ডাকসু ভোটের বর্ষপূতি/প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে বিস্তর ফারাক, বছরজুড়ে বিতর্কে নেতারা
ঢাকা

গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক প্রত্যাশার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ২৮ পদের মধ্যে ভিপি, জিএসসহ ২৩টিতেই জয় পেয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ওই ভোটের বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। তবে জয়ী প্যানেলের দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো সারা বছরই নানা কর্মকাণ্ডে ডাকসু নেতাদের নিয়ে হয়েছে বিতর্ক।
ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের মূল প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল– প্রথম বর্ষ থেকে সিট, মানসম্মত খাবার, নিরাপদ ক্যাম্পাস, রেজিস্ট্রার সংক্রান্ত কাজ পেপারলেস করা, যার কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারেননি শিক্ষার্থী নেতারা। বড় প্রতিশ্রুতির মধ্যে শুধু গেস্টরুম-গণরুম বন্ধ হয়েছে।
ঢাবির একাধিক শিক্ষার্থী স্ট্রিমকে জানান, মোটাদাগে তারা ডাকসুর কার্যক্রমে সন্তুষ্ট নন। পাশাপাশি গত এক বছরে ছাত্র সংসদ নেতাদের ক্যাম্পাসের বাইরের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডে বিরক্ত।
ডাকসু নেতাদের দাবি অবশ্য ভিন্ন। একাধিক নেতা জানান, সব প্রতিশ্রুতি নিয়েই কম-বেশি কাজ হয়েছে। তবে বাজেট সংকট এবং প্রশাসনের অসহযোগিতায় বড় উদ্যোগগুলো আটকে আছে।
এসি ও শাটলে খুশি শিক্ষার্থীরা, খাবার-নিরাপত্তায় অসন্তোষ
ডাকসুর এক বছরের ভালো কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, কিছু হলে জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রিডিংরুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র স্থাপন এবং ক্যাম্পাসে চলাচলে শাটল সার্ভিস চালুর মতো কয়েকটি দৃশ্যমান উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে হলের খাবারের মান ও ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানান বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। একজন বলেন, ‘শুধু রিডিং রুমে এসি দেওয়াই তো ছাত্র সংসদের কাজ হতে পারে না। খাবারের মানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। ক্লাস করার ফাঁকে খাওয়ার মতো ভালো কোনো ক্যাফেটেরিয়াও নেই।’
নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কয়েকজন বলেন, রাতে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার ঘটনা এখনো ঘটছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় নারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ডাকসু অবস্থান নিয়েছে তাদের বিপরীতে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের কাছে যা কাম্য নয়।
বড় ইশতেহার বাস্তবায়নে তহবিলের অভাবের কথা বলে দায় এড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন।
নেতাদের ঘিরে বিতর্ক
গত এক বছরে একাধিক ডাকসু নেতার কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বিতর্ক হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বহিরাগত কিশোরদের কান ধরে উঠবস করানো, ক্যাম্পাসে বহিরাগত উচ্ছেদে লাঠি হাতে তাঁর মারমুখী ভঙ্গির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালে তোপের মুখে পড়েন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও ‘মব জাস্টিসের’ অভিযোগে তীব্র সমালোচনায় পদত্যাগের ঘোষণাও দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়েরের কর্মকাণ্ডও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে ধাওয়া করার ঘটনায় সামনে আসেন তিনি। একজন ছাত্র সংসদ প্রতিনিধি শিক্ষককে ধাওয়া দিতে পারেন কি না তা নিয়ে সমালোচনাও হয়। এ ছাড়া একাধিক ঘটনায় তার মারমুখী ভঙ্গিও আলোচনায় আসে।
বিতর্ক থেকে বাদ যাননি ডাকসু ভিপি ও শিবির নেতা সাদিক কায়েমও। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দলীয় কর্মসূচিতে তাঁর সরব উপস্থিতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। দলকেন্দ্রিক ছাত্র-রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোটও চান। পরে ছাত্রশিবির ছেড়ে যোগ দেন জামায়াতে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে।
ক্ষুব্ধ ছাত্রসংগঠনগুলো
ইশতেহার বাস্তবায়নে ডাকসুর ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করেছে ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেন হত্যা এবং ক্যাম্পাস সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছুরিকাঘাতে ঢাবি ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচার নিশ্চিতে ডাকসুর ব্যর্থতা নিয়েও ক্ষোভ জানান অনেকে।
ছাত্রদলের বিজয় একাত্তর হল শাখার নেতা তানভীর আল হাদী বলেন, সাম্য হত্যার এক বছর পূর্তির দিনে যখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল শোকসভার আয়োজন করে, ডাকসু ভিপি তখন নিজের বিয়ের আয়োজন করেন।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর অর্থ সম্পাদক নুজিয়া হাসিন রাশার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তোফাজ্জল বা সাম্য হত্যার বিচারের মতো বড় ইস্যুগুলোতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো একটি দলের লেজুড়বৃত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই দিকেই নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাবি সভাপতি তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী বলেন, প্রশাসনের কাছে যখন ডাকসু কোনো দাবি নিয়ে যায়, তখন গুটি কয়েক সদস্য ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে না পারাটা তাদের বড় ব্যর্থতা।
প্রশাসনকে দায় নেতাদের
শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ ও সমালোচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাদেরই দুষছেন ডাকসু প্রতিনিধিরা। ভিপি সাদিক কায়েমের দাবি, ক্ষমতার দাপট নয়, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সেবা নিশ্চিত করায় যে ছাত্র সংসদের মূল লক্ষ্য—তা তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারে দুই কোটি টাকার প্রকল্প এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবার ছাত্রীদের সুবিধার্থে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক জিমনেশিয়াম নির্মিত হয়েছে। অথচ পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটি চালু করছে না। এরপরও আমরা স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা জোরদার, শাটল বাস, কেন্দ্রীয় উপাসনালয় সংস্কার এবং ক্যারিয়ার মেলার মতো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সচল রেখেছি।’
ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীমউদ্দীন খান বলেন, আবাসিক হলের খাবার মানসম্মত করতে সরকারি সংস্থা টিসিবির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, তবে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় ক্ষমতার পালাবদলের পর এটি স্থবির অবস্থায় আছে।
খেলার মাঠের বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ আট মাস ধরে টাকা পড়ে থাকলেও প্রশাসন কোনো কাজ শুরু করেনি। ব্যাংক সুদের সুযোগ নেওয়ার উদ্দেশেই হয়তো কোষাধ্যক্ষ অর্থ আটকে রেখেছেন।’
নিরাপত্তার বিষয়ে সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি বন্ধে শাহবাগ থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বিশেষ সাইবার সেল এবং সুরক্ষা বলয় গঠনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উপাচার্য এতে সম্মতি দেননি।’
ডাকসুর স্বকীয় তহবিল নিয়ে ক্ষোভ জানান কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না। তিনি বলেন, ‘পুরো পর্ষদের ২৮ জন প্রতিনিধির জন্য বার্ষিক মাত্র ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মাথাপিছু এক লাখের চেয়েও কম। তা সত্ত্বেও নিজেদের উদ্যোগে অর্থ জোগাড় করে আমরা নারী শিক্ষার্থীদের জিমনেশিয়ামসহ বিশাল অঙ্কের প্রকল্প সম্পন্ন করতে পেরেছি।’
.png)
-028855-256x144.webp)





