নস্টালজিয়া আমাদেরকে দিয়ে শুধু স্মৃতি রোমন্থন না, সেইসাথে স্মৃতির দুনিয়ারে পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করাইতে চায়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ থেকে শুরু করে মোদির ‘রামরাজ্য’, সবটাই একটা আদর্শ অতীতের ছবিরে কেন্দ্র করে নির্মিত স্বৈরাচারী প্রকল্প, আর তা চালিত হয় পলিটিসাইজড নস্টালজিয়ার ঘোরে থাকা একটা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। কিন্তু মানুষ নস্টালজিয়ায় ভোগে কেন? চলেন, দেখি ফিরে দেখার রাজনীতি।
মাহীন হক
নস্টালজিয়া জিনিসটা ঠিক কী? সহজ বুদ্ধি বলে, সারাজীবন গাইলায়ে আসা স্কুলের করিডোরে দাঁড়ায়ে যে তুলুতুলু অনুভূতি বলক দিয়া ওঠে, ওইটাই নস্টালজিয়া। কিন্তু দেখা গেল, জিনিসটা আরো সিরিয়াস।
দেশান্তরি নাবিক, যোদ্ধা, আসামি ও দাসদের যখন অবসাদ আচ্ছন্ন কইরা ফেলত, কার্যত অকেজো কইরা ফেলত, তখনকার সেই দশার একটা নাম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। ফিজিশিয়ান ইয়োহানেস হফার সপ্তদশ শতকে এর নাম দিলেন নস্টালজিয়া। কোনো টার্মের উৎস যদি গ্রিক/ল্যাটিন শব্দ না হয়, তাইলে ওইটা কোনো টার্মের কাতারেই পড়ে না। এই টার্মখানাও গ্রিক শব্দ ‘নস্টোস’ ও ‘আলগোস’ জোড়া লাগায়ে বানানো। এর আক্ষরিক অর্থ হইলো, ঘরে ফেরার জন্য
‘প্যাট পুড়া’।
সেই সময় নস্টালজিয়া সিরিয়াস একটা রোগ হিসেবেই বিবেচিত হইত। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত ২৫৮৮টা কেস পাওয়া যায়, এমনকি ১৩টা মৃত্যুর জন্যও দায়ী করা হয় এই রোগটারে। প্রাণঘাতী রোগের নাম থেকে সেপিয়া টোনের ছবির ক্যাপশন—নস্টালজিয়া শব্দটার হ্যাডমের বেশ করুণ পতন হইসে বলতেই হয়।
বর্তমানে শব্দটা যে অর্থ ধারণ করসে, তা হইল বেসিকালি: ‘আগেই ভালো ছিলাম।’ যদিও বোরড লাগলে এক আঙুলের টিপে দুনিয়ার সেরা মুভি-সিরিজ অন চালু করে ফেলা যাচ্ছে, ইয়ারফোনে পছন্দের প্লেলিস্টটা ছেড়ে নিলেই আশেপাশের কারো বেহুদা বকর-বকর শুনতে হচ্ছে না, এমনকি চ্যাটজিপিটির কল্যাণে মোটামুটি আকারের একটা দাস-মনিব হওয়ার মজাও মিস যাচ্ছে না। তারপরও আমাদের লেট মিলেনিয়াল ও জেনজি পোলাপানের চোখ পেছনদিকে ফেরানো। তারা ‘আমরা নব্বই দশকে বসবাস করি’ নামে ফেসবুক গ্রুপ খোলে আর কেনে সেকেন্ড হ্যান্ড ডিজিটাল ক্যামেরা (আপনার ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরাতেও তারচেয়ে ভালো ছবি আসে।)
এইসব আদিখ্যেতা দেখে বিরক্ত লাগতেই পারে। মনে হইতেই পারে যে এদের জন্য আসলে পছন্দের গান শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাইন-এক্স-এম বা এফ-এম রেডিও কানের কাছে ধইরা বইসা থাকাই ভাল ছিল। কিন্তু নস্টালজিয়া তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমনই। সবসময় অতীতের একটা কাটছাঁট করা, আইডিয়ালাইজড ছবি হাজির করে স্মৃতিতে। তাই প্রতিটা n-১তম ব্যাচের কাছে nতম ব্যাচ চরম বেয়াদব।
মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটলরেও নিজের ফুপা বইলা ভ্রম হইতে পারে যখন সে বলে, ‘আজকালকার পোলাপান দুনিয়ার কিছুই দেখে নাই, অথচ দেইখা মনে হয় সব বুইঝা ফেলসে।’ এর কারণ হইল, আমাদের স্মৃতি কোনো নিষ্ক্রিয় ভাঁড়ার না, সে কেবল তথ্য জমায় না, বরং তার ওপর নানারকমের কারিকুরি করে। ফলে, সঙ্গত কারণেই, স্মৃতি আমাদের মধ্যে উসকায়ে দিবে আর্লি-২০০০ সালের পেটমোটা টিভির দিনগুলায় ফিরা যাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু অতটা সহজে মনে করাবে না কেন সেই টিভিতে সারাদিন চলতো অ্যান্টি-অ্যাসিড ক্যাম্পেইন। গ্যেস হোয়াট, শাহ আব্দুল করিম, আগে অত সুন্দর দিনও আপনি কাটান নাই। মিলান কুন্দেরা তাই আমাদের মনে করায়ে দেন, ‘বিলয়ের সূর্যাস্তকালে সবকিছু উদ্ভাসিত হয় নস্টালজিয়ার আলোয়, এমনকি গিলোটিনও।’
তার মানে এই না যে এই প্রজন্মের নস্টালজিয়ার আলাদা কোনো তাৎপর্য নাই। নস্টালজিয়া শব্দটার ‘নস্টোস’ অংশটা বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। নস্টোস মানে ঘর। ফলে, নস্টালজিয়া এমন একটা সময়রে ঘিরেই হয় যেই সময়টারে ঘর-ঘর বলে বোধ হয়।
১৯৭৯ সালে ফ্রেড ডেভিস ইয়ার্নিং ফর ইয়েস্টারডে: আ সোশিওলজি অফ নস্টালজিয়া বইখানা প্রকাশ করেন। সমাজতাত্ত্বিক নজরে নস্টালজিয়াকে বিচার করার প্রথমদিককার একটা প্রয়াস এই বইটা। তার মতে, নস্টালজিয়া স্রেফ ব্যক্তিগত স্মৃতিকাতরতা না, বরং সামাজিকভাবেই গুরুত্ববহ একটা অনুভূতি। মানুষরে তার বর্তমান জীবনের নানারকমের সংকট, টানাপোড়েন, দ্রুত বদল মোকাবেলা করতে সাহায্য করে এই অনুভূতি।
দেখা গেছে, কোনো সমাজ যখন একটা ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেই সমাজে নস্টালজিয়ার কাটতি বাড়ে। দ্রুত পরিবর্তনের সময় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ চায় নিজের অতীত ও বর্তমানের মধ্যকার সংযোগ ধরে রাখতে, নিজের সেন্স অফ বিলঙ্গিং রক্ষা করতে।
এখন যারা লেট মিলেনিয়াল বা জেনজি, তাদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পর্যায়ে দেখা দেয় করোনা, সাথে নিয়ে আসে লকডাউন ও কোয়ারেন্টাইন। তারুপ্রে বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানারকম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশি তরুণরা এরমধ্যে সাক্ষী হয়েছে রক্তাক্ত একটা অভ্যুত্থানের।
মিডিয়া স্টাডিজে এমনিতেই ‘নস্টালজিয়া পেন্ডুলাম’ বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। মোটামুটি প্রতি তিরিশ বছর পর পর বিভিন্ন মিডিয়া ট্রেন্ড ফের মূলধারায় ভেসে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে, প্রচণ্ড ডিসওরিয়েন্টেড ও ট্রমাটাইজড এই প্রজন্মের জন্য হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও রাস্তা-সাফ-করা ব্যাগি প্যান্টের দুনিয়ায় ঠাই নিতে চাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক কিছু না।
এছাড়াও, নস্টালজিয়া মানুষকে এক করে। যৌথ, সামষ্টিক স্মৃতি মানুষকে একই গোষ্ঠীবদ্ধ করে রাখে। একসময় মানুষ আগুন ঘিরে এক হইত, সেই আগুনরে প্রতিস্থাপিত করসিল টিভি স্ক্রিন। আর তার জায়গা নিসে মোবাইল ফোন, যা আরো বিচ্ছিন্ন করে মানুষরে। এমন সময়ে, নস্টালজিয়া একটা সামাজিক আঠা হিসেবেও কাজ করে।
কিন্তু জার্মান-কোরিয়ান দার্শনিক বিয়ুং-চুল হান ঠিক এখানেই আমাদের মনে করায়ে দিবেন যে, আমরা নিজেদের স্মৃতি তৈরি করতে কিংবা রক্ষা করতে আগের মত সক্ষম নাই। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের ওপর ধ্বস নামে হাজারো ডাটা ও কন্টেন্টের। হানের মতে, ডাটার কোনো ন্যারেটভ-ভিত্তিক অতীত নাই, ব্যাকস্টোরি নাই। তা নিতান্ত তথ্য। কোনোকিছুর স্মৃতিতে পরিণত হওয়ার জন্য, অর্থবহ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠার জন্য তার ন্যারেটিভ প্রয়োজন, ঘনায়ে ওঠার সময় প্রয়োজন। কিন্তু এই তাৎক্ষণিক তথ্যের ওপর আমাদের নির্ভরতা ও অভ্যাস আমাদের থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিসে। গান শোনা, ছবি তোলা, সিনেমা দেখা, ইত্যাদি অভিজ্ঞতার সবটাই যখন একটা স্ক্রিনের দখলে চলে যায়, তখন এইসব অভিজ্ঞতার জন্য প্রতিটা সংবেদনের যে আলাদা অংশগ্রহণ প্রয়োজন, তা আর থাকে না। পুরানো ভিনাইল রেকর্ড, কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরা সংগ্রহ, ইত্যাদি রেট্রোমেনিয়াক কাজ-কারবার আদতে সেই অভিজ্ঞতা পুনরুদ্ধারেরই আয়োজন।
বিয়ুং-চুল হান এই বর্তমান সমাজের নাম দেন ‘অর্জনকেন্দ্রিক সমাজ’ (অ্যাচিভমেন্ট সোসাইটি)। নিজেরে সর্বাবস্থায় ব্যবহারযোগ্য, উৎপাদনশীল রাখাই এই সমাজের বাসিন্দাদের লক্ষ্য থাকতে হবে। নানারকমের বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পপ্ন একটা জীবন এই সমাজব্যবস্থার স্বার্থের উল্টাপাশে, ফলে কনভিনিয়েন্স ও ইন্সট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশনের আড়ালে সবকিছু ইস্ত্রি করে এক সমতলে নিয়া আসা জরুরি। প্রতিটা মুহূর্ত থেকে সবচেয়ে বেশি উপযোগিতা নিষ্কাশন করা জরুরি। অলস, রিফ্লেক্টিভ প্রতিটা মিনিটরে চাবকায়ে সচল, সকর্ম রাখা জরুরি। এর ফলে, আমাদের সময়বোধ সামগ্রিক থাকতে পারে না, হয়ে ওঠে ছাড়া-ছাড়া, খণ্ডিত। স্মৃতিতে জমার মত করে সময় আর থিতু হইতে পারে না, জমাট বাঁধতে পারে না।
হানের ভাষায়, ‘ক্ষণের খুশবু’ হারায়ে যাচ্ছে দুনিয়া থেকে। দুনিয়ার সাথে কোনোরকমের অর্থবহ সংযোগের জন্য আমরা আরো, আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়তেসি অতীতের ওপর। সমস্ত জার্মান জার্গন বাদ দিয়া বললে, হান আর আপনার আম্মা আসলে একই কথা বলতেসে: আরো ফোন টিপ!
কিন্তু নিজের কালবোধ অন্যের কাছে বর্গা না দিয়ে দেওয়া আরো জরুরি। নস্টালজিয়া, আবারো বলি, স্রেফ ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ না। নিজের স্মৃতির ওপরকার মালিকানায় যদি মানুষ ঢিল দেয়, তাইলে খুব সহজেই তা পরিণত হইতে পারে স্বৈরাচারী হাতিয়ারে।
নস্টালজিয়ার একটা রিস্টোরেটিভ ফাংশনও আছে। শুধু আমাদের দিয়ে অতীতের রোমন্থন না, সেইসাথে স্মৃতির দুনিয়ারে পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করাইতে চায়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ থেকে শুরু করে মোদির ‘রামরাজ্য’, সবটাই একটা আদর্শ অতীতের ছবিরে কেন্দ্র করে নির্মিত স্বৈরাচারী প্রকল্প, আর তা চালিত হয় পলিটিসাইজড নস্টালজিয়ার ঘোরে থাকা একটা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। সেজন্যই নিজের স্মৃতি, নিজের নস্টালজিয়ার ওপর নিজের দখল থাকা এতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কী যেন বলসিল না কুন্দেরা? ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আদতে তাদের নিজস্ব নস্টালজিয়ার লড়াই। হুবহু এমনটা বলেন নাই, আমার স্মৃতি নিজ দায়িত্বে কিছুটা কাটছাঁট করে নিসে আরকি।
নস্টালজিয়া জিনিসটা ঠিক কী? সহজ বুদ্ধি বলে, সারাজীবন গাইলায়ে আসা স্কুলের করিডোরে দাঁড়ায়ে যে তুলুতুলু অনুভূতি বলক দিয়া ওঠে, ওইটাই নস্টালজিয়া। কিন্তু দেখা গেল, জিনিসটা আরো সিরিয়াস।
দেশান্তরি নাবিক, যোদ্ধা, আসামি ও দাসদের যখন অবসাদ আচ্ছন্ন কইরা ফেলত, কার্যত অকেজো কইরা ফেলত, তখনকার সেই দশার একটা নাম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। ফিজিশিয়ান ইয়োহানেস হফার সপ্তদশ শতকে এর নাম দিলেন নস্টালজিয়া। কোনো টার্মের উৎস যদি গ্রিক/ল্যাটিন শব্দ না হয়, তাইলে ওইটা কোনো টার্মের কাতারেই পড়ে না। এই টার্মখানাও গ্রিক শব্দ ‘নস্টোস’ ও ‘আলগোস’ জোড়া লাগায়ে বানানো। এর আক্ষরিক অর্থ হইলো, ঘরে ফেরার জন্য
‘প্যাট পুড়া’।
সেই সময় নস্টালজিয়া সিরিয়াস একটা রোগ হিসেবেই বিবেচিত হইত। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত ২৫৮৮টা কেস পাওয়া যায়, এমনকি ১৩টা মৃত্যুর জন্যও দায়ী করা হয় এই রোগটারে। প্রাণঘাতী রোগের নাম থেকে সেপিয়া টোনের ছবির ক্যাপশন—নস্টালজিয়া শব্দটার হ্যাডমের বেশ করুণ পতন হইসে বলতেই হয়।
বর্তমানে শব্দটা যে অর্থ ধারণ করসে, তা হইল বেসিকালি: ‘আগেই ভালো ছিলাম।’ যদিও বোরড লাগলে এক আঙুলের টিপে দুনিয়ার সেরা মুভি-সিরিজ অন চালু করে ফেলা যাচ্ছে, ইয়ারফোনে পছন্দের প্লেলিস্টটা ছেড়ে নিলেই আশেপাশের কারো বেহুদা বকর-বকর শুনতে হচ্ছে না, এমনকি চ্যাটজিপিটির কল্যাণে মোটামুটি আকারের একটা দাস-মনিব হওয়ার মজাও মিস যাচ্ছে না। তারপরও আমাদের লেট মিলেনিয়াল ও জেনজি পোলাপানের চোখ পেছনদিকে ফেরানো। তারা ‘আমরা নব্বই দশকে বসবাস করি’ নামে ফেসবুক গ্রুপ খোলে আর কেনে সেকেন্ড হ্যান্ড ডিজিটাল ক্যামেরা (আপনার ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরাতেও তারচেয়ে ভালো ছবি আসে।)
এইসব আদিখ্যেতা দেখে বিরক্ত লাগতেই পারে। মনে হইতেই পারে যে এদের জন্য আসলে পছন্দের গান শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাইন-এক্স-এম বা এফ-এম রেডিও কানের কাছে ধইরা বইসা থাকাই ভাল ছিল। কিন্তু নস্টালজিয়া তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমনই। সবসময় অতীতের একটা কাটছাঁট করা, আইডিয়ালাইজড ছবি হাজির করে স্মৃতিতে। তাই প্রতিটা n-১তম ব্যাচের কাছে nতম ব্যাচ চরম বেয়াদব।
মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটলরেও নিজের ফুপা বইলা ভ্রম হইতে পারে যখন সে বলে, ‘আজকালকার পোলাপান দুনিয়ার কিছুই দেখে নাই, অথচ দেইখা মনে হয় সব বুইঝা ফেলসে।’ এর কারণ হইল, আমাদের স্মৃতি কোনো নিষ্ক্রিয় ভাঁড়ার না, সে কেবল তথ্য জমায় না, বরং তার ওপর নানারকমের কারিকুরি করে। ফলে, সঙ্গত কারণেই, স্মৃতি আমাদের মধ্যে উসকায়ে দিবে আর্লি-২০০০ সালের পেটমোটা টিভির দিনগুলায় ফিরা যাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু অতটা সহজে মনে করাবে না কেন সেই টিভিতে সারাদিন চলতো অ্যান্টি-অ্যাসিড ক্যাম্পেইন। গ্যেস হোয়াট, শাহ আব্দুল করিম, আগে অত সুন্দর দিনও আপনি কাটান নাই। মিলান কুন্দেরা তাই আমাদের মনে করায়ে দেন, ‘বিলয়ের সূর্যাস্তকালে সবকিছু উদ্ভাসিত হয় নস্টালজিয়ার আলোয়, এমনকি গিলোটিনও।’
তার মানে এই না যে এই প্রজন্মের নস্টালজিয়ার আলাদা কোনো তাৎপর্য নাই। নস্টালজিয়া শব্দটার ‘নস্টোস’ অংশটা বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। নস্টোস মানে ঘর। ফলে, নস্টালজিয়া এমন একটা সময়রে ঘিরেই হয় যেই সময়টারে ঘর-ঘর বলে বোধ হয়।
১৯৭৯ সালে ফ্রেড ডেভিস ইয়ার্নিং ফর ইয়েস্টারডে: আ সোশিওলজি অফ নস্টালজিয়া বইখানা প্রকাশ করেন। সমাজতাত্ত্বিক নজরে নস্টালজিয়াকে বিচার করার প্রথমদিককার একটা প্রয়াস এই বইটা। তার মতে, নস্টালজিয়া স্রেফ ব্যক্তিগত স্মৃতিকাতরতা না, বরং সামাজিকভাবেই গুরুত্ববহ একটা অনুভূতি। মানুষরে তার বর্তমান জীবনের নানারকমের সংকট, টানাপোড়েন, দ্রুত বদল মোকাবেলা করতে সাহায্য করে এই অনুভূতি।
দেখা গেছে, কোনো সমাজ যখন একটা ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেই সমাজে নস্টালজিয়ার কাটতি বাড়ে। দ্রুত পরিবর্তনের সময় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ চায় নিজের অতীত ও বর্তমানের মধ্যকার সংযোগ ধরে রাখতে, নিজের সেন্স অফ বিলঙ্গিং রক্ষা করতে।
এখন যারা লেট মিলেনিয়াল বা জেনজি, তাদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পর্যায়ে দেখা দেয় করোনা, সাথে নিয়ে আসে লকডাউন ও কোয়ারেন্টাইন। তারুপ্রে বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানারকম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশি তরুণরা এরমধ্যে সাক্ষী হয়েছে রক্তাক্ত একটা অভ্যুত্থানের।
