স্ট্রিম ডেস্ক
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ইসি বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে ব্যাপক অনিয়ম। আওয়ামী লীগ আমলে টানা তিনটি নির্বাচনে কারচুপি নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের হতাশাকে আরও গভীর করেছে।
তবে ইতিবাচক ব্যাপার হলো মানুষের সরকার গঠনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে হরণ করার পরিণতি কখনোই ভালো হয়নি। এরকম প্রতিটি প্রক্রিয়াই দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছুঁড়ে ফেলেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয় মানুষের ভোটাধিকার হরণের চূড়ান্ত ফল হিসেবে।
১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার পতনের পর গণতন্ত্রের আশা এদেশের মানুষের মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল। সেই আশা অচিরেই ধূলিসাৎ হয়। আর তার জের এই দেশের জনগণ বয়ে বেড়িয়েছে ২০২৪ পর্যন্ত। এখন আবার নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কি ১৯৯০ এর মতো আশাভঙ্গের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে? সেজন্য কতটুকুই বা তার প্রস্তুতি? উপ-মহাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসই বা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
কবে থেকে আমরা ভোট দেওয়া শুরু করলাম
উপ-মহাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার সূত্রপাত ব্রিটিশ আমলে। ১৮৮২ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে শুরু হয় এই ইতিহাস। সমালোচকরা বলেন, ব্রিটিশরা সেই নির্বাচন চালু করেছিল ভারতীয়দের বিভক্ত করার কৌশল হিসেবে। একটা সময় সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না। তখন নির্দিষ্ট পরিমাণ করদাতারাই ভোট দিতে পারতেন। আবার কখনো বা বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা আসন নির্ধারণ করেও নির্বাচন হতো। সর্বোপরি সাধারণ নাগরিক হিসেবে নির্বাচনের বদলে এখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজন প্রবল রূপে বাড়তে থাকে।
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার প্রাককালে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন পাকিস্তান গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। নির্বাচনে মুসলিম লীগ মুসলমান ভোটারদের ৭৪ শতাংশ সমর্থন পায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন
পাকিস্তান আমলের শেষ বছর ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে গণরায়ে পরিণত করে। আওয়ামী লীগ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয় পায়। কিন্তু পাকিস্তানিরা ফলাফল মেনে না নিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নতুন গণতান্ত্রিক সূচনার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধীদের দমন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে চাপ এবং ভোট কারচুপি নির্বাচনকে কলুষিত করে। পরবর্তীকালে সামরিক শাসন নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করে।
সামরিক শাসনের অধীনে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনগুলো কারচুপি এবং বয়কটে জর্জরিত ছিল। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের সামরিক শাসনের সমাপ্তি ঘটে। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এক অভূতপূর্ব সমঝোতায় উপনীত হয়। ক্ষমতাসীন কোনো সরকার যেনো নির্বাচনে অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে তারজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এরকম এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে আবার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অধীনে ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আইনগত রূপ দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার রাজনীতি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। পরবর্তীতে নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অনাস্থার পথ ধরে ২০০৭ সালে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মূল ব্যক্তিত্বদের সরিয়ে দিয়ে একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা সামরিক এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রয়াস হিসেবে গণ্য করে জনগণ শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়নি। পরবর্তীতে পুনরায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচন অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য হলেও এরপর থেকে আওয়ামী শাসনামলের কোনো নির্বাচনই ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
এবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে গণতান্ত্রিক সংস্কারের রোডম্যাপ। আগামী নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ সামনে এনেছে নতুন এক বাস্তবতা। প্রশ্ন জেগেছে, কীভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে?
এখন পর্যন্ত আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে ঘাটতিগুলো আছে
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে, জাতীয় নির্বাচন হলো ৩০০ আসনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মাধ্যমে সংসদ এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের সংবিধানের কাঠামোয় ত্রুটির কারণে জনগণের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হয়। ফলে নির্বাচন প্রায়শই কারচুপি, ভোট ছিনতাই, গুম-খুন এবং দলীয় অপব্যবহারে পর্যবসিত হয়।
সাধারণত ধারণা করা হয় যে, নির্বাচন জনগণকে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দেয়। কিন্তু, বাস্তবে এটি ‘সংখ্যালঘিষ্ঠের’ সরকার গঠন করে। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা যায় ৩০-৪০ শতাংশ ভোট নিয়ে সরকার গঠিত হয়। বাকি ৬০-৭০ শতাংশ ভোটার প্রতিনিধিত্বহীন থাকে। এভাবে সংখ্যালঘিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দলীয় প্রতিনিধিতে পরিণত হয়, জনগণের নয়। কারণ, বাংলাদেশের সংবিধানের কাঠামোও এমন যে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে এমন নির্বাচন গণতন্ত্রের পরিবর্তে ক্ষমতার বাণিজ্য, লুটপাট এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করে। নির্বাচনে কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং মাফিয়াদের দাপটে মেধাবী নেতৃত্ব হেরে যেতে থাকে। তাই নির্বাচনে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার কথা থাকলেও ঐতিহাসিক ত্রুটি একে ক্ষমতার খেলায় পরিণত করে। তবে এবার প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সব বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশকে নতুন রাজনৈতিক যাত্রায় নিয়ে এসেছে। আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করেছে—গণতন্ত্রের দাবি আজও শক্তিশালী ও জীবন্ত। তবে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে কিছুটা অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনাও দেখা গেছে।
জুলাই বিপ্লবের বছরপূর্তিতে সরকার জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে। তরুণরা রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যদিও এবারও অনেকে নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে ইউনূস সরকার নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
আগামী নির্বাচন যে সম্ভাবনা তৈরি করবে
আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা, সংখ্যানুপাতিক ভোট ব্যবস্থা (পিআর) চালুর আলোচনা, তরুণদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি নতুন মাত্রা পাবে।
অনেকে মনে করছেন, ভোটের সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করলে সংখ্যালঘিষ্ঠের একদলীয় সরকার বন্ধ হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই নির্বাচন হতে পারে নতুন করে ‘আমাদের বাংলাদেশ’ গড়ার সুযোগ।
অস্থিরতা এবং অতীতের ছায়া
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিহিংসার রাজনীতি নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করতে পারে। অতীতের কারচুপির পুনরাবৃত্তি হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। একচেটিয়াভাবে পুরনো দলের প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এবং ভোটের সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি গ্রহণ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন সফল হবে না। নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, কালো টাকা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ভোট প্রক্রিয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার গঠন নিশ্চিত হবে।
জাতীয় নির্বাচন মানে কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এটি জনগণের আস্থা, অধিকার ও স্বপ্নের প্রতিফলন। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আর যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া আবারও কলুষিত হয়, তবে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হবে এবং রাষ্ট্র গভীর সংকটে পড়বে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ইসি বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে ব্যাপক অনিয়ম। আওয়ামী লীগ আমলে টানা তিনটি নির্বাচনে কারচুপি নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের হতাশাকে আরও গভীর করেছে।
তবে ইতিবাচক ব্যাপার হলো মানুষের সরকার গঠনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে হরণ করার পরিণতি কখনোই ভালো হয়নি। এরকম প্রতিটি প্রক্রিয়াই দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছুঁড়ে ফেলেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয় মানুষের ভোটাধিকার হরণের চূড়ান্ত ফল হিসেবে।
১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার পতনের পর গণতন্ত্রের আশা এদেশের মানুষের মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল। সেই আশা অচিরেই ধূলিসাৎ হয়। আর তার জের এই দেশের জনগণ বয়ে বেড়িয়েছে ২০২৪ পর্যন্ত। এখন আবার নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কি ১৯৯০ এর মতো আশাভঙ্গের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে? সেজন্য কতটুকুই বা তার প্রস্তুতি? উপ-মহাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসই বা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
কবে থেকে আমরা ভোট দেওয়া শুরু করলাম
উপ-মহাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার সূত্রপাত ব্রিটিশ আমলে। ১৮৮২ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে শুরু হয় এই ইতিহাস। সমালোচকরা বলেন, ব্রিটিশরা সেই নির্বাচন চালু করেছিল ভারতীয়দের বিভক্ত করার কৌশল হিসেবে। একটা সময় সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না। তখন নির্দিষ্ট পরিমাণ করদাতারাই ভোট দিতে পারতেন। আবার কখনো বা বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা আসন নির্ধারণ করেও নির্বাচন হতো। সর্বোপরি সাধারণ নাগরিক হিসেবে নির্বাচনের বদলে এখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজন প্রবল রূপে বাড়তে থাকে।
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার প্রাককালে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন পাকিস্তান গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। নির্বাচনে মুসলিম লীগ মুসলমান ভোটারদের ৭৪ শতাংশ সমর্থন পায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন
পাকিস্তান আমলের শেষ বছর ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে গণরায়ে পরিণত করে। আওয়ামী লীগ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয় পায়। কিন্তু পাকিস্তানিরা ফলাফল মেনে না নিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নতুন গণতান্ত্রিক সূচনার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধীদের দমন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে চাপ এবং ভোট কারচুপি নির্বাচনকে কলুষিত করে। পরবর্তীকালে সামরিক শাসন নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করে।
সামরিক শাসনের অধীনে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনগুলো কারচুপি এবং বয়কটে জর্জরিত ছিল। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের সামরিক শাসনের সমাপ্তি ঘটে। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এক অভূতপূর্ব সমঝোতায় উপনীত হয়। ক্ষমতাসীন কোনো সরকার যেনো নির্বাচনে অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে তারজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এরকম এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে আবার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অধীনে ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আইনগত রূপ দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার রাজনীতি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। পরবর্তীতে নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অনাস্থার পথ ধরে ২০০৭ সালে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মূল ব্যক্তিত্বদের সরিয়ে দিয়ে একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা সামরিক এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রয়াস হিসেবে গণ্য করে জনগণ শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়নি। পরবর্তীতে পুনরায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচন অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য হলেও এরপর থেকে আওয়ামী শাসনামলের কোনো নির্বাচনই ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
এবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে গণতান্ত্রিক সংস্কারের রোডম্যাপ। আগামী নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ সামনে এনেছে নতুন এক বাস্তবতা। প্রশ্ন জেগেছে, কীভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে?
এখন পর্যন্ত আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে ঘাটতিগুলো আছে
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে, জাতীয় নির্বাচন হলো ৩০০ আসনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মাধ্যমে সংসদ এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের সংবিধানের কাঠামোয় ত্রুটির কারণে জনগণের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হয়। ফলে নির্বাচন প্রায়শই কারচুপি, ভোট ছিনতাই, গুম-খুন এবং দলীয় অপব্যবহারে পর্যবসিত হয়।
সাধারণত ধারণা করা হয় যে, নির্বাচন জনগণকে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দেয়। কিন্তু, বাস্তবে এটি ‘সংখ্যালঘিষ্ঠের’ সরকার গঠন করে। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা যায় ৩০-৪০ শতাংশ ভোট নিয়ে সরকার গঠিত হয়। বাকি ৬০-৭০ শতাংশ ভোটার প্রতিনিধিত্বহীন থাকে। এভাবে সংখ্যালঘিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দলীয় প্রতিনিধিতে পরিণত হয়, জনগণের নয়। কারণ, বাংলাদেশের সংবিধানের কাঠামোও এমন যে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে এমন নির্বাচন গণতন্ত্রের পরিবর্তে ক্ষমতার বাণিজ্য, লুটপাট এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করে। নির্বাচনে কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং মাফিয়াদের দাপটে মেধাবী নেতৃত্ব হেরে যেতে থাকে। তাই নির্বাচনে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার কথা থাকলেও ঐতিহাসিক ত্রুটি একে ক্ষমতার খেলায় পরিণত করে। তবে এবার প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সব বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশকে নতুন রাজনৈতিক যাত্রায় নিয়ে এসেছে। আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করেছে—গণতন্ত্রের দাবি আজও শক্তিশালী ও জীবন্ত। তবে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে কিছুটা অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনাও দেখা গেছে।
জুলাই বিপ্লবের বছরপূর্তিতে সরকার জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে। তরুণরা রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যদিও এবারও অনেকে নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে ইউনূস সরকার নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
আগামী নির্বাচন যে সম্ভাবনা তৈরি করবে
আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা, সংখ্যানুপাতিক ভোট ব্যবস্থা (পিআর) চালুর আলোচনা, তরুণদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি নতুন মাত্রা পাবে।
অনেকে মনে করছেন, ভোটের সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করলে সংখ্যালঘিষ্ঠের একদলীয় সরকার বন্ধ হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই নির্বাচন হতে পারে নতুন করে ‘আমাদের বাংলাদেশ’ গড়ার সুযোগ।
অস্থিরতা এবং অতীতের ছায়া
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিহিংসার রাজনীতি নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করতে পারে। অতীতের কারচুপির পুনরাবৃত্তি হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। একচেটিয়াভাবে পুরনো দলের প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এবং ভোটের সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি গ্রহণ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন সফল হবে না। নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, কালো টাকা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ভোট প্রক্রিয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার গঠন নিশ্চিত হবে।
জাতীয় নির্বাচন মানে কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এটি জনগণের আস্থা, অধিকার ও স্বপ্নের প্রতিফলন। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আর যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া আবারও কলুষিত হয়, তবে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হবে এবং রাষ্ট্র গভীর সংকটে পড়বে।
পাকিস্তানের বক্তব্যে ‘শত্রু’ বলতে সাধারণত প্রতিবেশী ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারতকেই বোঝানো হয়। এই ঘোষণার কয়েকদিন পর ভারত ৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার অগ্নি-ভি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ পরীক্ষার সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন বাহিনী গঠনের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
১ দিন আগেবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) দেশের সব প্রকৌশল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নেমেছেন। সরকারি চাকরিতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের কোটা বাতিল করে বিএসসি প্রকৌশলীদের প্রতি বৈষম্য নিরসনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন তারা।
২ দিন আগে২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সরকার মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘৃণা এবং অসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ২০২৪ সালে বিজেপির টানা তৃতীয়বারের মতো জয় ভারতীয় সমাজে এমন কিছু সাংবিধানিক, বিচারিক এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে যা ভারতের মুসলিম জনগণের দৈনন্দিন জীবনের পরিস্থিতি আরও খারাপ
২ দিন আগেরোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন খুব সহজ নয়। ২০২১ সাল থেকে মিয়ানমারে চলা গৃহযুদ্ধে রাখাইন রাজ্য অন্যত ম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
৩ দিন আগে