মৃত্যুবার্ষিকী/কমরেড মাও সে-তুংয়ের মতাদর্শিক চিন্তার কয়েকটি দিক
-36fa8b-480x270.webp)
আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা রয়েছে যে, মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী ১৯৬৩ সালে চীন সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর সেই সফরের ফসল হচ্ছে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মাও সে-তুংয়ের দেশে’। তাঁর সেই গ্রন্থে ভাসানী বলেছিলেন, ‘মাও সে-তুংয়ের দেশে আমাকে সব থেকে মুগ্ধ করেছে কি-এ প্রশ্ন অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন। এক দিক দিয়ে প্রশ্নটি দুরূহ। অপরদিকে একান্ত সহজ। অনেক ভেবে দেখেছি, প্রশ্নটির জবাব আমি এক কথায় দিতে পারি—হাসি। হ্যাঁ, হাসিই আমায় সব থেকে বেশী মুগ্ধ করেছে।’
বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই মজলুম নেতা বলেছেন, ‘চীনের মানুষ আজ হাসতে পারে। যে হাসিতে কান্না ঝরে না, যে হাসি অনশনক্লিষ্ট মুখে কুঞ্চন সৃষ্টি করে মুখ ব্যাদানের কারণ হয় না, যে হাসিতে আছে প্রাণের প্রাচুর্য আর জীবনের উচ্ছ্বাস।’ সেইসঙ্গে তিনি এ-ও জানিয়েছিলেন যে চীনের ‘নরনারী শিশুর মুখে আমি দেখে এসেছি সেই হাসি। ওদের মাঝে থাকতে থাকতে সে হাসি হয়তো আমাতেও সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছিল।’
এরপরই ভাসানী তাঁর নিজের দেশের জনগণের সঙ্গে সেই হাসির তুলনা করে মর্মবেদনায় কাতর হয়ে লিখেছেন, ‘তখন বুঝিনি এমন করে যে, হাসির অভাব কত নিষ্ঠুর। দেশে এসে আজ মিলিয়ে দেখছি আমার দেশের কৃষকের মুখের সঙ্গে চীনের কৃষকের মুখ। আমার দেশের কোটি কোটি মানুষের মুখ দেখছি। কিন্তু হাসি খুঁজে পাচ্ছি না তো, যে হাসি দেখে এলাম চেয়ারম্যান মাও সে-তুংয়ের দেশে। মাও সে-তুং চীনের মানুষকে কেবল হাসির ফোয়ারার পথ দেখিয়ে দেননি, তুলে দিয়েছেন সেই ফোয়ারা মুখ থেকে বঞ্চনা আর শোষণের ভারী পাথর।’ তাঁর সেই বক্তব্যে ভাসানী বাড়িয়ে কিছুই বলেননি।
২.
আধুনিক বিজ্ঞান ও সমাজভাবনায় জন ডেসমন্ড বার্নালের নাম বেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে। যাঁর সম্পর্কে ডরোথি ক্রোফুট হজকিন বলেছিলেন, ‘বার্নাল ছিলেন নানাবিধ বৈপরীত্যের গভীরে অন্তঃশীল ঐক্যের প্রতীক। যে-সমস্ত বৈপরীত্যকে কোনওভাবেই মেলানো যায় না বলে মনে হয়, তিনি তাদেরও ঐক্যের প্রতীক। তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, কিন্তু তাঁর আবিষ্কারগুলি সবচেয়ে কাজে লেগেছে রসায়ন আর জীববিজ্ঞানে; তিনি ছিলেন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উদ্দ্গাতা, কিন্তু যুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তির পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।’
সেই বার্নাল লিখেছিলেন, ‘১৯৫০ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং তার সহযোগী অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রে যে ধরনের রূপান্তর-প্রক্রিয়া লক্ষিত হয়, এশিয়াতে তারই সঙ্গে তুলনীয় ঘটনা ঘটে চিনে। সেখানে সমাজতান্ত্রিক ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’ গড়ে ওঠে।’
‘একটা ভালো কাজ করা কারো পক্ষেই কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে সারা জীবন ধরে ভালো কাজ করা...সর্বদা জনসাধারণ ও বিপ্লবের জন্য হিতকর কাজ করে যাওয়া।’
জে. বার্নাল সংক্ষেপে চিনের বিপ্লবের রূপরেখা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, ‘চিনের এই নয়া জমানার শিকড় চিনের জনগণের ঐতিহ্যের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত। তাঁদের প্রস্তুতিপর্ব চলেছে বহুদিন ধরে।’ সেখানে ‘তিরিশ বছর ধরে লড়াই করেছে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি আর তার সহযোগীরা। প্রথমে সাম্রাজ্যবাদ এবং চিনের সামন্ততান্ত্রিক সেনাপতিদের বিরুদ্ধে; তার পর চিয়াং কাই-শেক এবং বিপ্লবের প্রতি তার বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে, অতঃপর লং মার্চের পর জাপানিদের বিরুদ্ধে এবং সবশেষে চিয়াং ও তার মার্কিন পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে বিজয় অর্জন করেন তাঁরা।’
৩.
চীনের জনগণের এইসব লড়াইয়ে যে মানুষটি বরাবরই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি হলেন মানবজাতির অন্যতম রাজনৈতিক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক কমরেড মাও সে-তুং। যাঁর সম্পর্কে বিশিষ্ট অধ্যাপক, লেখক-অনুবাদক সরদার ফজলুল করিম তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘মাও সে-তুংয়ের মতো সহজ, জীবনঘনিষ্ঠ ভাষায় মনের কথা প্রকাশ করার, বিশ্বকে ব্যাখ্যা করার মতো লেখক খুব কমই আছেন।’
অনেকেরই হয়তো জানা আছে যে, তাঁর নিজের পরিচিত রাজনৈতিক মহলের মস্কোপন্থীদের সঙ্গেই সরদার ফজলুল করিমের উঠাবসা, চলাফেরা ও যোগাযোগ ছিল বেশি। এ-প্রসঙ্গে আবারও বার্নালের কথা এসে পড়ে। চীন সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই বিজ্ঞানী ও সমাজবিদ আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘চীনা বিপ্লবের যাঁরা নেতা, তাঁদের অনেকেই বিশিষ্ট বিদ্বান ব্যক্তি। মাও সে-তুং নিজে কবি এবং দার্শনিক। মার্কসীয় তত্ত্ব নিয়ে তিনি যে-চর্চা করেছেন, সে-তত্ত্বকে তিনি যেভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা থেকে বোঝা যায়, আধা-ঔপনিবেশিক দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে মার্কস ও লেনিনের শিক্ষাকে প্রয়োগ করার পথটি তিনি কত গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন।’
বার্নাল এ-ও বলেছিলেন যে, ‘লেনিনেরই মতো, মাও সাধারণ মানুষের অপার ক্ষমতা ও মূল্য উপলব্ধি করেছিলেন।’ সেইসঙ্গে তিনি এটিও যোগ করেছিলেন, ‘বস্তুত, চীনের অতীত আগে কখনও এমন জীবন্ত হয়ে ওঠেনি।’ আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মাও সে-তুং চীনের অতীতকে জীবন্ত করেছিলেন বর্তমানের পথ বেয়ে একটি নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের তাগিদে। মার্কস-লেনিনের মতাদর্শে আস্থা রেখেই মাও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে চীনের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করে সে দেশের জনগণের বিপ্লবের পথ তৈরি করেছিলেন।
৪.
বিপ্লবের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে মাও সে-তুং জনগণের সম্মিলিত শক্তির পাশাপাশি একটি বিপ্লবী পার্টির প্রয়োজনীয়তা সবসময়ই অনুভব করেছিলেন। তার পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বিপ্লবী তত্ত্ব, অনুশীলন আর অভিজ্ঞতাকে। তিনি মনে করতেন, ‘ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান এবং যুক্তিসহ জ্ঞান গুণগতভাবে পৃথক; কিন্তু পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়’ বরং নিবিড় ‘অনুশীলনের ভিত্তিতে তারা ঐক্যবদ্ধ।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের অনুশীলন প্রমাণ করে যে, যা অনুভব করা যায় তা তৎক্ষণাৎ হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। এবং যা হৃদয়ঙ্গম করা হয়েছে কেবল তা-ই অধিকতর গভীরভাবে অনুভব করা যায়। ইন্দ্রিয়-অনুভূতি শুধুমাত্র বস্তুর বাহারূপের সমস্যারই সমাধান করে। আর একমাত্র তত্ত্বই পারে মর্মকথার সমস্যার সমাধান করতে। এই উভয় সমস্যার সমাধানকে অনুশীলন থেকে এতটুকুও আলাদা করা যায় না।’
এই মতাদর্শগত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার মিশ্রণে মাও সে-তুং তাঁর তত্ত্বে অমোঘতার এক সূত্র সামনে এনেছিলেন। এ বিষয়ে খুব সহজভাবেই তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে? সেগুলি কি আকাশ থেকে পড়ে?—না। সেগুলো কি মনের সহজাত?—তা নয়।’
এইভাবে প্রশ্নোত্তরের কায়দায় তিনি জানিয়েছিলেন, ‘মানুষের নির্ভুল চিন্তা-ধারা কেবলমাত্র সামাজিক অনুশীলন থেকেই আসে। সমাজের উৎপাদন সংগ্রাম, শ্রেণীসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এই তিনটি অনুশীলন থেকেই সেগুলো আসে।’ সেইসঙ্গে মাওয়ের অভিমত ছিল এই যে, ‘মানুষের সামাজিক সত্তা তার চিন্তাধারাকে নির্ধারণ করে। অগ্রগামী শ্রেণির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক নির্ভুল চিন্তাধারাকে জনসাধারণ একবার আয়ত্ত করার মাধ্যমে তার চারপাশের দুনিয়াকে রূপান্তরিত করে।’
‘প্রশাসনিক হুকুমনামা জারি করে বা পীড়নমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে যদি আদর্শগত বিষয়ের বা ন্যায্য-অন্যায্য নির্ধারণের প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা করা হয় তবে তা ফলপ্রদ তো হবেই না, বরং তাতে আরও ক্ষতিই হবে।’
মাওয়ের মতাদর্শের আরেকটি বিশিষ্টতা হচ্ছে, সামাজিক সত্যকে যাচাইয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করার অনুশীলন এবং তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। সে কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, জনগণ এবং সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বারবার বলার চেষ্টা করেছেন, ‘অনুশীলনের মাধ্যমে সত্যকে আবিষ্কার করুন, এবং আবার অনুশীলনের মাধ্যমেই সত্যকে যাচাই এবং বিকশিত করুন। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান থেকে শুরু করুন এবং তাকে সক্রিয়ভাবে যুক্তিসহ জ্ঞানে উন্নত করুন। তারপর যুক্তিসহ জ্ঞান থেকে শুরু করুন এবং আত্মমুখী ও বাস্তবমুখী এই উভয় জগৎকে পরিবর্তন করার জন্য সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী অনুশীলন পরিচালনা করুন।’ মাও মনে করতেন যে অনুশীলন থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে আবার অনুশীলন, এইভাবে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদী তত্ত্বের সামগ্রিকতাকে আয়ত্ত করতে হয়।
বিপ্লবী পার্টির গণতন্ত্রকে মাও কেন্দ্রিকতার সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে এবং ব্যক্তির স্বাধীনতাকে দেখতে চেয়েছেন নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে। তিনি স্বীকার করতেন যে, কেন্দ্রিকতা ও গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও নিয়মানুবর্তিতা একটি সামগ্রিক বিষয়ের দুটি পরস্পরবিরোধী দিক।’ এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেমন রয়েছে, তেমনি আছে একধরনের একতা। তিনি উল্লেখ করতে কখনো ভোলেননি যে, ‘আমাদের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার অর্থ গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতার মিলন, স্বাধীনতা ও নিয়মানুবর্তিতার মিলন। এই পদ্ধতিতে জনসাধারণ যেমন ব্যাপকভাবে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ভোগ করতে পারে, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক নিয়মানুবর্তিতার গণ্ডির মধ্যে তাদের থাকতে হয়। এ সমস্তই জনসাধারণ ভালো বোঝেন।’
