‘আয়নাবাজি’ বাস্তবে, যেভাবে জামিন হলো জলিলের
স্ট্রিম সংবাদদাতাবরিশাল

কারাগার থেকে বেরিয়ে নিজ গ্রাম শিববাড়িয়ায় ফিরেছেন জলিল। আবার তাঁকে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরতে হবে। সেই আয়েই চলবে তার সংসার। কিন্তু জীবন থেকে চলে যাওয়া ১৮টি দিন আর ফিরবে না। কারাগারের বদ্ধ কুঠরী থেকে জলিল নিজের বন্দিদশার কথা জানাতে পারেননি তার স্ত্রী-সন্তানদেরকে। নিম্নবিত্ত পরিবারের নানান অপ্রতুলতা জলিলের মুক্ত হওয়ার সময়কে দীর্ঘ করছিল।
শেষ পর্যন্ত এক সহবন্দীর মাধ্যমে জলিলের বন্দিদশার কথা পৌঁছায় পরিবারের কাছে। পরে জানা যায়, পুলিশের ভুলে জলিলের এই কারাবাস।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন জলিল
ঘটনার শুরু আগস্টের ১৯ তারিখ। পারিবারিক বিরোধ নিয়ে চলা একটি সালিশ দেখতে গিয়েছিলেন জেলে মো. জলিল হাওলাদার (৪৭)। এই শালিসে গিয়েছিলেন পটুয়াখালীর মহিপুর থানার এএসআই শহীদুল ইসলাম ও এক কনস্টেবল। তারা জলিলকে ডেকে নাম ও বাবার নাম জানতে চান। এরপরই তাঁর হাতে পরানো হয় হাতকড়া।
গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। সেদিনই তাঁকে পাঠানো হয় আদালতে। পরে তাকে পাঠানো হয় পটুয়াখালী জেলা কারাগারে।
পরিবারের অপেক্ষা
জলিলের পরিবার জানেন না জলিল কোথায়। অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন তারা। জলিলের পরিবারে তিন মেয়ে, তাদের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে থাকেন সরকারি আবাসনের একটি ঘরে। তার স্বামীও পেশায় জেলে।
শিববাড়িয়া সরকারি আবাসন মহিপুর মৎস্যবন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। বর্ষায় কাঁচা রাস্তা চলাচলের প্রায় অনুপযোগী। অন্যদিকে অভাবের সংসার জলিলের। পটুয়াখালী জেলা কারাগারে গিয়ে জলিলের সঙ্গে দেখা করার সামর্থ্য তাঁর স্ত্রী বা মেয়েদের কারও ছিল না। কারাগারের ভেতর থাকলেও জলিল পরিবারের কাছে নিজের কথা পৌঁছাতে পারেননি। এভাবেই কেটে যায় ১৮ দিন। কারাগারে যাওয়ার পরই জলিল বুঝতে পারেন, পাওনা সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে অন্য জলিলের বদলে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তারতো কোনো ব্যাংক হিসাব নেই অথবা কারও কাছ থেকে টাকা ধারও নেননি। মঙ্গলবার(৮ সেপ্টেম্বর) মোবাইল ফোনে স্ট্রিমকে এমন কথাই জানান জলিল ।
জলিলের মেয়ে জেসমিন আক্তার বলেন, আমরা গরিব মানুষ। টাকা না থাকায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে জেলে যেতে পারিনি। পরের দিনই যদি যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো বাবাকে আরো আগেই মুক্ত করতে পারতাম। এই ১৮ দিনে বাবাকে মুক্ত করার জন্য টাকার আশায় অনেকের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কেউ টাকা দিতে চাননি। তাঁরা ভেবেছেন, টাকা দিলে আমরা ফেরত দিতে পারব না। জমিজমা তো দূরের কথা, আমাদের তেমন কোনো সম্পদই নেই।
জলিল নামের আয়নাবাজী
জলিলের নামে যে মামলা সেটিও ২০২৩ সালের। ওই বছরের ২৩ মে পটুয়াখালী সদর উপজেলার সেহাকাঠির বাসিন্দা আলমগীর হোসেন মামলা করেন। অভিযোগ, কলাপাড়ার শিববাড়িয়া এলাকার মো. জলিল হাওলাদারের কাছে তাঁর ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৩ টাকা পাওনা। এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ওই জলিলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। কিন্তু মামলার আসামি জলিল আর কারাগারে যাওয়া জলিল এক ব্যক্তি নন।
মামলার প্রকৃত আসামির বয়স ৩৫ বছর। মায়ের নাম মাজেদা বেগম। পরিবারের ভাষ্য, তিনি ২০২৩ সালের দিকে সৌদি আরবে চলে যান। এরপর আর দেশে ফেরেননি। সৌদি যাওয়ার আগে তিনি মহিপুরে গ্যাস আর লেপ-তোশকের ব্যবসা করতেন। অনেকের থেকেই দেনা করেছিলেন তিনি। সেটি কারো অজানা নয়। পাওনাদাররা তার পরিবারকে নিয়ে একাধিকবার বৈঠকেও বসেছিলেন।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া জলিলের বয়স ৪৭ বছর, মায়ের নাম হালিমা খাতুন। তিনি পেশায় জেলে। থাকেন সরকারি আবাসনে, নাম এক, বাবার নামেও মিল, গ্রামও এক, তবে মায়ের নাম ও মানুষটি আলাদা।
এই জলিল সেই জলিল নয়
ভুলটি ধরা পড়ে আগস্টের ১৯ তারিখে কিন্তু পরিবার জানতে পারেন ২ সেপ্টেম্বর। খোকন হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে জলিলের পরিবারকে এটি জানান। কারাগারে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে জলিলের পরিচয় হয়েছিল। জলিল তাঁকে জানিয়েছিলেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন।
পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে জলিলের মেয়ের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম মহিপুর থানার ওসি মো. শামীম হাওলাদারকে বিষয়টি জানান। এরপর পুলিশ ভুলটি বুঝতে পারে এবং ওসি জলিলের জামিনের জন্য আইনজীবীর ব্যবস্থা ও আর্থিক সহযোগিতা করেন। ৩ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যরা আইনজীবী হুমায়ুন কবীর বাদশার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জলিলের জামিনের আবেদন করেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আদালত জলিলের জামিন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মহিপুর থানার ওসিকে পরবর্তী ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেন।
জলিলকে গ্রেপ্তার করা এএসআই শহীদুল ইসলাম বলেন, সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারি, জলিল হাওলাদার নামের ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এলাকায় আছেন। নাম ও ঠিকানা মিলে যাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় আসামির মায়ের নাম উল্লেখ ছিল না।
মহিপুর থানার ওসি শামীম হাওলাদার বলেন, নাম, বাবার নাম ও গ্রামের মিল থাকায় এই ভুল হয়েছে। আমরা বিষয়টি জানতে পেরেই জলিলকে কারামুক্ত করার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করেছি।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, জলিল হাওলাদার খুবই নিরীহ মানুষ। সাগরে মাছ ধরে সংসার চালান। অভাবের সংসার হলেও তাঁর তেমন কোনো ধারদেনা নেই। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সংসার চালাতে হয়। ব্যাংকে তাঁর কোনো হিসাবও নেই। এমন একজন মানুষ পুলিশের ভুলের কারণে ১৮ দিন জেল খেটেছেন, এটা খুবই দুঃখজনক।
.png)
-028855-256x144.webp)



-8723c2-256x144.webp)


