর ব্যাখ্যা, এ ধরনের গবেষণা কঠোর চিকিৎসা-নিয়ম ও নৈতিক তদারকির আওতায় পরিচালিত হয়। প্রতিটি ধাপ নৈতিক কমিটির অনুমোদন পায়। অংশগ্রহণকারীরা আগে থেকেই সব তথ্য জেনে লিখিত সম্মতি দেন এবং চাইলে যেকোনো সময় সরে যাওয়ার অধিকার রাখেন।

রাফ আরও একটি তুলনা টানেন। তিনি বলেন, আমরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখি বা বিজ্ঞাপন দেখি, তখন অনেক সময় না বুঝেই সেগুলোর প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিই। সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ খুব কম থাকে।

সব মিলিয়ে, এই গবেষণা দেখায় যে পরোপকার বা ‘আল্ট্রুইজম’ আসলে আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান হয়ত শুধু সেই সুপ্ত প্রবণতাকে সামান্য স্পর্শ করে দেখিয়েছে। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান হয়ত মানসিক স্বাস্থ্যচিকিৎসা বা সামাজিক আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। এতে আমরা আরও সহানুভূতিশীল ও মানবিক সমাজ গড়ার পথে এগোতে পারব।

* বিবিসি অবলম্বনে

Ad 300x250

সম্পর্কিত