শুধুই তত্ত্বগতভাবে নয়, বাস্তবেও মাও সে-তুং এটি প্রয়োগের চেষ্টা করে গিয়েছেন। সে কারণেই তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ‘প্রশাসনিক হুকুমনামা জারি করে বা পীড়নমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে যদি আদর্শগত বিষয়ের বা ন্যায্য-অন্যায্য নির্ধারণের প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা করা হয় তবে তা ফলপ্রদ তো হবেই না, বরং তাতে আরও ক্ষতিই হবে।’
এই বক্তব্যের বিস্তারে তিনি এটিও বলেছিলেন, ‘প্রশাসনিক হুকুম জারি করে ধর্মকে আমরা তুলে দিতে পারি না, ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগ করতে লোককে আমরা বাধ্যও করতে পারি না। লোককে জোর করে ভাববাদ ত্যাগ করাতে আমরা পারি না, যেমন পারি না জোর করে মার্কসবাদে বিশ্বাস করাতে।’
এই সমস্যার সমাধান তিনি করতে চেয়েছিলেন এইভাবে, তা হচ্ছে— ‘আদর্শমূলক বিষয়ের বা জনসাধারণের মধ্যেকার বিতর্কমূলক বিষয়ের সমাধান করতে গেলে, তা আমরা করতে পারি একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই। আলোচনা, সমালোচনা বোঝাবার চেষ্টা করা, শিক্ষা দেওয়া এই পদ্ধতিতেই তা হতে পারে।’ কোনো ধরনের ‘পীড়নমূলক ও স্বেচ্ছাচারমূলক পদ্ধতি’তে মাও সে-তুংয়ের কখনোই আস্থা ছিলো না।
৫.
মাওয়ের মতাদর্শের এইসব দিক পর্যালোচনা করে জে ডি বার্নাল বলেছিলেন, ‘সামাজিক দিক থেকে বিচার করলে, এই চৈনিক পরীক্ষাটির গুরুত্ব সুবিপুল। কারণ সে দেশের পরিস্থিতি রাশিয়ার তুলনায় একেবারেই আলাদা। সেই ভিন্ন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর এই সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের জনগণকে নিজ স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি অর্জনের উপযোগী এক নতুন কার্যকর সামাজিক রূপ আবিষ্কার করে ও গড়ে নিতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একথা তো সর্বজনস্বীকৃত যে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটতে সাধারণত বেশ সময় লাগে। এই চমকপ্রদ ব্যাপারটির আংশিক ব্যাখ্যা এইভাবে দেওয়া যায়: সুপ্রাচীন চৈনিক সভ্যতার ভাণ্ডারে জ্ঞান ও শিল্পকলার যে বিপুল সম্পদ বহু বছরের বিদেশি শাসন ও দেশি ভ্রষ্টাচারের চাপে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েছিল, বিপ্লব এসে তার বন্ধনমোচন করে, অর্থাৎ তার অধিকাংশটাই নতুন করে সৃষ্টি করতে হয়নি।’
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বার্নাল জানিয়েছিলেন, ‘চিনের বুদ্ধিজীবীদের গরিষ্ঠ অংশই নতুন জমানার উৎসাহী সমর্থক। চিনের যে ক-জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয়েছিল, তাঁদের প্রত্যেকের সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। চিনা সমাজের ঘোর দুর্দিনেও তাঁরা সে সমাজের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের মিলন ঘটানোর কাজে তাঁরা ব্যাপৃত। জনগণের স্বার্থে কাজ করার মধ্যে তাঁরা এক নতুন ধরনের তৃপ্তি অনুভব করেছেন। হাজার হাজার বছর ধরে অভিজাত পরিবারগুলো যে-সংস্কৃতিকে কুক্ষিগত করে রেখে দিয়েছিল, সেই সংস্কৃতিকে এবার তাঁরা জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছেন।’
এগুলোর সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল মাওয়ের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও তাঁর মতাদর্শগত অগ্রসরতার কারণে। ‘জনগণ, কেবলমাত্র জনগণই হচ্ছেন বিশ্ব-ইতিহাস সৃষ্টির চালিকা-শক্তি’—এই তত্ত্বগত জায়গা থেকে তিনি বিন্দুমাত্র কখনো সরে দাঁড়াননি।
৬.
মাও সে-তুং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, যেকোনো ‘সংগ্রামে আত্মদান অনিবার্য, মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যদি জনগণের স্বার্থ এবং সংখ্যাধিক জনগণের দুঃখ-দুর্দশা মনে রেখে জনগণের জন্য মৃত্যুবরণ করি, তাহলে আমাদের মৃত্যু সার্থক হবে।’
এর পাশাপাশি তিনি বলেছেন, ‘অধ্যয়নেও কমিউনিস্টদেরকে আদর্শ হতে হবে। তাঁরা প্রতিদিনই জনসাধারণের শিক্ষক, আবার প্রতিদিনই জনসাধারণের ছাত্র।’ আবার অন্যদিকে, সাহিত্য ও শিল্পকলার দিক থেকে ‘রাজনীতি ও শিল্পকলার একত্ব’, ‘বিষয়বস্তু ও রূপের একত্ব’, ‘বিপ্লবী বিষয়বস্তু ও নিখুঁত শিল্পরূপের একত্বে’ মাও সে-তুং আস্থা রেখেছিলেন।
অন্যদিকে তিনি বিষয়বস্তুর পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের শৈল্পিক দিকটিকে কোনোভাবেই অবহেলা করেননি। মাও মনে করতেন, ‘একটি শিল্পকর্ম রাজনৈতিক দিক থেকে যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, শৈল্পিক গুণের অভাবে তা শক্তিহীন হয়ে পড়ে।’ জীবন ও জগতের সামগ্রিকতার বোধকে এইভাবে তিনি একটা সুনির্দিষ্ট ভারসাম্যের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তাই তো তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের কমিউনিস্টদের ঝড়ঝাপটার মোকাবিলা করা এবং এই দুনিয়ার মুখোমুখি হওয়া উচিত।’
৭.
প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস ১৯৫৩ সালে ভারতীয় শান্তি কমিটির একদল শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে চীন ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তাঁর ‘অন্তরঙ্গ চীন’ গ্রন্থে সেই ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তিনি মাওয়ের নেতৃত্বের দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর দায়িত্বজ্ঞান সম্পর্কে সজাগের কথা বারবার তুলে ধরেছিলেন।
মাও বিশ্বাস করতেন যে, ‘একটা ভালো কাজ করা কারো পক্ষেই কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে সারা জীবন ধরে ভালো কাজ করা...সর্বদা জনসাধারণ ও বিপ্লবের জন্য হিতকর কাজ করে যাওয়া।’ নিজের জীবনেও তিনি সেই কথাগুলো প্রতিপালন করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জনগণের এই নেতা, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা প্রয়াত হন। যিনি প্রবলভাবেই মনে করতেন যে, ‘এই দুনিয়া হচ্ছে গণ-সংগ্রামের মহান দুনিয়া।’ সেই দুনিয়া এই মহান নেতাকে ভোলেনি।
- লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক
.png)







