
বছরজুড়ে সংস্কারের পরও সাতক্ষীরার ৬৮৩ কিলোমিটারের বেড়িবাঁধ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। নদীর জোয়ার-ভাটা, প্রবল স্রোত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধটির কোথাও ধস, ফাটল ও ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সরকারি অর্থে জরুরি মেরামত ও সংস্কার করা হলেও বাঁধ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। নিম্নমানের নির্মাণকাজ, মাটি ও জিওব্যাগ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং যথাযথ তদারকির অভাবে একই স্থানে বারবার ভাঙন দেখা দেয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা বিভাগ-১-এর অধীনে ৩৮৩ কিলোমিটার এবং বিভাগ-২-এর অধীন ৩০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, মাদার, চুনা, গলগেসিয়া, বেতনা, মরিচ্চাপ, কালিন্দী ও ইছামতী নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তৃত এসব বাঁধ উপকূলের মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্যঘের ও যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবছর বর্ষা, পূর্ণিমা-অমাবস্যার জোয়ার, নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হয়, কোথাও নেওয়া হয় বড় ধরনের সংস্কার প্রকল্প। কিন্তু মাস বা বছরের না পেরোতেই আবার ভাঙন শুরু হয়।
উপকূলের মানুষের আশঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোর কোনোটি ভেঙে গেলে মুহূর্তেই লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়তে পারে লোকালয়ে। এতে কৃষিজমি, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় নেমে আসতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের চাকলা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য গোলাম রসুল বলেন, বেড়িবাঁধের টেকসই সংস্কারের জন্য মাটি ভালোভাবে ভরাট ও সংরক্ষণ, সঠিক ঢাল তৈরি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জিওব্যাগসহ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। এসব ঠিকমতো না হলে জোয়ার-ভাটার চাপে বাঁধ দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। তখন সংস্কারের পরও একই জায়গায় আবার ভাঙন দেখা দেয়।
সুন্দরবন উপকূলীয় শ্যামনগরের নওয়াবেকি গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙার খবর মানেই আমাদের জন্য আতঙ্ক। সরকারি টাকা খরচ করে মেরামত করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার একই জায়গায় ভাঙন দেখা দেয়। বারবার সংস্কার না করে একবার ভালোভাবে কাজ করা দরকার।
আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের আব্দুল হাকিম মোড়ল বলেন, আমাদের কাছে বেড়িবাঁধ শুধু মাটির একটি বাঁধ নয়; এটি ঘরবাড়ি, জমি, মাছের ঘের ও জীবিকার নিরাপত্তা। বাঁধে সামান্য ফাটল বা ধস দেখা দিলেই মানুষ রাত জেগে পাহারা দেয়। বিশেষ করে ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন বলেন, শুধু ভাঙনের পর সংস্কার নয়, বাঁধের স্থায়িত্ব বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নির্মাণকাজে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে বারবার সংস্কার করেও উপকূলবাসীর ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের বিভাগের আওতায় প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশের ১০ থেকে ১৫টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইতোমধ্যে সংস্কারকাজ চলছে। পাশাপাশি অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের প্রায় ১৫ কিলোমিটার তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ৫ কিলোমিটার অংশে সংস্কারকাজ চলছে।
.png)






