এশিয়ায় জেন-জি জাগরণ কেন, কী বার্তা দিচ্ছে তাদের শক্তি
স্ট্রিম ডেস্ক

জেন-জিদের সাম্প্রতিক আন্দোলন ও বিক্ষোভ এশিয়াজুড়ে রাজনীতির প্রচলিত বয়ান বদলে দিচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে– রাজপথে তারুণ্যের প্রতিবাদ কী তাহলে শাসন ক্ষমতা ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, নাকি আন্দোলন শেষে তাদের তেজ নিঃশেষ হয়ে যায়?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশ, নেপালের মতো দেশে জেন-জি অভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ভারতে তারুণ্যের রাজপথে নেমে আসার পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। নানা ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘবদ্ধ জেন-জি নেতৃত্বে হওয়া এসব আন্দোলন-বিক্ষোভ দেশগুলোর জনগণকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা প্রভাবশালীদের অন্যায় সুবিধা নেওয়াকে আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে দেখা হতো। তরুণ প্রজন্ম এখন সেই ব্যবস্থাকে নাকচ করে দিচ্ছে।
তবে সব দেশে জেন-জি আন্দোলনগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল এক নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আন্দোলনগুলো জনপরিসরের আলোচনাকে নতুন রূপ দিয়েছে। কিছু দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করেছে, আবার কোনো কোনো দেশে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের পদ ছাড়তে বাধ্য করেছে। কিন্তু মূল রাজনৈতিক কাঠামো বা প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে উৎখাত করতে পারেনি। অবশ্য নেপালই এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম।
নেপালে ২০২৫ সালের বসন্ত জাগরণের অর্জন এশিয়ার অন্যান্য দেশে হওয়া একই ধরনের গণঅভ্যুত্থানের অর্জনগুলোর চেয়ে বেশি। নেপালে জেন-জি আন্দোলনের পর একটি মাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল দেশটির সরকারই বদলে যায়নি, প্রচলিত রাজনৈতিক শ্রেণীটাও বদলে গেছে।
নেপালের আন্দোলন ছিল পুরোপুরি প্রজন্মভিত্তিক। দেখা গেছে, তরুণ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা রাতারাতি সংগঠক হয়ে উঠে ভাইরাল হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ক্ষোভকে এক সুসংগঠিত গণআন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন।
দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণীর বাড়তি সুবিধা পাওয়ার মতো পুরনো ও গভীর কাঠামোগত ক্ষোভগুলোর সমন্বিত বহিঃপ্রকাশ দেখেছিল নেপাল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে অল্প সময়ে ৭০ নেপালি প্রাণ হারান, কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। তবুও নেপালি জেন-জিদের আন্দোলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, সংসদের নিম্নকক্ষ ভেঙে দেওয়া হয়। নেপালের দায়িত্ব নেয় সুশীলা কার্কির নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার।
এরই মধ্যে নেপালে আদতে নির্বাচন হবে কিনা, হলেও সেটা সহিংসতাপূর্ণ হবে কিনা এবং নির্বাচন হলেও সেই পুরনো ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো একটি আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে কিনা এমন সব গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিতে থাকে।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ নেপালে নির্বাচন হয়, যার ফলাফল সব পূর্বানুমানকে বলতে গেলে ধূলিসাৎ করে দেয়। ভোটাররা দেশ চালাতে সম্পূর্ণ নতুন মুখ বেছে নেয়, একেবারে তৃণমূলের দল হিসেবে জেন-জি আকাঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) ক্ষমতায় নিয়ে আসে।
সংসদের ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৮২ আসনে জয় পায় আরএসপি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন জেন-জির পছন্দের বালেন্দ্র শাহ। নেপালের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিপরিষদ ছোট রাখা, ১০০ দফা সংস্কার পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে।
জেন-জিরা নতুন নেপাল গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দলকে ক্ষমতায় এনেছে। তবে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, সুশাসনের অভাবে ভোগা নেপালকে এগিয়ে নেওয়া মুখের কথা নয়। বালেন্দ্র শাহের মতো একেবারে নতুন যেকোনো সরকারের জন্য এটি আসলেই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিপরীত চিত্র বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কায়
তবে নেপালের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন ফলাফল দেখা যায় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের জেন-জি অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে। দুটি দেশেই উচ্চমাত্রার আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, আমূল পরিবর্তন হয়নি।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে নেপালের তুলনায় কিছু মৌলিক পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসে। শ্রীলঙ্কার ২০২৪ সালের নির্বাচনে একটি বামপন্থী জোট সরকার গঠন করে, যা নতুন হলেও পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়েই তৈরি হয়েছিল।
ভিন্নতা ভারতে
এই দেশগুলোর চেয়ে অতি সম্প্রতি ভারতে হয়ে যাওয়া ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন জেন-জি আন্দোলনের চাওয়া-পাওয়ায় আরেকটু ভিন্নতা যোগ করেছে। গত মে মাসে ভারতের জাতীয় মেডিকেল পরীক্ষা ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সরকারি ও রাজ্য স্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার ফলাফল ও মূল্যায়নে বড় ধরনের অনিয়মকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তরুণদের আন্দোলন।
দুর্নীতি এবং উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ক্ষোভ থেকে শুরু হয় তরুণদের আন্দোলন। দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সংগঠিত হলে বিশাল আন্দোলনের জন্ম নেয়।
টানা আন্দোলনের মুখে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। তারুণ্যের এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করে।
তবে ভারতে জেন-জিদের আন্দোলনে রাজনৈতিক আলাপের ধরনে পরিবর্তন আসলেও সরকার ব্যবস্থা বদলে যায়নি।
তথ্যসূত্র: দ্য কনভারসেশন
.png)






