জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিবিসির প্রতিবেদন

তারেক রহমান কি দেশে পরিবর্তন আনতে পারবেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

মাত্র দুই বছরের একটু বেশি আগে শেখ হাসিনা ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তখন কল্পনা করাও কঠিন ছিল, তাঁর টানা ১৫ বছরের ক্ষমতা এমন হঠাৎই ভেঙে পড়বে। কিংবা প্রায় হারিয়ে যেতে বসা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল এত বড় প্রত্যাবর্তন করবে।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এটি নতুন কিছু নয়। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কয়েক দশক ধরেই পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। যদিও এবার একটি বড় পার্থক্য আছে। এই প্রথম বিএনপির নতুন নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। প্রথমবারের মতো তিনি নিজে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভিন মুরশিদ বলেন, ‘আগে শাসন অভিজ্ঞতা না থাকাটাই সম্ভবত তাঁর (তারেক রহমান) জন্য ইতিবাচক হয়েছে। মানুষ পরিবর্তনকে একটি সুযোগ দিতে চায়। তাঁরা ভাবতে চায়, সত্যিই ভালো কিছু সম্ভব। তাই মানুষের মধ্যে অনেক আশা রয়েছে।’

বিএনপি বলছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনের পরপরই বিবিসিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলোকে আগে ঠিক করতে হবে।’

বাংলাদেশে এমন প্রতিশ্রুতির ইতিহাস দীর্ঘ, কারণ ক্ষমতায় এসে দলগুলো ধীরে ধীরে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এ যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্ম আগের মতো সবকিছু মেনে নিতে রাজি নয়।

অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আবার লড়াই করতে চাই না। আগের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই চূড়ান্ত বিজয় নয়। যখন আমাদের দেশ দুর্নীতিমুক্তভাবে চলবে এবং অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের আসল বিজয়।’

২১ বছর বয়সী তার চাচাতো বোন তাহমিনা তাসনিম বলেন, ‘আমাদের প্রথম চাওয়া হলো মানুষের মধ্যে ঐক্য। আমাদের একটি স্থিতিশীল দেশ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, লড়াই কীভাবে করতে হয় আমরা জানি। যদি আবার একই অবস্থা শুরু হয়, তবে আবারও লড়াই করার অধিকার আমাদের থাকবে।’

হাসিনার পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক ইউনূসের সময়কালে সহিংসতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন সরকারের জন্য বড় অগ্রাধিকার হবে। পাশাপাশি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, খাদ্যের দাম কমানো এবং বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার ঘাটতি সব দলের ক্ষেত্রেই সমস্যা। আমরা এমন সংসদ সদস্য দেখব, যারা আগে কখনো সংসদে আসেননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিক হলেও দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। ফলে এটি সহজ কাজ হবে না।’

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। তাদের জোটসঙ্গী জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা ছাত্রদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথমবার অংশ নিয়ে ছয়টি আসন পেয়েছে।

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী, যেখানে ইসলামি আইনের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে দলটির ওয়েবসাইটে লেখা আছে, ‘রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়’—এ কারণে তারা ক্ষমতায় এলে কী করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মুরশিদ বলেন, ‘এই নির্বাচনে জামায়াতের ভালো ফল অপ্রত্যাশিত নয়। জামায়াত খুব সংগঠিত একটি দল। তারা বহু দশক ধরে তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে। তবে সমস্যার দিক হলো, তারা মৌলিকভাবে গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পুরুষতান্ত্রিক।’

লুৎফা বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলই বাংলাদেশের নারীদের হতাশ করেছে। এবারের নির্বাচনে মাত্র ৪ শতাংশের একটু বেশি প্রার্থী ছিলেন নারী।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আমরা নারীরা দেখেছি—সব দলই আমাদের সম্মিলিত শক্তিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আনা যায়।’

বাংলাদেশের সংসদে মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত এবং বাকি ৫০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত, যা দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফলের অনুপাতে মনোনীত করা হয়।

এই নির্বাচন হাসিনার আমলের আগের কয়েকটি নির্বাচনের চেয়ে স্পষ্টভাবেই ভিন্ন ছিল—কারণ এটি ছিল প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক এবং ভোটের আগে ফল নিশ্চিত ছিল না।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে বিএনপির নেতা আমীর খসরু বলেন, ‘এটা আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। আওয়ামী লীগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। যখন নিজের জনগণ হত্যার, নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন ভবিষ্যতে তারা কোথায় থাকবে—তা মানুষই ঠিক করবে।’

ভারতে নির্বাসনে থাকা হাসিনা এই নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের নির্বাচন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমানে তার দলের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় আওয়ামী লীগ চিরতরে হারিয়ে গেছে বলা এখনই বলা যাবে না।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত