বাঙালিদের যুক্তরাষ্ট্র যাত্রার ইতিহাস পুরোনো। তার ধারাবাহিকতায় নিউইয়র্কে নিবন্ধিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভোটারের সংখ্যাই এখন ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৮। দিনে দিনে এই বিপুল জনগোষ্ঠী কীভাবে গেলেন নিউইয়র্কে? ইতিহাসের গা ছুঁয়ে, বইপত্র ঘেঁটে তার তত্ত্বতালাশ।
গৌতম কে শুভ

আজকাল নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার ‘লিটল বাংলাদেশ’—এ ঢুঁ দিলেই পাওয়া যায় বাংলাদেশিদের সরব উপস্থিতি। কেউ সেখানে চালাচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কেউ চিকিৎসক, কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, কবে থেকে শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের এই অভিবাসনযাত্রা?
বাঙালিরা ঠিক কখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাস করতে শুরু করেন, সেই তথ্য ইতিহাসে পরিষ্কার নয়। তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৭৬৩ সালে কিছু বাঙালি পয়লা গিয়েছিলেন মার্কিন দেশে। পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে কিছু মানুষকে দাস বা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া আর জর্জিয়ায়।

গবেষক সিলভিয়েন এ. ডিউফের বইয়ে এমন তথ্যই পাওয়া যায়। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক একে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে আমলে নিতে নারাজ।
তবে আমরা নির্ভর করতে পারি আরও কিছু জীবন্ত গল্পে। ১৮৮০-৯০ সালের দিকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ী ও ফেরিওয়ালারা জাহাজ থেকে নামতেন এলিস দ্বীপে। গ্রাম থেকে ব্যাগভর্তি করে নিয়ে যেতেন মসলিন সিল্ক আর হাতে সেলাই করা রেশমি কাপড়। এরপর সেসব বিক্রি করতে করতে পৌঁছে যেতেন নিউ জার্সির সমুদ্রপাড়ের দোকানে। তারপর সেখান থেকে যেতেন আরও দক্ষিণে।
‘শিপ জাম্পার’
এর দশক তিন পরে আমরা ফিরে যেতে পারি একজন হাবিব উল্লাহর গল্পে। ১৯২০–এর দশকে আরও অনেকের মতো নোয়াখালী থেকে জাহাজের নাবিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি। জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিলেন সেই দেশের মাটিতে। এর কিছুদিন পর তিনি পুয়ের্তোরিকান এক নারীকে বিয়েও করেছিলেন। পরে বসতি গড়েন নিউইয়র্কের হার্লেম এলাকায়।
১৯৪০-এর দশকে ম্যানহাটনের থিয়েটার এলাকায় খুলেছিলেন ‘বেঙ্গল গার্ডেন’ রেস্তোরাঁ। ভিভেক বাল্ডের বই ‘বেঙ্গলি হার্লেম অ্যান্ড দ্যা লস্ট হিস্ট্রোরিস অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা’তে পাওয়া যায় এ ইতিহাস। তখন যাঁরা এভাবে জাহাজ থেকে লাফিয়ে নিউইয়র্কের মাটিতে নামতেন, ওই শহরের বাসিন্দাদের কাছে তাঁদের পরিচয় ছিল ‘শিপ জাম্পার’।

বাংলার এই শিপ জাম্পারদের নিয়ে বাল্ড বিশদে লিখেছেন তাঁর গবেষণায়। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯২০ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত নোয়াখালী, সিলেট ও পশ্চিমবাংলার হুগলির কিছু মানুষ ব্রিটিশ জাহাজে চেপে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন জাহাজের কর্মী, কেউবা বাবুর্চি।
কাজ করতে করতে তাঁদের অনেকেই লুকিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতেন। এরপর গা–ঢাকা দিতেন নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েট বা বাল্টিমোর শহরে। কারণ, এসব শহরে কৃষ্ণাঙ্গ আর অভিবাসীদের জন্য সস্তায় থাকার জায়গা মিলত।
বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তাঁরা বাস করতেন সেখানে। আর বিয়ে করতেন ক্রেওল, পুয়ের্তোরিকান ও আফ্রিকান-আমেরিকান নারীদের। তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই বাঙালিরা নিজেদের তখন পরিচয় দিতেন ‘স্প্যানিশ’, ‘পুয়ের্তোরিকান’, ‘আরব’ বা কখনো কখনো ‘মুর’ হিসেবে। সে সময় তাঁরা সেখানে শিকড় গাঁড়তে চেষ্টা করছিলেন। ফলে ভিন্ন জাতি, ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যেও তাঁরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন সংসার–সহাবস্থান।
ঘরছুট এই মুসলিম বাঙালি কমিউনিটিতেও ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতি। নোয়াখালী, সিলেটসহ বাংলাদেশের নানা অঞ্চল থেকে যাঁরা হার্লেমে থাকতেন, তাঁদের মধ্যে ইসলামের চর্চা ছিল বেশ ভালোভাবেই। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে নিউইয়র্কে বাঙালি মুসলমানদের নেতা ছিলেন ইব্রাহিম চৌধুরী। তিনি ছিলেন ইমাম। নামাজ পড়াতেন, ঈদ উৎসবের আয়োজনও করতেন। আর সম্পর্ক গড়তেন আফ্রিকান-আমেরিকান মুসলমানদের সঙ্গে।
পরে ১৯৪৭ সালে ভাগ হয়ে যায় আমাদের উপমহাদেশ। বেড়ে যায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। তখন দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে আর নিরাপদ জীবনের আশায় অনেকেই পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন যুক্তরাষ্ট্রে।

কিন্তু সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়ার মানুষদের জন্য বৈধভাবে যাওয়ার পথ প্রায় বন্ধই ছিল। এরপর সময় বদলাতে শুরু করে ১৯৫২ সালে। সেবার যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হয় ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’। এই আইনে কিছুটা হলেও খুলে যায় এশীয়দের তথা আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার দরজা। এই আইনে বলা হয়, যদি কেউ কোনো আমেরিকান নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে তিনি পাকাপাকিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পাবেন। এটাকে বলা হতো ‘স্পাউসাল পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি’।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬৫ সালে। নতুন আইন অনুমোদন করার ফলে উঠে যায় ভিসার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জাতিগত বৈষম্য। তৈরি হয় বৈধ পথে সে দেশে যাওয়ার সুযোগ। আইনে তখন আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বসবাসকারী অভিবাসীরা চাইলে তাঁদের পরিবারকেও ওই দেশে নিয়ে যেতে পারবেন। এরপর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে শুরু হয় বাঙালি ছাত্র, শিক্ষিত পেশাজীবী আর সেখানে বসবাসকারী অভিবাসী মানুষদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রযাত্রা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় নতুন অভিবাসনের ধারা। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট থাকায় তরুণদের কেউ কেউ তখন দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। আর গেল শতকের আশির দশকে উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে শুরু করে। এভাবেই মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন শহরে তৈরি হতে থাকে ছোট ছোট বাংলাদেশি বসতি।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বড় জোয়ার আসে নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হয় নতুন এক অভিবাসন আইন, যার আওতায় ১৯৯৫ সাল থেকে চালু হয় ‘ডাইভারসিটি ভিসা’ বা ডিভি লটারি। বাংলাদেশিরা এই সুযোগ খুব ভালোভাবে কাজে লাগায়। বৈধভাবে পরিবার নিয়ে আমেরিকায় থিতু হওয়ার সুযোগ অনেকেই ছাড়তে রাজি হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ভিসার নিয়ম ছিল, যে কেউই ভিসার আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কাউকে শনাক্তকারী (রেফারেন্স) হিসেবে দেখাতে হবে। তাই এ সময় নতুন যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাঁদের অনেকেই সেখানে বাস করা বাংলাদেশিদের খুঁজে নিতেন। এর ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক। পোক্ত হয় নিজস্ব কমিউনিটি। তবে ২০১২ সালে বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় লটারির এই সুযোগ।

পরের গল্প সবারই জানা। প্রায় প্রতিদিনই শোনা যায়, কেউ না কেউ পাড়ি দিচ্ছেন তাঁদের স্বপ্নের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে। ধীরে ধীরে সেখানে বেড়েই চলেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা। বিশেষত, নিউইয়র্ক তো এখন বাংলা ভাষায় কথা বলা লোকজনে ভর্তি। এই বাংলাদেশিদের কেউ পড়তে, কেউবা যান কাজ করতে। যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে বেশির ভাগ মানুষই জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে চান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশির সংখ্যা কত, তার সঠিক তথ্য পাওয়া ভার। তবে বেসরকারি হিসেবে পাঁচ থেকে সাত লাখের মতো বলে মনে করা হয়। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন আনুমানিক তিন লাখ মানুষ। ২০২১ থেকে ২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
চলতি বছরের ১ মে পিউ রিসার্চ সেন্টার তাদের ওয়েবসাইটে এটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে ৭১ শতাংশই অভিবাসী। এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ এখানে আছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আর ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন।

আজকাল নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার ‘লিটল বাংলাদেশ’—এ ঢুঁ দিলেই পাওয়া যায় বাংলাদেশিদের সরব উপস্থিতি। কেউ সেখানে চালাচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কেউ চিকিৎসক, কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, কবে থেকে শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের এই অভিবাসনযাত্রা?
বাঙালিরা ঠিক কখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাস করতে শুরু করেন, সেই তথ্য ইতিহাসে পরিষ্কার নয়। তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৭৬৩ সালে কিছু বাঙালি পয়লা গিয়েছিলেন মার্কিন দেশে। পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে কিছু মানুষকে দাস বা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া আর জর্জিয়ায়।

গবেষক সিলভিয়েন এ. ডিউফের বইয়ে এমন তথ্যই পাওয়া যায়। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক একে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে আমলে নিতে নারাজ।
তবে আমরা নির্ভর করতে পারি আরও কিছু জীবন্ত গল্পে। ১৮৮০-৯০ সালের দিকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ী ও ফেরিওয়ালারা জাহাজ থেকে নামতেন এলিস দ্বীপে। গ্রাম থেকে ব্যাগভর্তি করে নিয়ে যেতেন মসলিন সিল্ক আর হাতে সেলাই করা রেশমি কাপড়। এরপর সেসব বিক্রি করতে করতে পৌঁছে যেতেন নিউ জার্সির সমুদ্রপাড়ের দোকানে। তারপর সেখান থেকে যেতেন আরও দক্ষিণে।
‘শিপ জাম্পার’
এর দশক তিন পরে আমরা ফিরে যেতে পারি একজন হাবিব উল্লাহর গল্পে। ১৯২০–এর দশকে আরও অনেকের মতো নোয়াখালী থেকে জাহাজের নাবিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি। জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিলেন সেই দেশের মাটিতে। এর কিছুদিন পর তিনি পুয়ের্তোরিকান এক নারীকে বিয়েও করেছিলেন। পরে বসতি গড়েন নিউইয়র্কের হার্লেম এলাকায়।
১৯৪০-এর দশকে ম্যানহাটনের থিয়েটার এলাকায় খুলেছিলেন ‘বেঙ্গল গার্ডেন’ রেস্তোরাঁ। ভিভেক বাল্ডের বই ‘বেঙ্গলি হার্লেম অ্যান্ড দ্যা লস্ট হিস্ট্রোরিস অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা’তে পাওয়া যায় এ ইতিহাস। তখন যাঁরা এভাবে জাহাজ থেকে লাফিয়ে নিউইয়র্কের মাটিতে নামতেন, ওই শহরের বাসিন্দাদের কাছে তাঁদের পরিচয় ছিল ‘শিপ জাম্পার’।

বাংলার এই শিপ জাম্পারদের নিয়ে বাল্ড বিশদে লিখেছেন তাঁর গবেষণায়। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯২০ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত নোয়াখালী, সিলেট ও পশ্চিমবাংলার হুগলির কিছু মানুষ ব্রিটিশ জাহাজে চেপে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন জাহাজের কর্মী, কেউবা বাবুর্চি।
কাজ করতে করতে তাঁদের অনেকেই লুকিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতেন। এরপর গা–ঢাকা দিতেন নিউইয়র্ক, ডেট্রয়েট বা বাল্টিমোর শহরে। কারণ, এসব শহরে কৃষ্ণাঙ্গ আর অভিবাসীদের জন্য সস্তায় থাকার জায়গা মিলত।
বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তাঁরা বাস করতেন সেখানে। আর বিয়ে করতেন ক্রেওল, পুয়ের্তোরিকান ও আফ্রিকান-আমেরিকান নারীদের। তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই বাঙালিরা নিজেদের তখন পরিচয় দিতেন ‘স্প্যানিশ’, ‘পুয়ের্তোরিকান’, ‘আরব’ বা কখনো কখনো ‘মুর’ হিসেবে। সে সময় তাঁরা সেখানে শিকড় গাঁড়তে চেষ্টা করছিলেন। ফলে ভিন্ন জাতি, ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যেও তাঁরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন সংসার–সহাবস্থান।
ঘরছুট এই মুসলিম বাঙালি কমিউনিটিতেও ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতি। নোয়াখালী, সিলেটসহ বাংলাদেশের নানা অঞ্চল থেকে যাঁরা হার্লেমে থাকতেন, তাঁদের মধ্যে ইসলামের চর্চা ছিল বেশ ভালোভাবেই। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে নিউইয়র্কে বাঙালি মুসলমানদের নেতা ছিলেন ইব্রাহিম চৌধুরী। তিনি ছিলেন ইমাম। নামাজ পড়াতেন, ঈদ উৎসবের আয়োজনও করতেন। আর সম্পর্ক গড়তেন আফ্রিকান-আমেরিকান মুসলমানদের সঙ্গে।
পরে ১৯৪৭ সালে ভাগ হয়ে যায় আমাদের উপমহাদেশ। বেড়ে যায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। তখন দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে আর নিরাপদ জীবনের আশায় অনেকেই পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন যুক্তরাষ্ট্রে।

কিন্তু সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়ার মানুষদের জন্য বৈধভাবে যাওয়ার পথ প্রায় বন্ধই ছিল। এরপর সময় বদলাতে শুরু করে ১৯৫২ সালে। সেবার যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হয় ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’। এই আইনে কিছুটা হলেও খুলে যায় এশীয়দের তথা আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার দরজা। এই আইনে বলা হয়, যদি কেউ কোনো আমেরিকান নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে তিনি পাকাপাকিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পাবেন। এটাকে বলা হতো ‘স্পাউসাল পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি’।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬৫ সালে। নতুন আইন অনুমোদন করার ফলে উঠে যায় ভিসার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জাতিগত বৈষম্য। তৈরি হয় বৈধ পথে সে দেশে যাওয়ার সুযোগ। আইনে তখন আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বসবাসকারী অভিবাসীরা চাইলে তাঁদের পরিবারকেও ওই দেশে নিয়ে যেতে পারবেন। এরপর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে শুরু হয় বাঙালি ছাত্র, শিক্ষিত পেশাজীবী আর সেখানে বসবাসকারী অভিবাসী মানুষদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রযাত্রা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় নতুন অভিবাসনের ধারা। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট থাকায় তরুণদের কেউ কেউ তখন দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। আর গেল শতকের আশির দশকে উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে শুরু করে। এভাবেই মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন শহরে তৈরি হতে থাকে ছোট ছোট বাংলাদেশি বসতি।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বড় জোয়ার আসে নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হয় নতুন এক অভিবাসন আইন, যার আওতায় ১৯৯৫ সাল থেকে চালু হয় ‘ডাইভারসিটি ভিসা’ বা ডিভি লটারি। বাংলাদেশিরা এই সুযোগ খুব ভালোভাবে কাজে লাগায়। বৈধভাবে পরিবার নিয়ে আমেরিকায় থিতু হওয়ার সুযোগ অনেকেই ছাড়তে রাজি হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ভিসার নিয়ম ছিল, যে কেউই ভিসার আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কাউকে শনাক্তকারী (রেফারেন্স) হিসেবে দেখাতে হবে। তাই এ সময় নতুন যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাঁদের অনেকেই সেখানে বাস করা বাংলাদেশিদের খুঁজে নিতেন। এর ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক। পোক্ত হয় নিজস্ব কমিউনিটি। তবে ২০১২ সালে বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় লটারির এই সুযোগ।

পরের গল্প সবারই জানা। প্রায় প্রতিদিনই শোনা যায়, কেউ না কেউ পাড়ি দিচ্ছেন তাঁদের স্বপ্নের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে। ধীরে ধীরে সেখানে বেড়েই চলেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা। বিশেষত, নিউইয়র্ক তো এখন বাংলা ভাষায় কথা বলা লোকজনে ভর্তি। এই বাংলাদেশিদের কেউ পড়তে, কেউবা যান কাজ করতে। যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে বেশির ভাগ মানুষই জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে চান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশির সংখ্যা কত, তার সঠিক তথ্য পাওয়া ভার। তবে বেসরকারি হিসেবে পাঁচ থেকে সাত লাখের মতো বলে মনে করা হয়। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন আনুমানিক তিন লাখ মানুষ। ২০২১ থেকে ২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
চলতি বছরের ১ মে পিউ রিসার্চ সেন্টার তাদের ওয়েবসাইটে এটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে ৭১ শতাংশই অভিবাসী। এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ এখানে আছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আর ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও পেয়ে গেছেন।
আজকাল খেলনার দোকানে শুধু ছোট ছেলে-মেয়েদেরই দেখা যায় না, সেখানে পঁচিশ, ত্রিশ এমনকি এর চেয়ে বেশি বয়সীদেরও দেখা মিলছে। এখন তাদেরও দেখা যায় হাসিমুখে বিভিন্ন খেলনা নেড়ে-চেড়ে দেখছেন বা কিনছেন। কোনো শিশুর জন্য নয়, বরং তারা খেলনাটি কিনছেন নিজের জন্যই!
৯ ঘণ্টা আগে
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বিতর্কিত ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই তত্ত্বে বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত আর কমিউনিজম বনাম পুঁজিবাদের মতো মতাদর্শভিত্তিক থাকবে না।
১১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কত টাকা বেতন-ভাতা পান, এ প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বরাবরই কৌতূহলের জন্ম দেয়। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সময় এই আলোচনা আরও জোরালো হয়। বেতনের বাইরে তাঁরা আর কী কী সুযোগ-সুবিধা পান, রাষ্ট্র তাঁদের পেছনে কী ধরনের খরচ বহন করে, এসব নিয়েও মানুষে
১১ ঘণ্টা আগে
পাঠ্যপুস্তকের ভাষা কোনো নিরীহ বস্তু নয়। এর পেছনে থাকে দৃষ্টিভঙ্গি আর রাষ্ট্রের নীরব উপস্থিতি। আরেকটি সত্য হলো, পাঠ্যবই রচনার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নিরাপত্তা-ভাবনা বড় হয়ে ওঠে: ‘এটা লিখলে বিতর্ক হবে না তো?
১ দিন আগে