leadT1ad

জাবি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ, ‘মেধাবৃত্তির’ নামে প্রতারণা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সাজিয়া আফরিন। সম্প্রতি অচেনা একটি নম্বর থেকে ফোন আসে তাঁর বাবার মোবাইলে। কলকারী নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলছে দাবি করে সাজিয়ার নাম, বিভাগ, বর্ষ—সব তথ্য জানায়। এরপর জানানো হয়, তাঁর মেধাবৃত্তির টাকা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমাধানের জন্য প্রয়োজন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও ওটিপি। সন্তানের সঠিক তথ্য জানার কারণে সন্দেহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওটিপি দেন সাজিয়ার বাবা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একাধিক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র ‘মেধাবৃত্তি’র নামে অর্থ আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকেই এসব সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়েছে। তবে প্রশাসন ও ব্যাংক; দুই পক্ষই দায় অস্বীকার করছে।

যেভাবে প্রতারণার ফাঁদ

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারক চক্র শিক্ষার্থীদের নাম, বিভাগ, বর্ষ, বাবা-মায়ের নাম এবং ব্যাংক-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্য জানিয়ে তারা শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ফোন করে জানায়, বৃত্তির টাকা অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু ফর্মে উল্লেখ করা অগ্রণী ব্যাংকের হিসাবে টাকা জমা দেওয়া যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট বা এটিএম কার্ডের তথ্য চাওয়া হয়। একপর্যায়ে ওটিপিও দাবি করা হয়। কেউ কেউ বিষয়টি বুঝতে পেরে ফোন কেটে দেন এবং নম্বর ব্লক করেন। তবে অনেক অভিভাবক সন্তানের নির্ভুল তথ্য জানানোয় বিভ্রান্ত হয়ে প্রতারণার শিকার হন।

‘সব তথ্যই জানে তারা’

ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) এর ৪৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মাহতাব জাবীন অন্ত স্ট্রিমকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে একটি নম্বর থেকে আমার বাবার ফোনে কল আসে। বলা হয়, ২০১৭–১৮ সেশনের অনার্সের ফলাফলের ভিত্তিতে ইউজিসির যে স্কলারশিপ পাওয়ার কথা, সেই টাকা নাকি ফর্মে উল্লেখ করা অগ্রণী ব্যাংকে যাবে না। প্রাইম ব্যাংক অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের এটিএম কার্ড থাকলে সেটিতে যাবে। এ সময় আমার নাম, বাবা–মায়ের নাম, বিদ্যালয়ের নাম ও অ্যাকাউন্ট নম্বর চাওয়া হয়। পরে ট্রু–কলার অ্যাপে তাদের নাম দেখে বুঝতে পারি, এটি প্রতারণা।’

মাহতাব জাবীনের দাবি, প্রতারকরা তাঁর বাবা-মায়ের নাম ও অগ্রণী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বরসহ সব ব্যক্তিগত তথ্য জানত। তাঁর আশঙ্কা, এসব তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে তাঁকে ব্ল্যাকমেইলও করা হতে পারে।

টাকা খোয়ার ঘটনা

একই কৌশলে চারুকলা বিভাগের ৪৮তম আবর্তনের শিক্ষার্থী আকিবা মোস্তফার অভিভাবকের কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে প্রতারক চক্র। আকিবা স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার বাবার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। কলকারী নিজেকে জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক পরিচয় দেয়। সে বলে, আমার স্কলারশিপের টাকা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকছে না, তাই বাবার অ্যাকাউন্ট নম্বর দিতে। বিষয়টি না বুঝে আমার বাবা–মা তথ্য দিলে ৩৬ হাজার টাকা নিয়ে নেয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রতারকরা আমার ক্যাম্পাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ যাবতীয় তথ্য জানত। এসব তথ্য কীভাবে তাদের কাছে গেল, যদি না ক্যাম্পাস থেকে লিক হয়ে থাকে?’

সাজিয়া আফরিনের বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া ১০ হাজার টাকার ঘটনাও একই কৌশলে ঘটেছে। সাজিয়া বলেন, ‘লোকটি নিজেকে জাবি থেকে বলছে দাবি করে আমার সব ডিটেইলস জানায়। নাম–পরিচয় জানার কারণে বাবা বিশ্বাস করেন।’

কারা টার্গেটে

এ ধরনের ফোনকল আরও অনেক শিক্ষার্থী পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে অন্তত দুজনের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ ৪৭, ৪৮ ও ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতে প্রতারণামূলক ফোনকল নিয়ে অভিযোগ করেছেন মূলত ৪৭ ও ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।

যাঁরা ফোন পেয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই সম্পূরক বৃত্তির জন্য মনোনীত ছিলেন বা আগে বৃত্তি পেয়েছেন। ইউজিসির মেধাবৃত্তির জন্য মনোনীত শিক্ষার্থীও রয়েছেন।

মাহতাব জাবীন অন্ত বলেন, ‘আমি ইউজিসি থেকে বৃত্তি পাব। আমাদের (৪৭তম আবর্তন) বৃত্তির ফর্ম যাচাই–বাছাই শেষে ইউজিসিতে পাঠানো হবে। আমার ধারণা, এসব তথ্য রেজিস্ট্রার ভবন থেকেই লিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’

অন্যদিকে আকিবা মোস্তফা বলেন, ‘আমি পাঁচ–ছয় মাস আগে একটি বৃত্তি পেয়েছিলাম। সেই টাকা তুলে নিয়েছি। আমার কোনো বৃত্তির টাকা বাকি নেই।’

তথ্যের উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উচ্চ শিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকে এমন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কারা বৃত্তি পেয়েছে, সেই তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকেই প্রতারকরা তথ্য পেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েবসাইটে শুধু বৃত্তিপ্রাপ্তদের নাম থাকে। বাবা–মায়ের নাম বা ব্যাংক তথ্য সেখানে নেই। এসব তথ্য ভর্তি–সংক্রান্ত কাগজে শিক্ষা শাখায় জমা দেওয়া হয়।’

ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে তথ্য লিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যে ফর্ম পূরণ করা হয়, সেখানে বাবা–মায়ের নাম, নমিনি ও ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থাকে। সেখান থেকেই তথ্য বের হতে পারে।’

জাবির ভর্তি, পরীক্ষা ও বৃত্তিসংক্রান্ত সব আর্থিক লেনদেন অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। ব্যাংকের সার্ভারে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং–সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।

তবে অগ্রণী ব্যাংকের শাখা প্রধান ও সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য থাকে না। বৃত্তির টাকা প্রশাসন থেকে আমাদের ব্যাংকে আসে। আমাদের সার্ভার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদি এখান থেকে তথ্য লিক হতো, তাহলে সবার টাকাই চুরি হতো।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুর রব বলেন, ‘তথ্য ফাঁস ও প্রতারণামূলক কলের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা উদ্বিগ্ন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত সেনসিটিভ ইস্যু। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা স্টেপ নেব। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত