জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা

এম মাসরুর রিয়াজ
এম মাসরুর রিয়াজ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সাম্প্রতিক আঙ্কটাড-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও স্বস্তির খবর। তবে অর্থনীতির গভীরতর বিশ্লেষণে গেলে এই ‘সুখবর’-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভিন্ন চিত্র আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগের এই বৃদ্ধি যতটা না নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

প্রথমেই প্রশ্ন আসে, এই যে ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, এর প্রকৃতি আসলে কেমন? পরিসংখ্যান বলছে, গত চার-পাঁচ বছর ধরে দেশে যে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তার ৫০ শতাংশেরও বেশি হলো বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর ‘পুনর্বিনিয়োগ’ অথবা ‘আন্তঃকোম্পানি ঋণ’। অর্থাৎ, যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই বাংলাদেশে ব্যবসা করছে, তারা তাদের অর্জিত মুনাফার পুরোটা বা একটি অংশ বিদেশে নিজেদের মাতৃপ্রতিষ্ঠানে না পাঠিয়ে দেশেই আবার বিনিয়োগ করছে।

মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করা অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক এবং আমরা একে স্বাগত জানাই। কিন্তু যখন মোট এফডিআই-এর অর্ধেকের বেশি কেবল পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে দেশে নতুন বিনিয়োগ এবং ইকুইটি বিনিয়োগের চরম খরা চলছে।

আমাদের মূল দুর্বলতা হলো—কৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতা। একটা সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলেও, বর্তমানে নীতি-নির্ধারকদের মাঝে এর গুরুত্ব অনুধাবনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সক্ষমতা বৃদ্ধি।

নতুন বিনিয়োগ না আসার অর্থ হলো—আমরা বিদেশি বিনিয়োগের মূল সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এফডিআই-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পুঁজি আসা নয়; বরং এর মাধ্যমে নতুন শিল্পখাতের বিকাশ ঘটে, বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং প্রযুক্তির হস্তান্তর ঘটে। নতুন বিনিয়োগের অভাবে এই সুবিধাগুলো থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অন্যদিকে, আমাদের অর্থনীতির আকার ও সক্ষমতা যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মেলালে বিদেশি বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়। জিডিপির অনুপাতে আমাদের এফডিআই বর্তমানে শূন্য দশমিক ৫ (০.৫%) শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছি না? এর পেছনে প্রধানত চারটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও যথেষ্ট দুর্বল। আইনকানুন ও এর প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল, যা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা নষ্ট করে।

দ্বিতীয়টি হলো- অবকাঠামোগত ঘাটতি। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট এবং বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ—উভয়ই বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব। নতুন ও আধুনিক শিল্পখাতের জন্য যে ধরনের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন, আমাদের শ্রমবাজারে তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। চতুর্থত এবং সর্বশেষ, একটি সঠিক ও সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ কৌশলের অভাব। বিনিয়োগ এমনিতেই আসে না; বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারের সুযোগ, নিজেদের সক্ষমতা ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশল প্রণয়ন করতে হয়। সেই কৌশলের আলোকে পদ্ধতিগত প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা যোজন যোজন পিছিয়ে।

এই সমস্যাগুলো যে নতুন, তা নয়। গত এক-দুই দশক ধরে এগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মূল দুর্বলতা হলো—কৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতা। একটা সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলেও, বর্তমানে নীতি-নির্ধারকদের মাঝে এর গুরুত্ব অনুধাবনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’-এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতা ও তদারকি জোরদার করতে হবে।

জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বা বিনিয়োগ পরিবেশের আমূল পরিবর্তনের জন্য যে ধরনের বহুমুখী সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন, তা এখনও দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক আস্থা হয়তো ফিরেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সত্যিকারের প্রবৃদ্ধি আনতে হলে নীতিগত কথার ফুলঝুরি নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ও নির্বাচিত সরকার গঠিত হওয়ার পর একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগামী দিনগুলোতে একটি সামষ্টিক পলিসি স্ট্যাবিলিটি বজায় থাকবে—বিনিয়োগকারীদের মাঝে এমন একটি আস্থা বা ‘কনফিডেন্স’ তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক। কিন্তু কেবল আস্থা দিয়ে তো শিল্পের চাকা ঘুরবে না। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস লাগবে, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। লজিস্টিকস ঠিক না থাকলে ‘স্পিড টু মার্কেট’ এবং ‘কস্ট টু মার্কেট’—দুটোই বাধাগ্রস্ত হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিনিয়োগ আকর্ষণের দৌড়ে বৈশ্বিক বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা চলমান। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বহুমাত্রিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বা বিনিয়োগ পরিবেশের আমূল পরিবর্তনের জন্য যে ধরনের বহুমুখী সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন, তা এখনও দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক আস্থা হয়তো ফিরেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সত্যিকারের প্রবৃদ্ধি আনতে হলে নীতিগত কথার ফুলঝুরি নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। কৌশলগত কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এফডিআই-এর এই সংখ্যার চমক আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল দিতে পারবে না।

  • লেখক: বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত