ডিজেল সংকট: কৃষক নয়, ঝুঁকিতে পড়েছে গোটা দেশ

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বোরো মৌসুম মানে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই একটি মৌসুম থেকে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষকের পুরো জীবন আবর্তিত হয় এই ফসলকে ঘিরে। হাল চাষ থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের শরীরে ঘাম, চোখে স্বপ্ন। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে একটাই শব্দ, ডিজেল।

গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই একটি সিদ্ধান্তে কৃষি খাতে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ওপরে। এই টাকাটা কার পকেট থেকে যাবে? যার হাতে ধানের কাস্তে, তার পকেট থেকেই।

বাংলাদেশের কৃষি কার্যত একটি ডিজেলচালিত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে জ্বালানিচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা ২১ লাখ ৩১ হাজারেরও বেশি। গভীর ও অগভীর নলকূপ থেকে শুরু করে কম্বাইন হারভেস্টর পর্যন্ত প্রতিটি যন্ত্র চলে ডিজেলে। সেচ মৌসুমের ছয় মাসে কৃষিতে ডিজেলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন, যার মধ্যে শুধু সেচেই লাগে সাড়ে সাত লাখ টন। দেশের ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনো ডিজেলনির্ভর।

এক বিঘা জমিতে বোরো ধান ফলাতে এখন খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলন ২২ থেকে ২৩ মণ, আর বাজারে হাইব্রিড ধানের দাম মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা। হিসাব করলে দেখা যায়, মোট আয় দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ খরচ উঠছে না, লোকসান হচ্ছে। বগুড়ার একজন কৃষকের হিসাবে, গত বছর বিঘায় লোকসান হয়েছিল ২২০০ টাকা। এবার ডিজেলের দাম বাড়ায় সেই লোকসান আরও বাড়বে। তাহলে কৃষক চাষ করে কেন? উত্তরটা সহজ নয়, কিন্তু কৃষকেরা নিজেই বলেন, বাপ-দাদার জমি ফেলে রাখার সাহস নেই।

শুধু দামের সমস্যা নয়, সংকটটা আরও গভীরে। দাম বাড়ার আগে থেকেই মাস দুয়েক ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ডিজেলের ঘাটতি চলছে। শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, রাজশাহী থেকে শুরু করে সিলেট পর্যন্ত কৃষকেরা পাম্পে পাম্পে ঘুরে ফিরে আসছেন খালি হাতে। যা পাচ্ছেন তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশিতে। দাম বাড়ার পরেও কোনো কোনো জায়গায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। বরিশালে বিএডিসির ৭০টি সেচ পাম্পের প্রতিটিতে দিনে ১২ লিটার ডিজেল দরকার হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ লিটার।

হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতি আলাদাভাবে ভাবনার দাবি রাখে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে। এই এলাকায় ধান কাটার সময় অত্যন্ত সীমিত। আগাম পাহাড়ি ঢল আসার আগেই সব ঘরে তুলতে হয়। সেচের পাশাপাশি দ্রুত ধান কাটতে কম্বাইন হারভেস্টার ছাড়া কোনো উপায় নেই। একটি হারভেস্টার চালাতে দিনে দরকার হয় প্রায় ১৬০ লিটার ডিজেল। পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ লিটার। ফলে মেশিন মাঠের মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, পাকা ধান ক্ষেতে পড়ে থাকছে। এক বছর আগেও হাওরে প্রতি একর জমির ধান কাটতে খরচ হতো ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া বেড়ে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ১২ হাজার টাকায় ঠেকেছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বোরো মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত হারভেস্টার ও সেচ পাম্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সারের সংকট। গ্যাস সংকটে দেশের অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ। শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানায় উৎপাদন চলছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া তৈরি হচ্ছে। ডিলার পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম হওয়ার কথা এক হাজার ৩৫০ টাকা, কিন্তু কৃষকদের কাছে তা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। টিএসপি কোনো কোনো এলাকায় একেবারেই মিলছে না। এই তিনটি সংকট একসঙ্গে এলে ফলন বিপর্যয়ের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এখানে একটা প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কি ভুল ছিল? না, সিদ্ধান্তটা ভুল নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশকে কঠিন পদক্ষেপ নিতেই হয়। সরকারের পক্ষে প্রতিদিন শতকোটি টাকার ভর্তুকি অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সমস্যা হলো সময়টা। ধান কাটার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই ঘোষণা না দিয়ে বোরো মৌসুম শেষ হওয়ার পরে দিলে কৃষি খাতের তাৎক্ষণিক চাপটা অনেকটাই কমানো যেত।

সরকার কিন্তু কৃষকের কথা একেবারে ভাবেনি, এটা বলা ঠিক হবে না। চলতি বছরের শুরু থেকেই বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে, সুদসহ যার পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। গত ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে ১০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বীজ ও সারসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। আগামী চার বছরে এক কোটি ৬৫ লাখ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

কিন্তু এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। কৃষক কার্ড একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, ঋণ মওকুফও একটি কাঠামোগত সহায়তা। এই দুটো পদক্ষেপ যখন নেওয়া হলো, তখন ঠিক একই সময়ে ডিজেলের দাম বেড়ে গেল। তাৎক্ষণিক সংকটের জন্য তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দরকার ছিল। সেটা হলো, বোরো মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেচ ও হারভেস্টিংয়ে ব্যবহৃত ডিজেলে বিশেষ ভর্তুকি বা অগ্রাধিকার সরবরাহের ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এবং তাৎক্ষণিক সুরক্ষা, দুটো আলাদা জিনিস। একটা দিয়ে আরেকটার শূন্যস্থান পূরণ হয় না।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটা হলো ভবিষ্যৎ। এই বোরো মৌসুমে কৃষক লোকসান গুনলে পরের বছর আবাদ কমাবেন। আবাদ কমলে চালের উৎপাদন কমবে। চালের উৎপাদন কমলে আমদানি বাড়বে। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়বে। আর চালের দাম বাড়লে তার সবচেয়ে বেশি ভার বহন করতে হবে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষকে, যাদের আয়ের বড় অংশই খাবারের পেছনে যায়।

এই কাঠামোগত দুর্বলতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। দশকের পর দশক ধরে ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বিকল্পে বিনিয়োগ হয়নি। বর্তমানে বোরো আবাদের ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ জমি ডিজেলচালিত পাম্পনির্ভর। এই নির্ভরতা না কমালে প্রতিটি জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের সময় একই ধাক্কা আসবে। তাই এখন যা করণীয় তা হলো তিনটি স্তরে একসঙ্গে ভাবা। প্রথমত, এই মুহূর্তে বোরো মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত হারভেস্টার ও সেচ পাম্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যে মাঠে পাকা ধান দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে জ্বালানির অভাবে মেশিন থামলে ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য এখনই পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। কৃষক কার্ড ও ঋণ মওকুফের মতো পদক্ষেপে যে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে, সেই একই সদিচ্ছা এই মুহূর্তে ন্যায্য দামের নিশ্চয়তায় দেখাতে হবে। না হলে এবার লোকসান গুনে কৃষক আগামী মৌসুমে আবাদ কমাবেন, আর সেটা গিয়ে আঘাত করবে সরাসরি চালের বাজারে। তৃতীয়ত, মধ্যমেয়াদে সৌরচালিত সেচ পাম্পে রূপান্তরের জন্য সহজ ঋণ, ফসল বিমা ও প্রযুক্তি সহায়তা একসঙ্গে দিতে হবে। শুধু প্রযুক্তি দিলে হবে না, কারণ যে কৃষক প্রতিটি মৌসুমে ধার করে চাষ করেন, তিনি একা সৌর পাম্পের অগ্রিম বিনিয়োগ বহন করতে পারবেন না। দেশে মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে, আর ১৭ কোটি মানুষের প্রধান খাবার ভাত। জ্বালানির দাম সমন্বয় একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু কোন সময়ে, কোন সুরক্ষার সঙ্গে এবং কোন বিকল্পের হাত ধরে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটাই ঠিক করে দেয় রাষ্ট্র আসলে কার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বোরো মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত হারভেস্টার ও সেচ পাম্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কৃষক কার্ড ও ঋণ মওকুফের মতো পদক্ষেপ যে সদিচ্ছার প্রকাশ, সেই একই সদিচ্ছা এখন তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায়ও দেখানো দরকার।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত