নারায়ণগঞ্জে পদ্মা রেলওয়ে সংযোগ সেতু

এলাকাবাসীর বাধার পরও চলছিল পিলারের নিচে মাটি কাটা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জের পদ্মা রেলওয়ে সংযোগ সেতুর পিলারের নিচ থেকে কাটা হয়েছে মাটি। স্ট্রিম ছবি
নারায়ণগঞ্জের পদ্মা রেলওয়ে সংযোগ সেতুর পিলারের নিচ থেকে কাটা হয়েছে মাটি। স্ট্রিম ছবি

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা রেলওয়ে সংযোগ সেতুর পিলারের নিচ থেকে প্রায় ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। সেতুর নিরাপত্তা চিন্তা করে জেলার সদর উপজেলার আলীগঞ্জের ওই অংশে মাটি কাটায় একাধিকবার বাধাও দিয়েছিলেন এলাকাবাসী। তারপরও বেশ কয়েকদিন ধরেই ভেকু দিয়ে মাটি কাটা চলছিল বলে জানিয়েছেন তারা। তবে স্থানীয়দের বাধার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পের অংশ হিসেবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি কাটা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন বলছে, মাটি কাটার বিষয়ে আগে তাদের অবগত করা হয়নি। তাই প্রকল্পের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের আগপর্যন্ত মাটি কাটা বন্ধ থাকবে।

প্রশাসনের দাবি, গত ১৩ জুন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিনের নির্দেশে ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান নূর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি কাটার বন্ধ করে দেন। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোম ও মঙ্গলবার পিলারের নিচে মাটি কাটা হয়েছে।

আলীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর ৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলারের আশপাশ ও নিচের বিভিন্ন অংশে প্রায় ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পঞ্চবটি-পোস্তগোলা) পুরোনো সড়কের পাশের জমি ও রেল সংযোগ সেতুর নিচের জমি সমান্তরালে থাকলেও মাটি কেটে নেওয়া অংশগুলো নিচু হয়ে গেছে। এসব জায়গায় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে আছে। সেতুর আশপাশে বেশকিছু নির্মাণসামগ্রী বিক্রির মোকাম ও ইটভাটা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে পদ্মা রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটায় গর্তে জমে আছে পানি। স্ট্রিম ছবি
নারায়ণগঞ্জে পদ্মা রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটায় গর্তে জমে আছে পানি। স্ট্রিম ছবি

একাধিকবার বাধা দেন এলাকাবাসী

স্থানীয় ব্যক্তি, প্রশাসন ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের যুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বছর আগেও এই সংযোগ সেতুর পিলারের মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে ওই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়ে যায়। মাসখানেক আগে মাটি কাটার কাজ পুনরায় শুরু হয়। এ সময়ও স্থানীয়রা বাধা হয়ে দাঁড়ান। পরে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে আবার মাটিকাটা শুরু হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, সেতুর নিচে মাটি কাটা হলে পিলার দুর্বল হয়ে পড়বে। এই কারণে লোকজন বাধা দিয়েছিল। গত ঈদুল আজহার আগে আবার কাজ শুরু করলে এলাকাবাসী পুনরায় বাধা দেয়। তবে ওই সময় ইমরান নামে এলাকার একজনকে আটক করেও নিয়ে যায় রেলপুলিশ। পরে মুচলেকায় তাকে ছাড়া হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বলেন, সেতুটি ঝুঁকিতে পড়বে ভেবে এলাকার লোকজন বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ভালো কাজ করতে গিয়ে তারা ঝামেলায় পড়েছেন। এখন এ নিয়ে কথা বলে আবারও ঝামেলায় পড়তে চান না।

মোসলেহ উদ্দিন সজল নামে আলীগঞ্জের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এত বড় ট্রেন রানিং অবস্থায় এই সেতুর উপর দিয়ে যাবে, পিলারের নিচে মাটি কাটলে তো ঝুঁকি তৈরি হবেই। ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষও জানে। এখন সরকারি লোকজনই এই কাজ করলে তো আমাদের কিছু বলার থাকে না।’

খাদ অবস্থায় ফেরাতে মাটি কাটা

পিলারের নিচের মাটি স্থানীয় ইটভাটায় বিক্রিরও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। মাটি কাটার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতারাও জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু বলেন, এ কাজ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনই করছেন। দলীয় লোকজনের এ কাজে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

এ বিষয়ে রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা ও রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, প্রকল্প এলাকাটিতে নিচু জমি ও জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় নিজ উদ্যোগে মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তিতে বলা আছে, প্রকল্প সাইটটিকে রেস্টোরেশন (আগে যেমন ছিল তেমন) করা হবে। তারই অংশ হিসেবে সেফটি নিশ্চিত করেই মাটি কাটা হচ্ছে।

২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে জানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের প্রকৌশলী শামীম বলেন, ‘কাজটি পেয়েছে চায়না প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা হয়তো মাটি কাটার কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জে পিলারের নিচে মাটি কাটায় পদ্মা রেল সেতুতে ঝুঁকির শঙ্কা। স্ট্রিম ছবি
নারায়ণগঞ্জে পিলারের নিচে মাটি কাটায় পদ্মা রেল সেতুতে ঝুঁকির শঙ্কা। স্ট্রিম ছবি

কাজ বন্ধ করেছে প্রশাসন

জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্পের কাজ করার সময় স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করাটাই নিয়ম, কিন্তু এক্ষেত্রে তা তারা করেননি। রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটার বিষয়টি নজরে আসার পরই ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে সেখানে পাঠানো হয়। আমরা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রোপার কাগজপত্র চেয়েছি। তার আগ পর্যন্ত আপাতত কাজটি বন্ধ রয়েছে।’

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে আবারও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান। এ সময় ইউএনও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি দেখেই এসিল্যান্ডকে পাঠিয়ে কাজটি বন্ধ দিই। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছু কাগজপত্র দেখান। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি, শীঘ্রই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’

সংরক্ষিত স্থানে হবে বৃক্ষরোপণ

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘মাটি খুঁড়ে নেওয়া হয়েছে, বিষয়টা এ রকম না। ওখানে যখন ব্রিজ হয়েছে, কিছু প্রতিবন্ধকতা কিন্তু রাখা হয়, ছোট ছোট ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনে মাটি সরানো হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা কনস্ট্রাকশনের অংশ হিসেবে থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন সরানো হয়নি। ওটা দিয়ে একটু উঁচু হওয়ায় ওখান থেকে আবার মই দিয়ে কিছু কিছু জিনিস চুরি হয়েছে বা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় ওটা সরানো হয়েছিল। অতিরিক্ত মাটি ছিল, অবস্ট্যাকল তৈরি করার জন্য, কনস্ট্রাকশন কাজের সহায়ক হিসেবে।’ সেখানে গাছ লাগানোরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

পরে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাটিকাটার স্থানটি রেলওয়ের অধিগ্রহণ করা জমি। প্রকল্পের আওতায় ভায়াডাক্ট নির্মাণের সময় একটি অস্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় সেই মাটি অপসারণ করে স্থানটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি বা হবে না। তবে সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ওই স্থান থেকে মাটি অপসারণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে বৃক্ষরোপণ করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত