অভিযান চালিয়ে স্ত্রীসহ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্বাধীন দেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন নজিরবিহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়তা করেছে ছায়াযোদ্ধাখ্যাত ডেল্টা ফোর্স। এরপর থেকে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ইউনিট।
ডেল্টা ফোর্স গঠনের কারিগর কর্নেল চার্লস আলভিন বেকউইথ। ১৯৬০-৭০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ স্পেশাল এয়ার সার্ভিসের (এসএএস) সঙ্গে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে কাজ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বেকউইথ পেন্টাগনকে প্রথাগত যুদ্ধের বাইরে গিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় এমন বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হন।
রহস্যময় উৎপত্তি
পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে ডেল্টা ফোর্সের নাম ‘প্রথম স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট-ডেল্টা’। সামরিক মহলে ‘দ্য ইউনিট’, ‘ডি-বয়েজ’ ও ‘টিয়ার-১’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের অধীনে থাকা এই ইউনিটে দক্ষতা ও গোপনীয়তা রক্ষায় শিখরে অবস্থানকারীরা কাজ করেন।
ডেল্টা ফোর্স আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৭ সালের ১৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময় বিশ্বে বিমান ছিনতাই ও সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এটি গঠন করা হয়। কর্নেল পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা ইউনিটের নেতৃত্ব দিলেও পেন্টাগন কখনো তাঁর কিংবা অন্য কমান্ডারের নাম প্রকাশ করে না। ইউনিট প্রধান অবসরে যাওয়ার কয়েক বছর পরে তা প্রকাশ পায়।
ডেল্টা ফোর্স গঠনের কারিগর কর্নেল চার্লস আলভিন বেকউইথ। ছবি: সংগৃহীতডেল্টা ফোর্স স্থলভাগে জটিল অভিযান, ভবন থেকে জিম্মি এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবিত অথবা মৃত উদ্ধারে সিদ্ধহস্ত। এদের অস্তিত্ব এতটাই গোপন যে বহু বছর মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারই করত না।
প্রশিক্ষণ
ডেল্টা ফোর্সের যোদ্ধাদের সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। অভিজ্ঞ আর্মি রেঞ্জার্স বা গ্রিন বেরেটসের মতো স্পেশাল ফোর্স থেকে বাছাই করা যোদ্ধাদের এখানে সুযোগ দেওয়া হয়। অবশ্য সুযোগ পেলেই ডেল্টা হওয়া যায় না। বছরে দুবার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার দুর্গম অ্যাপালাচিয়ান পাহাড়ে ‘দ্য সিলেকশন’ নামে এক মাসের পরীক্ষা হয়। এই পরীক্ষায় বাদ পড়ার হার ৯০ শতাংশের বেশি।
পরীক্ষায় যারা টিকে যান, তাদের গোয়েন্দা নজরদারি, ছদ্মবেশ, বিস্ফোরক ও নিখুঁত শ্যুটিংয়ের ওপর আরও ছয় মাসের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
নিকোলাস মাদুরোকে তাঁর সুরক্ষিত প্রাসাদ থেকে তুলে আনা প্রমাণ করে ডেল্টা ফোর্সের সক্ষমতা। এদের কাজের ক্ষেত্র সরাসরি হামলা ও জিম্মি উদ্ধার। সাধারণত সিআইএর সঙ্গে সমন্বয় করে ডেল্টা ফোর্স কাজ করে। এদের জন্য অর্থ বরাদ্দ কংগ্রেসের কাছেও অনেক সময় গোপন থাকে। বিপুল অর্থের জোগান থাকায় তারা বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র ব্যবহার করে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধ বা ক্লোজ কোয়ার্টার ব্যাটেলে এদের দক্ষতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের সাধারণ সৈন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। কখন গুলি চালাতে হবে, কখন কাউকে জীবিত জিম্মি করতে হবে, তা এদের মজ্জাগত।
সফলতা-ব্যর্থতা
১৯৮০ সালে ইরানে জিম্মি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্ধারে ডেল্টা ফোর্স প্রথম বড় ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ চালায়। কিন্তু মরুঝড় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তা ব্যর্থ হয়। এরপর বিশেষ এই বাহিনীকে ঢেলে সাজিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ডেল্টা ফোর্সকে আজকের পর্যায়ে এনেছে। ভেনেজুয়েলায় শনিবারের (৩ জানুয়ারি) অভিযানের সঙ্গে ১৯৮৯ সালের ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর মিল রয়েছে। সেবার পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করতে হামলা করেছিল তারা। পানামার কারাগার থেকে মার্কিন এজেন্ট উদ্ধার ও নরিয়েগার পতন ঘটাতে সক্ষম হয় ডেল্টা ফোর্স।
আটকের পর ম্যানুয়েল নোরিয়েগা। ছবি: সংগৃহীতএছাড়া সোমালিয়ার নেতা ফারাহ আইদিদকে ধরতে গিয়ে ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’-এর মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইতিহাসও রয়েছে ডেল্টা ফোর্সের। সেই লড়াইয়ে ১৮ ডেল্টা কমান্ডার নিহত হয়। পরে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে গর্ত থেকে খুঁজে বের করা কিংবা সিরিয়ায় আইসিস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যার মতো ঘটনাগুলো ডেল্টা ফোর্সের সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ হাজির করে।
অপারেশন কারাকাস
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত প্রায় ২টার দিকে কারাকাসের আকাশে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণ হয়; দ্রুত উড়ে যায় একাধিক যুদ্ধবিমান। পুরো অভিযানে ডেল্টা ফোর্সের সামরিক শক্তি ও মস্তিষ্কের কাজ করে সিআইএ।
পেন্টাগন বলেছে, মাদুরোর অবস্থান শনাক্ত ও তাঁর প্রতিটি নড়াচড়া অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিআইএ এমন নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য বা ‘ইন্টেলিজেন্স’ যুদ্ধ দপ্তরে সরবরাহ করেছিল, যা ডেল্টা ফোর্সকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর গোপন ডেরায় হানা দিতে সহায়তা করে। সিআইএ পথ দেখালেও তাঁদের জীবিত ধরার দক্ষতা কিন্তু ডেল্টা ফোর্সের সেনাদের।
ট্রাম্পের চোখে অবিশ্বাস্য নাইট স্টকার্স
কারাকাসের অভিযান কেবল স্থলযোদ্ধাদের সাফল্য নয়; এর সঙ্গে জড়িত আকাশ পথের দক্ষতা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানে ডেল্টা ফোর্সকে ভেনেজুয়েলার গভীরে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয় মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্টের বিশেষ হেলিকপ্টার, যা বিশ্বে ‘নাইট স্টকার্স’ নামে পরিচিত।
শনিবার ভোরে ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস উইকঅ্যান্ড’ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে অভিযানের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। ট্রাম্প জানান, পুরো অভিযান তিনি লাইভ দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, মার্কিন সেনারা সেখানে অবিশ্বাস্য কাজ করেছে। বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ, বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার এবং সম্ভাব্য প্রতিটি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য একেকটি করে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত ছিল।
ট্রাম্প বলেন, সেনারা এমন সব জায়গায় ঢুকেছিল, যেখানে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। পৃথিবীর আর কোনো দেশ এমন কৌশলগত অভিযান চালাতে পারত না। অভিযানে কোনো সেনা নিহত হননি, হারাতে হয়নি উড়োজাহাজ। তবে কিছু সেনা আহত হয়েছেন।
আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ থেকে নেওয়াকারাকাস অভিযানে ডেল্টা ফোর্সকে ডাকার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। মাদুরোর প্রাসাদ কোনো সমুদ্র বা জলাশয়ের কাছে নয়। বরং জনাকীর্ণ শহুরে দুর্গের মতো সুরক্ষিত ভবনে। এই ধরনের শহুরে পরিবেশে অভিযানের ক্ষেত্রে ডেল্টা ফোর্সের জুড়ি মেলাভার। ভবনের ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের তুমুল প্রতিরোধের মুখে কাউকে হত্যা না করে জীবিত তুলে আনার জন্য যে ধরনের ক্ষিপ্রতা ও স্নায়ুর জোর প্রয়োজন, তা কেবল ডেল্টা কমান্ডোদেরই রয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান বিশ্বকে বার্তা দিল– আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বা বাঙ্কারের সুরক্ষায় কোনো কিছুই আর নিরাপদ নয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই অভিযান তুমুল আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শনীতে ডেল্টা ফোর্স নিজের অজেয় অবস্থান প্রমাণ করেছে। বিশ্ব আবার জানল, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা যখন রুদ্ধ, তখনও তাদের হাতে থাকে অব্যর্থ ডেল্টা ফোর্স।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন ও আল-জাজিরা