মিডিয়া স্টাডিজে এমনিতেই ‘নস্টালজিয়া পেন্ডুলাম’ বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। মোটামুটি প্রতি তিরিশ বছর পর পর বিভিন্ন মিডিয়া ট্রেন্ড ফের মূলধারায় ভেসে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে, প্রচণ্ড ডিসওরিয়েন্টেড ও ট্রমাটাইজড এই প্রজন্মের জন্য হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও রাস্তা-সাফ-করা ব্যাগি প্যান্টের দুনিয়ায় ঠাই নিতে চাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক কিছু না।
এছাড়াও, নস্টালজিয়া মানুষকে এক করে। যৌথ, সামষ্টিক স্মৃতি মানুষকে একই গোষ্ঠীবদ্ধ করে রাখে। একসময় মানুষ আগুন ঘিরে এক হইত, সেই আগুনরে প্রতিস্থাপিত করসিল টিভি স্ক্রিন। আর তার জায়গা নিসে মোবাইল ফোন, যা আরো বিচ্ছিন্ন করে মানুষরে। এমন সময়ে, নস্টালজিয়া একটা সামাজিক আঠা হিসেবেও কাজ করে।
কিন্তু জার্মান-কোরিয়ান দার্শনিক বিয়ুং-চুল হান ঠিক এখানেই আমাদের মনে করায়ে দিবেন যে, আমরা নিজেদের স্মৃতি তৈরি করতে কিংবা রক্ষা করতে আগের মত সক্ষম নাই। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের ওপর ধ্বস নামে হাজারো ডাটা ও কন্টেন্টের। হানের মতে, ডাটার কোনো ন্যারেটভ-ভিত্তিক অতীত নাই, ব্যাকস্টোরি নাই। তা নিতান্ত তথ্য। কোনোকিছুর স্মৃতিতে পরিণত হওয়ার জন্য, অর্থবহ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠার জন্য তার ন্যারেটিভ প্রয়োজন, ঘনায়ে ওঠার সময় প্রয়োজন। কিন্তু এই তাৎক্ষণিক তথ্যের ওপর আমাদের নির্ভরতা ও অভ্যাস আমাদের থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিসে। গান শোনা, ছবি তোলা, সিনেমা দেখা, ইত্যাদি অভিজ্ঞতার সবটাই যখন একটা স্ক্রিনের দখলে চলে যায়, তখন এইসব অভিজ্ঞতার জন্য প্রতিটা সংবেদনের যে আলাদা অংশগ্রহণ প্রয়োজন, তা আর থাকে না। পুরানো ভিনাইল রেকর্ড, কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরা সংগ্রহ, ইত্যাদি রেট্রোমেনিয়াক কাজ-কারবার আদতে সেই অভিজ্ঞতা পুনরুদ্ধারেরই আয়োজন।
বিয়ুং-চুল হান এই বর্তমান সমাজের নাম দেন ‘অর্জনকেন্দ্রিক সমাজ’ (অ্যাচিভমেন্ট সোসাইটি)। নিজেরে সর্বাবস্থায় ব্যবহারযোগ্য, উৎপাদনশীল রাখাই এই সমাজের বাসিন্দাদের লক্ষ্য থাকতে হবে। নানারকমের বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পপ্ন একটা জীবন এই সমাজব্যবস্থার স্বার্থের উল্টাপাশে, ফলে কনভিনিয়েন্স ও ইন্সট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশনের আড়ালে সবকিছু ইস্ত্রি করে এক সমতলে নিয়া আসা জরুরি। প্রতিটা মুহূর্ত থেকে সবচেয়ে বেশি উপযোগিতা নিষ্কাশন করা জরুরি। অলস, রিফ্লেক্টিভ প্রতিটা মিনিটরে চাবকায়ে সচল, সকর্ম রাখা জরুরি। এর ফলে, আমাদের সময়বোধ সামগ্রিক থাকতে পারে না, হয়ে ওঠে ছাড়া-ছাড়া, খণ্ডিত। স্মৃতিতে জমার মত করে সময় আর থিতু হইতে পারে না, জমাট বাঁধতে পারে না।
হানের ভাষায়, ‘ক্ষণের খুশবু’ হারায়ে যাচ্ছে দুনিয়া থেকে। দুনিয়ার সাথে কোনোরকমের অর্থবহ সংযোগের জন্য আমরা আরো, আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়তেসি অতীতের ওপর। সমস্ত জার্মান জার্গন বাদ দিয়া বললে, হান আর আপনার আম্মা আসলে একই কথা বলতেসে: আরো ফোন টিপ!
কিন্তু নিজের কালবোধ অন্যের কাছে বর্গা না দিয়ে দেওয়া আরো জরুরি। নস্টালজিয়া, আবারো বলি, স্রেফ ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ না। নিজের স্মৃতির ওপরকার মালিকানায় যদি মানুষ ঢিল দেয়, তাইলে খুব সহজেই তা পরিণত হইতে পারে স্বৈরাচারী হাতিয়ারে।
নস্টালজিয়ার একটা রিস্টোরেটিভ ফাংশনও আছে। শুধু আমাদের দিয়ে অতীতের রোমন্থন না, সেইসাথে স্মৃতির দুনিয়ারে পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করাইতে চায়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ থেকে শুরু করে মোদির ‘রামরাজ্য’, সবটাই একটা আদর্শ অতীতের ছবিরে কেন্দ্র করে নির্মিত স্বৈরাচারী প্রকল্প, আর তা চালিত হয় পলিটিসাইজড নস্টালজিয়ার ঘোরে থাকা একটা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। সেজন্যই নিজের স্মৃতি, নিজের নস্টালজিয়ার ওপর নিজের দখল থাকা এতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কী যেন বলসিল না কুন্দেরা? ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আদতে তাদের নিজস্ব নস্টালজিয়ার লড়াই। হুবহু এমনটা বলেন নাই, আমার স্মৃতি নিজ দায়িত্বে কিছুটা কাটছাঁট করে নিসে আরকি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশে বন্যার প্রার্দুভাব, মৌসুমি ঝড় ও খরা বৃদ্ধি পেয়েছে-এমন প্রচলিত ধারণা সঠিক নয়। অন্যদিকে বিশ্বে যখন পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির প্রাচুর্যের বিষয়টি এর জন্য বিশেষ সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে উঠতে পারে।
১৬ মিনিট আগেসেদিক দিয়ে ইকবালের এই প্রচেষ্টা বাংলার পরিবেশতাত্ত্বিক ইতিহাস রচনার প্রথম প্রয়াস। এর আগে মূলধারার বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত পরিবেশকে শুধু পটভূমি হিসেবে বর্ণনা করার মাঝেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তাঁরা পরিবেশকে একটি অপরিবর্তনশীল বিষয় হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ইকবালই প্রথম বাংলা বদ্বীপের ক্ষেত্রে
৩৩ মিনিট আগেআজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুদিন। বিদ্রোহী এই কবিকে পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষেরা কেন আপন করে নিয়েছিল, তার পেছনে রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তত্ত্বিক কারণ। কবির প্রয়াণ দিবসে তার সুলুক-সন্ধান।
২ দিন আগেমূলত নজরুলসংগীত নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার পথটা দেখায় আর্টসেল। তাদের মাধ্যমে বড় অংশের রকশ্রোতার সামনে নজরুলের গান নতুনভাবে হাজির হয়েছে।
২ দিন আগে