ইউনেস্কোর প্রতিবেদন/প্রাথমিকে ৯০%, উচ্চমাধ্যমিকে ৩৮%—শিক্ষায় বাংলাদেশের দুই চিত্র
স্ট্রিম ডেস্ক

গত তিন দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯০ সালে দেশের মাত্র ৩৪ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারত। ২০২৪ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে ৯০ শতাংশ। নিম্নমাধ্যমিকেও সমাপ্তির হার ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে উচ্চমাধ্যমিকে এসে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনো দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। ২০২৪ সালে এ স্তর শেষ করতে পেরেছে আনুমানিক ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৫৭ শতাংশ।
ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) রিপোর্টে বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে করা বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা সম্প্রসারণে বাংলাদেশে ‘বড় অগ্রগতি’ হয়েছে। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্যকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার প্রতি বছর গড়ে ২ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট করে বেড়েছিল। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০১৫ সালের পর এই বৃদ্ধির হার কিছুটা কমে হয়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
নিম্নমাধ্যমিকে অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রগতির গতি বেড়েছে। ১৯৯০-এর দশকে সমাপ্তির হার বছরে গড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট করে বাড়লেও ২০০০–২০১৫ সময়ে তা বেড়েছে ১ দশমিক ৬ পয়েন্ট এবং ২০১৫ সালের পর ১ দশমিক ৭ পয়েন্ট করে।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে এই স্তরে সমাপ্তির হার বৃদ্ধির গতি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার গড় গতির মাত্র ৪০ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার গড় গতির ৬০ শতাংশ। ২০১৫ সালের পর বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি দক্ষিণ এশিয়ার গড়কে ছাড়িয়ে গেছে। তবু ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক সমাপ্তির হার ৩৮ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ৫৭ শতাংশের তুলনায় ১৯ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
শুধু সমাপ্তির হার নয়, স্কুলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার মতো বয়সী তরুণদের ৭২ শতাংশ স্কুলের বাইরে ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় তখন এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এই হার দুই-তৃতীয়াংশ কমে দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের নিচে নেমে আসে। তখন দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চমাধ্যমিক পড়ার বয়সী তরুণদের স্কুলের বাইরে থাকার হার ছিল ৩৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো—ব্যানবেইসের তথ্যও উচ্চমাধ্যমিকে ঝরে পড়া কমার চিত্র দেখাচ্ছে। ২০০৯ সালে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৪২ শতাংশ ঝরে পড়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২১ শতাংশ।
মেয়েদের শিক্ষায় উল্টো চিত্র
বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো মেয়েদের অগ্রগতি। ২০০০ সাল থেকে অন্তত গড়ে নিম্নমাধ্যমিকে পড়ার বয়সী ছেলেদের স্কুলের বাইরে থাকার হার মেয়েদের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ২০২৪ সালে নিম্নমাধ্যমিকে পড়ার বয়সী ছেলেদের ১৫ শতাংশ স্কুলের বাইরে থাকলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও এই ব্যবধান বেড়েছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে ছেলে ও মেয়েদের স্কুলের বাইরে থাকার হার প্রায় সমান ছিল। ২০২৪ সালে প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার বয়সী তরুণদের স্কুলের বাইরে থাকার হার তরুণীদের চেয়ে ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। মডেলভিত্তিক হিসাবে ব্যবধান ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ইউনেস্কো বলছে, মেয়েদের এই অগ্রগতির পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রাম’। ১২ বছর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পর ১৯৯৪ সালে কর্মসূচিটি চালু হয়। এটি শর্তযুক্ত নগদ সহায়তা হিসেবে চালু হলেও বাস্তবে বৃত্তি কর্মসূচির মতো কাজ করেছে। এর একটি শর্ত ছিল অন্তত ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি।
প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যায়, কর্মসূচির কারণে মেয়েদের শিক্ষাজীবন ১ দশমিক ২ বছর বেড়েছিল। পরে ২৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সুবিধাভোগীরা তিন বছরের বেশি অতিরিক্ত শিক্ষা পেয়েছেন এবং মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার সম্ভাবনা ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। এর সঙ্গে বিয়ে বিলম্বিত হওয়া, প্রজনন হার কমা এবং দক্ষ কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। মেয়েদের পাশাপাশি তাদের ভাইদের শিক্ষার ফলাফলেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।
বাল্যবিবাহ কমেছে, বেড়েছে নারীর কর্মসংস্থান
শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে ইউনেস্কো দেখিয়েছে।
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনো বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। তবে গত ২৫ বছরে অগ্রগতি হয়েছে। ২০২২ সালের ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, ৪০–৪৪ ও ৬০–৬৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ের হার ৬০ শতাংশের বেশি ছিল। পরবর্তী প্রজন্মে এই হার বছরে প্রায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট করে কমে ১৮–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৩৯ শতাংশে নেমেছে।
বিয়ের পর শিক্ষায় থাকা কঠিন। ১৫–১৭ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বিয়ের পরও স্কুলে পড়া চালিয়ে যায় এবং অধিকাংশই এক বছরের বেশি পড়াশোনা চালাতে পারে না।
২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং পুরুষের ২১ বছর করা হয়েছে। তবে অভিভাবকের সম্মতি ও বিচারিক অনুমোদনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ বৈধ করার একটি বিশেষ বিধান রয়েছে। গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর চেষ্টাও চলছে।
বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানের হারও দীর্ঘদিন ধরে কমছে। ১৯৭৫ সালের দিকে প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৭। ১৯৯৫ সালে তা ৩ দশমিক ৬-এ নেমে আসে এবং ২০১৫ সালে হয় ২ দশমিক ২।
একই সময়ে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রতি বছর গড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট করে বেড়েছে। ২০২৩ সালে তা ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ভারতে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশে স্থবির ছিল, আর পাকিস্তানে বছরে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট করে বাড়ছিল।
এই পরিবর্তনে পোশাকশিল্পেরও ভূমিকা রয়েছে। কৃষির পর দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান খাত পোশাকশিল্প এবং নারীর কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কারখানার সংস্পর্শে আসা মেয়েদের বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের বয়স পিছিয়েছে। কোনো এলাকায় কারখানা স্থাপিত হলে মেয়েদের শিক্ষাগত অর্জনও বেড়েছে। কারণ কারখানাগুলোতে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়েছে। ১৭ থেকে ২৩ বছর বয়সী তরুণীরা অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পরিবর্তে পোশাক কারখানায় চাকরি বেছে নিয়েছে। তবে ১৭ ও ১৮ বছর বয়সীদের স্কুলে ভর্তির ওপর কারখানায় কর্মসংস্থানের সামান্য নেতিবাচক প্রভাবও পাওয়া গেছে।
স্কুলছুটদের ফেরাতে ‘দ্বিতীয় সুযোগ’
স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের ফিরিয়ে আনতেও বাংলাদেশে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু হয় ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন’ কর্মসূচি। কমিউনিটিভিত্তিক কেন্দ্রের মাধ্যমে স্কুল ছেড়ে দেওয়া প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকে পড়ার বয়সী শিশু-কিশোরদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফেরানোর চেষ্টা করা হয়।
মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রায় ৫ লাখ স্কুলবহির্ভূত শিশুকে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভর্তি করানো সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৩ সালের পর কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২১ সালে প্রায় ৭ লাখে পৌঁছায়। এসব শিক্ষার্থী এসেছে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে। শহরের বস্তিতে বসবাসকারী প্রায় ৫০ হাজার শিশুও এই শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় ১০ গুণ শিক্ষার্থী
সাধারণ শিক্ষার বাইরে কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০২ সালে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০। ২০১২ সালে তা বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ এবং ২০২২ সালে প্রায় ৮ হাজারে দাঁড়ায়।
এই সময়ে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীসংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৩ লাখে পৌঁছেছে—প্রায় ১০ গুণ। তবে শিক্ষার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ছেলে।
পাসের হার বাড়লেও মান নিয়ে প্রশ্ন
এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হারও কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৮ শতাংশ। ২০১২ সালে তা বেড়ে ৮৬ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৯৩ শতাংশ হয়।
করোনাকালে মাধ্যমিক পরীক্ষা আরও সীমিত করা হয়। তিনটি নির্বাচনী বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া, সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি এবং প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় দেওয়ার কারণে ২০২১ সালে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করে।
তবে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে পরীক্ষাকে সহজ করার এই প্রবণতার সমালোচনার কথাও বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে শিক্ষার মানের চেয়ে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়
ইউনেস্কোর বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশ শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ক্ষেত্রে গত তিন দশকে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, নিম্নমাধ্যমিকেও অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং মেয়েরা ছেলেদের পেছনে ফেলে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে।
কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক এখনো বড় দুর্বল জায়গা। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এই স্তর শেষ করতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু কতজন শিশু স্কুলে ঢুকছে তা নয়; বরং কতজন শেষ পর্যন্ত স্কুলে থাকছে এবং তারা কতটা শিখছে, সেই প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে দেখাচ্ছে, শিক্ষা সম্প্রসারণ কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতির ফল নয়। মেয়েদের জন্য বৃত্তি, বাল্যবিবাহের পরিবর্তন, নারীর কর্মসংস্থান, পোশাকশিল্পের বিকাশ এবং দরিদ্র শিশুদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগের শিক্ষা—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শিক্ষার এই পরিবর্তন।
.png)




-78ae87-256x144.webp)

