জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

৬৬ সংস্থা ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র: ‘আন্তর্জাতিক সংহতি এবং উন্নয়নের ইকোসিস্টেম ধসে পড়বে’ বলছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারে ট্রাম্পের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘভুক্ত ও এর বাইরের ৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক ‘উন্নয়নের ইকোসিস্টেম’ ধসে পড়ার বড় অশনিসংকেত হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এই সরে যাওয়া কেবল আন্তর্জাতিক সলিডারিটিকেই (সংহতি) নষ্ট করবে না, বরং সুদূরপ্রসারী সংকটে ফেলবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর এনজিও খাত ও তৃণমূলের সেবা কার্যক্রমকে।

গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওয়েবসাইট ‘দ্য হোয়াইট হাউজ’-এ প্রকাশিত এক মেমোরেন্ডামে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, কনভেনশন ও চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশে জাতিসংঘভুক্ত ৩১টি এবং জাতিসংঘভুক্ত নয় এমন ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘এটির প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা এই সংস্থাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক সলিডারিটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে পুরো ইন্টারন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ ও বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ‘পপুলিস্ট’ এবং ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী’ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি গ্লোবাল সুপার পাওয়ার। তাদের এই সরে যাওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দুর্বল করে দেবে। এটি এমন এক সরকারের সিদ্ধান্ত যারা পপুলিস্ট এবং আমেরিকান শোভিনিজমে বিশ্বাসী।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর প্রভাব শুধু ওই সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক সংহতি এবং সহযোগিতার যে মূল্যবোধ, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যে মডেল দাঁড়িয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত তা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশ্ব শান্তির জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক সতর্ক করে বলেন, বিশ্বজুড়ে এখন অন্তর্মুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি অন্য ধনী দেশগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি অন্যান্য ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলো ফলো করবে। যেমন যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বেশ কিছু দেশ যদি একই চর্চাতে অবতীর্ণ হয়, তবে আমি মোটেই অবাক হব না।’

এর আগে বাংলাদেশে ইউএসএআইডি-এর বাজেট কমানোর ফলে এনজিও খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে এবারের ক্ষতি ‘শতগুণ বেশি’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘ইউএসএআইডি যখন ফান্ড কমিয়েছিল, তখন সেটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তারা জাতিসংঘের মূল সংস্থাগুলো (যেমন—ইউএনএফপিএ, ইউএন ওমেন) এবং বৈশ্বিক জোটগুলো থেকে সরে যাচ্ছে। যে সংস্থাগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করছে, সেগুলোর বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংহতি এবং উন্নয়নের যে ইকোসিস্টেম, তা ধসে পড়বে।’

বেকারত্ব তৃণমূলের মানুষের দুর্ভোগ
হোয়াইট হাউসের মেমোরেন্ডাম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইউএন পপুলেশন ফান্ড’ (ইউএনএফপিএ), ‘ইউএন ওমেন’ ও ‘ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (ইউএনএফসিসিসি)-এর মতো সংস্থাগুলো থেকে অর্থায়ন বন্ধ করছে। বাংলাদেশে এসব সংস্থার কার্যক্রম মূলত স্থানীয় এনজিওদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশে ব্যাপক বেকারত্বের আশঙ্কা করছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এই ফান্ড বন্ধ হওয়ার ফলে বাংলাদেশে এনজিও খাতে যুক্ত বিশাল সংখ্যক মানুষ বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়বেন। তবে এর চেয়েও বড় ভুক্তভোগী হবে গ্রামের হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। তারা মূলত এসব এনজিওর সেবার ওপর নির্ভরশীল।’

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, লবণাক্ততা মোকাবিলা এবং বনায়নে এনজিওদের ভূমিকা অপরিসীম। ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি) এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ থেকেও সরে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই মেমোরেন্ডামে ‘ইউএন ডেমোক্রেসি ফান্ড’ এবং ‘পিসবিল্ডিং ফান্ড’ থেকেও সরে আসার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে সুশাসন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ এবং আইনি সহায়তা প্রদানকারী এনজিওগুলো এতদিন এই ফান্ডের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে বিশ্ব এখন ‘আল্ট্রা-ন্যাশনালিজম’-এর ফ্রেমওয়ার্কে বন্দি হতে যাচ্ছে। এটি টেকসই উন্নয়ন এবং বিশ্ব শান্তির জন্য এক বড় হুমকি।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত