নওগাঁ শহরের সবচেয়ে বড় ও নিত্যদিনের সংকট যানজট। কর্মব্যস্ত এই শহরের বাসিন্দাদের দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কেটে যায় সড়কে আটকে থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাঙাচোরা রাস্তা, বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন পার করছেন নগরবাসী। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে নওগাঁ শহরের এসব দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা।
নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীরা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তবে ভোটারদের কাছে এই আশ্বাস নতুন কিছু নয়। আগের নির্বাচনগুলোতেও একই প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ভোটাররা এবার আর মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে তুষ্ট নন; তাঁরা এমন জনপ্রতিনিধি চান যিনি নাগরিক সমস্যার সমাধানে ‘দৃশ্যমান’ উদ্যোগ নেবেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নওগাঁ-৫ আসন। এ আসনে এবার চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন প্রার্থী। তাঁরা হলেন—বিএনপি মনোনীত জাহিদুল ইসলাম ধলু, জামায়াতে ইসলামীর আ স ম সায়েম, সিপিবির শফিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন।
প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ঘরোয়া বৈঠক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কুশল বিনিময় করছেন। এসব আয়োজনেই ঘুরেফিরে আসছে শহরের নাগরিক ভোগান্তির কথা। প্রার্থীরাও দিচ্ছেন সমাধানের নানা আশ্বাস।
পৌর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘নওগাঁ পুরোনো শহর। এখানে রাস্তা আগের মতোই আছে কিন্তু যানবাহন বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে এ শহর এখন যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে। দশ মিনিটের রাস্তা যেতে সময় লাগে প্রায় চল্লিশ মিনিট। মনে হয়, সড়কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।’
আরেক বাসিন্দা রায়হান আলমের অভিযোগ, ‘ভোটের আগে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তার বাস্তবায়ন হয় না। যেই আসুক, তাকে মনে রাখতে হবে—নিজের ভবিষ্যৎ ভালো করতে হলে আগে জনগণের ভালো করতে হবে।’
সুমন আলী নামের এক ভোটার বলেন, ‘পুরোনো শহর হয়েও নওগাঁ এখনো অনেক পিছিয়ে। যানজট, জলাবদ্ধতা—সমস্যার শেষ নেই। ভোটের সময় নেতারা আসেন, ভোট নেন, তারপর আর দেখা মেলে না। এবার আমরা বাস্তব সমাধান চাই।’
প্রবীণ ভোটার গোপাল চন্দ্র বলেন, ‘আমি অনেক নির্বাচন দেখেছি। শহরের প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কথা বহু দিন ধরে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু সেটি এখনো আশ্বাসেই আটকে আছে। এবার আমরা এমন কাউকে চাই, যিনি তাঁর কথা বাস্তবায়ন করবেন।’
নির্বাচনী মাঠের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীও দিচ্ছেন আশ্বাসের বাণী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম ধলু বলেন, ‘জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপি কখনও আপস করেনি। গত ১৭ বছর তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। এই নির্বাচন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পুরো দেশ এখন নির্বাচনমুখী। আমরা আশা করছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নওগাঁ শহরের যানজট, জলাবদ্ধতাসহ নানামুখী সমস্যা আছে। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যার সমাধানে কাজ করব।’
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী আ স ম সায়েম বলেন, ‘নওগাঁ শহরের অনেক সমস্যা আছে। রাস্তা ছোট, তা বড় করা প্রয়োজন। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এগুলো ছাড়াও আরও সমস্যা আছে। আমি নির্বাচিত হলে সেসব নিয়ে কাজ করতে পারব। ইনশাআল্লাহ ভোটাররা জয়ী করলে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে।’
নওগাঁ-৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৩১ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৯৪ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৫ জন।
নওগাঁ শহরের ভোটারদের প্রত্যাশা এখন স্পষ্ট—প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, তাঁরা চান বাস্তব উন্নয়ন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটুকু ঘটে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।