গত শুক্রবার রাতে ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভোরের আগে রাজধানী কারাকাস বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে।
এই ঘটনা পুরো লাতিন আমেরিকায় একপ্রকার ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও কড়া হুঁশিয়ারি দেন। এবার তাঁর নিশানা কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকো। এই দেশগুলোকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, তাদের ‘সংশোধন’ হতে হবে। মাদক পাচার ও পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার দোহাই দিয়ে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিইএ এজেন্টদের পাহারায় হেলিকপ্টার থেকে নামছেন নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেস। ছবি: সিএনএনট্রাম্পের এই মন্তব্যের ফলে আবারও পুরোনো ক্ষোভ জেগে উঠছে। লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো সাধারণত ওয়াশিংটনের এমন হস্তক্ষেপ ভালোভাবে দেখে না। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের এই দাদাগিরি থামানোর মতো সামরিক শক্তি এই দেশগুলোর নেই।
সামরিক শক্তির বৈষম্য
আমেরিকা শুধু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির অধিকারীই নয়, তাদের খরচের বহরও বিশাল। বিশ্বের অন্য ১০টি বড় সামরিক শক্তির দেশ মোট যা খরচ করে আমেরিকা একা তার চেয়েও বেশি খরচ করে। ২০২৫ সালে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার। যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা আমেরিকার ধারেকাছেও নেই। ২০২৫ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্যানুসারে এই অঞ্চলে ব্রাজিলের সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে তাদের অবস্থান ১১তম।
অন্যান্য দেশের মধ্যে মেক্সিকো বিশ্বে ৩২তম। কলম্বিয়া আছে ৪৬তম অবস্থানে। ভেনেজুয়েলা ও কিউবার অবস্থান যথাক্রমে ৫০তম ও ৬৭তম। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, তারা সবদিক দিয়েই আমেরিকার চেয়ে পিছিয়ে। সক্রিয় সেনা, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, নৌবাহিনীর সম্পদ বা বাজেট কোনো কিছুতেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দিতে পারে না। ট্যাংক, বিমান ও নৌবহরের সাধারণ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক ওপরে।
সৈন্য সংখ্যাতেও যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে কেউ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ লক্ষ ৩০ হাজার সৈন্যের বিপরীতে মেক্সিকোর রয়েছে ৪ লক্ষ ১২ হাজার, কলম্বিয়ার ২ লক্ষ ৯৩ হাজার ২০০, ভেনেজুয়েলার ১ লক্ষ ৯ হাজার এবং কিউবার ৪৫ হাজার ৫০০ জন।
যুদ্ধবিমান আছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩,০৪৩টি, মেক্সিকোর ৪৩৩টি, কলম্বিয়ার ৪৩৬টি, ভেনেজুয়েলার ২২৯টি এবং কিউবার ৩১টি।
সামরিক বাজেট আমেরিকার ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার, মেক্সিকোর ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন, কলম্বিয়ার ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন, ভেনেজুয়েলার ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন এবং কিউবার ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই দেশগুলোর একটি জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভিন্ন সুবিধা আছে। সেটি হলো তাদের প্যারামিলিটারি বা আধা-সামরিক বাহিনী। কিউবার ১ দশমিক ১৪৫ মিলিয়ন প্যারামিলিটারি সেনা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার আছে ২ লক্ষ ২০ হাজার। কলম্বিয়ার ১ লক্ষ ৫০ হাজার এবং মেক্সিকোর আছে ১ লক্ষ ২০ হাজার। আমেরিকায় এ ধরনের কোনো বাহিনী নেই। এই বাহিনীগুলো নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে। প্রথাগত যুদ্ধের বাইরে এরা গোপন বা চোরাগোপ্তা লড়াইয়ে দক্ষ।
প্যারামিলিটারি শক্তির ভূমিকা
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে এই আধা-সামরিক বা অনিয়মিত সশস্ত্র দলগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস আছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় এরা বড় ভূমিকা রাখে। সাধারণত এরা ভালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও দক্ষ হয়। রাজনৈতিকভাবে এদের প্রভাব থাকলেও এরা সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে কাজ করে।
কিউবার প্যারামিলিটারি বাহিনী বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের মতে, এতে প্রায় ১ দশমিক ১৪ মিলিয়নের বেশি সদস্য রয়েছে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়া ও পাড়া-মহল্লার প্রতিরক্ষা কমিটিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে টেরিটোরিয়াল ট্রুপস মিলিশিয়া সবচেয়ে বড়। যুদ্ধের সময় বা সংকটে এরা সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে।
ভেনেজুয়েলায় সরকারপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘কোলেক্টিভস’ বা ‘কোলেক্টিভো’ নামে পরিচিত। বিরোধীদের ভয় দেখানো বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অভিযোগ এদের বিরুদ্ধে আছে। এরা সেনাবাহিনীর অংশ না হলেও মনে করা হয় এরা সরকারের সমর্থন নিয়েই চলে। মাদুরোর সময়ে অস্থিরতার মধ্যে এদের সক্রিয়তা বেশি দেখা গেছে।
কলম্বিয়ায় আশির দশকে বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমনের জন্য ডানপন্থী প্যারামিলিটারি বাহিনী গড়ে উঠেছিল। ২০০৫ সালের দিকে এদের আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে অনেকেই আবার নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়। বর্তমানে তারা নব্য-প্যারামিলিটারি দল হিসেবে গ্রামের দিকে সক্রিয় আছে। শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শেই কলম্বিয়ান সেনাবাহিনী এদের গড়ে তুলেছিল।
মেক্সিকোতে মাদক চক্রগুলো কার্যত প্যারামিলিটারির মতোই কাজ করে। জেতাস-এর মতো দলগুলো মূলত সাবেক সেনাদের নিয়ে গঠিত। এদের হাতে থাকে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র। তারা স্থানীয় পুলিশকে টেক্কা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ করে। পরিস্থিতি সামলাতে মেক্সিকোর সেনাবাহিনীকেও এখন আইনশৃঙ্খলার কাজে নামতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পুরোনো অভ্যাস
গত দুই শতাব্দী ধরে লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার হস্তক্ষেপের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ১৯ শতকের শেষ ও ২০ শতকের শুরুতে মধ্য আমেরিকায় আমেরিকার সেনারা উপস্থিত ছিল। কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার জন্য চালানো সেসব অভিযানকে বলা হয় ‘ব্যানানা ওয়ারস’।
১৯৩৪ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ‘গুড নেইবর’ বা ভালো প্রতিবেশী নীতি চালু করেছিলেন। তিনি কথা দিয়েছিলেন হস্তক্ষেপ করা হবে না। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই নীতি টেকেনি। ১৯৪৭ সালে সিআইএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমেরিকা অনেক নির্বাচিত সরকার উৎখাতে অর্থ জুগিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পানামাই আমেরিকার আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ১৯৮৯ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ চালিয়েছিলেন। ট্রাম্পের এবারের হুমকি ও পদক্ষেপ সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