জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গৃহকর্মী সুরক্ষায় নীতি আছে, কল্যাণ নেই

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ১২
গৃহকর্মী সুরক্ষায় নীতি আছে, কল্যাণ নেই। স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) বাসা থেকে নির্যাতনের শিকার ১১ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মী উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার শিশুটি তার প্রাপ্য অধিকার ও মানবিক আচরণ থেকে বঞ্চিত ছিল। শেষ পর্যন্ত এমডি এবং তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এই নজিরই স্থাপন হলো—দেশের হাজারো গৃহকর্মী এখনো কতটা অসহায়। অথচ ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ প্রণয়ন হয়েছিল, কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও এটি আইনের মর্যাদা পায়নি।
এতে কাগজে-কলমের নীতিমালার ফাঁকফোকরে আটকা পড়ে আছে লক্ষাধিক গৃহকর্মীর নিরাপত্তা ও অধিকার। তাদের নেই কোনো শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, নেই সুনির্দিষ্ট মজুরি কিংবা ছুটির অধিকার। আর এই নীতির পূর্ণাঙ্গ কার্যকরে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাই মূল বাধা বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞরা।

নীতিমালায় কী আছে

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’-তে বেশ কিছু আশাজাগানিয়া কথা ছিল, যা শুনলে মনে হয় গৃহকর্মীদের জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার কথা। নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়—গৃহকর্মীদের পেশাকে ‘শ্রমিক’ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। তাদের কাজের জন্য লিখিত বা মৌখিক চুক্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। মজুরি, কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থতার সময় চিকিৎসা এবং উৎসব ভাতার বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করার নির্দেশনা ছিল এতে। বিশেষত নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে ১৬ সপ্তাহের প্রসূতি ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার বিষয়টিও উল্লেখ ছিল।

শিশুদের সুরক্ষার জন্যও এই নীতিমালায় বিশেষ বিধান ছিল। ১২ বছরের নিচের কোনো শিশুকে ভারী কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তবে হালকা কাজের জন্য ১৪ বছর পর্যন্ত ছাড় দেওয়া ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার হচ্ছে। নীতিমালায় অভিযোগ জানানোর জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ৯ বছরেও সেই হেল্পলাইন চালু হয়নি, মনিটরিং সেলের কোনো অস্তিত্বও চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিমালার ব্যাপক প্রচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নিয়োগকারী ও গৃহকর্মী উভয়েই এ বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছেন।

অরক্ষিত জীবন

নীতিমালা থাকলেই যে সুরক্ষা পাওয়া যায় না, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন গৃহকর্মীরা। এটি বাধ্যতামূলক আইন না হওয়ায় নিয়োগকারীরা একে থোড়াই কেয়ার করেন। ফলে নির্যাতনের শিকার হলেও বা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হলে গৃহকর্মীরা শ্রম আদালতে যাওয়ার অধিকার রাখেন না। তাঁরা মূলত ফৌজদারি আইনে বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করতে পারেন, কিন্তু শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া আদায়ের সুযোগ তাঁদের থাকে না।

২০২২ সালে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য গাইডলাইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এই সংক্রান্ত রুল জারি করে হাইকোর্ট। মানবাধিকার সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফ্লাড)-এর পক্ষে হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবীরা জানান, নীতিমালায় ক্ষতিপূরণের কথা বলা হলেও তা কোথায় বা কীভাবে পাওয়া যাবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত গবেষণা, প্রশিক্ষণ, শ্রমিক অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা ‘বিলস’-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের গৃহকর্মীদের ৮৪ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অথচ নীতিমালায় বলা ছুটির কোনো বালাই তাদের জীবনে নেই। ৮৭ শতাংশ কর্মীর কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই, আর অসুস্থতার সময় ছুটি পান খুব সামান্য সংখ্যক মানুষ। মাসিক গড় বেতন পাঁচ হাজার টাকার নিচে হওয়ায়, তাঁদের জীবনযাপন চরম দুর্দশার মধ্যে কাটে।

গত বছর এপ্রিল মাসে উন্নয়ন সংগঠন আভাস আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গৃহকর্মী মনিরা ও পুতুল আক্ষেপ করে জানান, দিনরাত খেটেও তারা ন্যূনতম সম্মানটুকু পান না, ছুটি চাইতে গেলে নানা কৈফিয়ত দিতে হয়। তারা বেতন ১৫-২০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন, যা বর্তমান বাজারদরে অত্যন্ত যৌক্তিক।

মনিটরিংয়ের অভাব দায়সারা আচরণ

শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি মাত্র মনিটরিং সেল থাকলেও তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা ও দারিদ্র্য কমাতে কাজ করা অক্সফামের তথ্যমতে, নীতিমালা বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য ২০২২ সাল পর্যন্ত মাত্র ৭টি বৈঠক হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৮৯-এ সই করা দেশ হলেও এটি অনুসমর্থন বা র‌্যাটিফাই করেনি। ফলে আন্তর্জাতিকভাবেও কোনো চাপ সরকারের ওপর নেই। দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের (ডিএসকে) তথ্যমতে, আবাসিক গৃহকর্মীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শিশু এবং নিয়োগকারীরা সস্তায় এই শিশুদের খাটাচ্ছে।

ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফর্মে গৃহকর্মীদের তথ্য চাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো তদারকি নেই। ফলে ঠিক কত সংখ্যক শিশু বা নারী এই পেশায় যুক্ত, তার সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। অক্সফামের হিসাবে সংখ্যাটা কোটির ওপরে, আবার পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২৫ লাখ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

বিমানের এমডির ঘটনায় পুলিশ তৎপরতা দেখালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। একটি প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি দৈনিকের (তৎকালীন) নির্বাহী সম্পাদকের বাসা থেকে শিশু গৃহকর্মীর পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনার বিচার নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। সমাজ ও রাষ্ট্রের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে বিত্তবানরা বারবার পার পেয়ে যান। আর গৃহকর্মীরা রয়ে যান বিচারের বাইরে।
প্রীতি উরাং বা ফেরদৌসীর মতো গৃহকর্মীদের মৃত্যু কিংবা নির্যাতনের ঘটনা কিছুদিন আলোচনায় থাকে, তারপর হারিয়ে যায়।
বিলসের তথ্যমতে, ৯৬ শতাংশ গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েও কোথাও অভিযোগ করেন না, কারণ তারা জানেন—তাদের জন্য কোনো বিচার নেই।

করণীয় কী

এখন আর নীতিমালা দিয়ে কাজ হবে না—এটিই সর্বস্তরের দাবি। ২০২৪ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, তারা গৃহকর্মী নির্যাতনবিরোধী একটি খসড়া আইন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু কবে সেই আইন পাস হবে, তা নিশ্চিত নয়। অবিলম্বে ২০১৫ সালের নীতিকে পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত করতে হবে। শ্রম আইনের ধারা ১(ণ) বাতিল করে গৃহকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের অধীনে এবং থানায় গৃহকর্মীদের তথ্যভান্ডার বা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহানের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন করলেই হবে না; তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের মজুরি কাঠামো নির্দিষ্ট করতে হবে এবং তাদের অবদানের অর্থনৈতিক স্বীকৃতি দিতে হবে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিকতা চর্চাও সমান জরুরি। যতক্ষণ না আমরা গৃহকর্মীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে শিখব, ততক্ষণ কেবল আইনের পাতা তাদের চোখের জল মুছতে পারবে না। উত্তরার শিশুটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আইনহীন এই রাজ্যে মানবিকতার বড্ড আকাল।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত