চট্টগ্রামে এখনো প্লাবিত ১১ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা, ঢলে বাড়ছে পানি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

ভারী বৃষ্টিতে জলামগ্ন চট্টগ্রাম শহর। স্ট্রিম ছবি
ভারী বৃষ্টিতে জলামগ্ন চট্টগ্রাম শহর। স্ট্রিম ছবি

চট্টগ্রামে বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এক সপ্তাহ ধরে জেলার ১১ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত রয়েছে। এরই মধ্যে সীমান্তের ওপারে উজান থেকে আসা ঢলে পানি বাড়ছে এ সব এলাকায়। এতে শুকনো খাবার, সুপেয় পানির অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে পানিবন্দি মানুষ। পাহাড়ধসে কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কেও যান চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, বন্যায় মহানগরীসহ জেলার ১৬ উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ। এক সপ্তাহে শুধু চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ও বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩০ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। বৃষ্টির তীব্রতা কমে এলেও পানি বাড়ছে প্লাবিত এলাকাগুলোতে। উজানে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড় থেকে ঢল নামতে শুরু করায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

জেলায় বন্যাদুর্গত উপজেলার মধ্যে আছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, রাউজান, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, হাটহাজারি, আনোয়ারা, কর্ণফুলি ও পটিয়া। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় ফোনে নেটওয়ার্ক সিস্টেমও ভেঙে পড়েছে। পাহাড়ধস ও ভাঙনে সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উদ্ধারকারী দল, ত্রাণ বিতরণ টিমও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম জানান, বন্যায় জেলার ১৭৬ ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি আছে। বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড় ধসে মহানগর ও জেলায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়ার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলার ১৭ ইউনিয়নের সবকটিই প্লাবিত রয়েছে। সাতকানিয়া পৌরসভা, কোনো ইউনিয়নের পুরোটা আবার কোনোটি আংশিক পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। উপজেলার সাঙ্গু নদীর পানি গতকাল শনিবারও বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এদিকে বাঁশখালীর উপকূলীয় অন্তত আটটি ইউনিয়নের মানুষ এখনো পানিবন্দি। বিশেষ করে ছনুয়া, বরগুনা, গন্ডামারা, সরল, পুঁইছড়ি, শেখেরখিল, বৈলছড়ি, বাহারছড়া, কাথরিয়া ও আলীপুর ইউনিয়নে মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন। এলাকাগুলো নিচু হওয়ায় সেখানে পাঁচ দিনেও বন্যার পানি কমেনি। উজানের ঢলের পানিতে বন্যা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। এরই মধ্যে ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রের সবকটি মানুষে ভরে গেছে। সেখানে শুকনো খাবার ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে।

পুঁইছড়ির কামাল হোসেন জানান, এর আগে কখনো এমন বন্যা দেখেনি তারা। এবারের ঢলের পানি আসায় পুরো উপজেলা ভেসে গেছে। ফসল, গবাদি পশু, মাছের ঘের, লবণের ঘের— সবই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বন্যার পানি। খাবার ও পানির কষ্টে কয়েক দিন ধরে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বৈলছড়ির বাসিন্দা কায়কোবাদ জানান, তার চোখের সামনেই একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতঘরটি ভেসে গেছে। এখন তিনি পরিবারসহ আরেকজনের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।

এছাড়া ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী উপজেলায়ও এখন পানিবন্দি রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। একইভাবে লোহাগাড়া উপজেলা সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে।

প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় ১১ জন মারা গেছে। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিন এবং সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও সাতকানিয়ায় একজন করে মারা গেছে।

এদিকে দুই প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বয়ের কাজ করছেন। দুর্গম এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে সাত উপজেলায় কাজ করছে সেনাবাহিনীর একাধিক দল, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, এবারের বন্যায় আউশ চাষ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর জমির আউশ, ৯৬০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ৫৯০৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, এবারের বন্যায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেলার সব সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশন মেয়র, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পরে তিনি বলেন, আশা করছি, দুর্গম এলাকাগুলোতে শুরুতে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হলেও সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন সব এলাকায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে গেছে।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় চিংড়ি ঘের করার জন্য একশ্রেণির প্রভাবশালী মানুষ স্লুইসগেট বন্ধ করে রেখেছিল। সেগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর পানি আগের চেয়ে দ্রুত নামছে। বৃষ্টিপাত কমে এলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও জানান তিনি।

ফটিকছড়ির বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন বলেন, দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক চট্টগ্রামের পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন। সিদ্ধান্তহীনতার কারণে যাতে করে কোনো কাজ আটকে না থাকে, সেই বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত