কক্সবাজারে ঘুরছে সম্ভাবনার চাকা, বাতাস থেকে মিলছে বিদ্যুৎ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

কক্সবাজারে স্থাপন করা টারবাইন। সংগৃহীত ছবি
কক্সবাজারে স্থাপন করা টারবাইন। সংগৃহীত ছবি

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে পড়ছে, তখন কক্সবাজারের উপকূলে নীরবে ঘুরছে এক ভিন্ন সম্ভাবনার চাকা। বাতাসকে শক্তিতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে খুরুশকুল-চৌফলদণ্ডীর বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইতোমধ্যে এটি এলাকায় প্রযুক্তি ও পর্যটনের এক নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ৮ মার্চ যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে। মোট স্থাপিত ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। অর্থায়নে যুক্ত ছিল চীনের এসপিআইসি ওয়েইলিং পাওয়ার করপোরেশন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে কেন্দ্রটি। গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে, যা স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ।

কক্সবাজারে ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে
কক্সবাজারে ২২টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে

বিপিডিবির ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার সেলের উপপরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ফরিদি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এই উৎপাদন হার ‘উৎসাহব্যঞ্জক’। তুলনায় সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পেও সাধারণত ২০ শতাংশের মতো উৎপাদন হয়ে থাকে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রকল্পটির বিনিয়োগ প্রায় ১২ কোটি ডলার। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ সেন্ট দরে কিনছে। সেই হিসেবে দুই বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগতে পারে প্রায় এক দশক, যদিও টারবাইনগুলোর আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী মুকিত আলম খান জানান, শুরুতে ২৩ শতাংশ উৎপাদনের আশা করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাতাসের গতি কিছুটা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও প্রত্যাশার নিচে। যদিও তিনি মনে করেন, এটি সাময়িক প্রাকৃতিক পরিবর্তনজনিত সমস্যা; পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ টারবাইন সচল। তবে মৌসুমি বৈচিত্র্য স্পষ্ট। শীতে বাতাস কম থাকায় উৎপাদন কমে যায়, আর গ্রীষ্মে তা বাড়ে।

টারবাইনগুলো থেকে গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে
টারবাইনগুলো থেকে গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে

প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন জানান, প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার বাতাসের গতিতে উৎপাদন শুরু হয়, আর ৯ মিটারে পূর্ণ সক্ষমতা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘সৌর বিদ্যুৎ সূর্যাস্তের সঙ্গে থেমে যায়, কিন্তু বায়ু বিদ্যুৎ বাতাস থাকলে যেকোনো সময় উৎপাদন করতে পারে—বিশেষ করে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। যতক্ষণ বাতাস বয়ে চলে, ততক্ষণ উৎপাদন অব্যাহত থাকে।’

ভূমি ব্যবহারের দিক থেকেও বায়ু বিদ্যুৎ এগিয়ে। যেখানে এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের জন্য লাগে প্রায় তিন একর জমি, সেখানে ৩ মেগাওয়াটের একটি বায়ু টারবাইনের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ২০ শতাংশ জমি।

তবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বজ্রপাত। প্রায় ৯০ মিটার উঁচু টাওয়ারগুলোতে বিশেষ বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে বর্ষাকালে বজ্রপাত এড়ানো যায়।

স্থানীয়দের কাছে এই প্রকল্প একদিকে আকর্ষণীয়, অন্যদিকে কিছুটা হতাশারও কারণ। কুরুশখুলের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘টারবাইনগুলো দেখতে মানুষ আসে, ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের পাশেই কেন্দ্র, তবুও লোডশেডিং থেকে মুক্তি পাই না।’

উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বায়ু বিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বায়ু বিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে

বিপিডিবির কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি জানান, উৎপাদন পুরোপুরি বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, ২১ এপ্রিল অনুকূল বাতাসে ৫ লাখ ৫৫ হাজার কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও ২৪ এপ্রিল তা নেমে আসে মাত্র ৩৫ হাজার কিলোওয়াট-ঘণ্টায়।

এদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য রয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বায়ু বিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বায়ু প্রবাহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী, যা ভবিষ্যতে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আব্দুল শুক্কুর বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে এখন সংকট চলছে। তারমধ্যে আশার খবর হলো কক্সবাজারের এই বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি এখন শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এক বাস্তব চিত্র। ভবিষ্যতে এধরনের প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত