জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আর্থিক দাবি থেকে খামেনির পতনের ডাক: পাল্টে গেছে ইরানের বিক্ষোভের ভাষা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

আন্দোলন চলাকালীন একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের রাজধানী তেহরানে শপিংমলে দোকানের শাটার নামানোর মধ্য দিয়ে যে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা আর নিছক অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে সেই আন্দোলনের ভাষা ও স্লোগান নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। সেসব স্লোগানে এখন রাজপথে কেবল দ্রব্যমূল্য বা বাণিজ্য সংক্রান্ত কথা নয়, বরং ধ্বনিত হচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন। আর ফুটে উঠছে রাজতন্ত্র বা পাহলভি পরিবারকে ফিরিয়ে আনার স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ইরান ইন্টারন্যাশনাল-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমটি বিক্ষোভের প্রথম ১০ দিনের ৪৬৩টি ভিডিও ক্লিপ পর্যালোচনা করেছে। দেশের ৯১টি শহর, নগর ও গ্রাম থেকে ধারণ করা এসব ভিডিওতে ৬৪১ বার স্লোগান দেওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সেখান থেকে ৯৩টি ভিন্ন ভিন্ন স্লোগান শনাক্ত করা হয়েছে, যা ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের দুটি শপিং সেন্টারে যখন নিরাপত্তা বাহিনী প্রবেশ করে, তখন ব্যবসায়ীরা শাটার নামিয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন—‘ভয় পাবেন না, আমরা সবাই সাথে আছি’। তখন দাবি ছিল মূলত পারস্পরিক সুরক্ষা ও ধর্মঘটের। প্রথম দিনে ‘পেজেশকিয়ান, লজ্জা করো’ বা ‘প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ো’—এমন স্লোগানই বেশি শোনা গিয়েছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকেই সুর পাল্টে যায়। বাজারের অলিগলিতে তখন ‘দোকান বন্ধ করো’ স্লোগানের পাশাপাশি শোনা যেতে থাকে সরাসরি সরকারবিরোধী ধ্বনি। তেহরানে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘যতদিন মোল্লারা কবরে না যাবে, ততদিন এই দেশ স্বাধীন হবে না’। এমনকি ‘কামানের গোলা বা আতশবাজি, মোল্লাদের বিদায় নিতেই হবে’—এমন স্লোগানে বাণিজ্যিক ক্ষোভ রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নেয়।

ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ১০ দিনে একটি স্লোগান বারবার ফিরে এসেছে—‘এটাই শেষ যুদ্ধ, পাহলভি ফিরে আসবে’। বিক্ষোভকারীদের মুখে এই স্লোগান প্রমাণ করে, তারা কেবল বর্তমান শাসনের অবসানই চান না, বরং বিকল্প হিসেবে রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই স্লোগানের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। যদিও আল্লামা তাবাতাবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কিছু জায়গায় শিক্ষার্থীরা ‘পাহলভিও নয়, সর্বোচ্চ নেতাও নয়; চাই স্বাধীনতা ও সাম্য’ বলে স্লোগান দিয়েছেন। আবার কোথাও ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের স্লোগানও ফিরে এসেছে।

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে নিহতদের জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানগুলোও প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। কুহদাশত ও ফুলাদশাহর এলাকায় নিহত বিক্ষোভকারীদের দাফনের সময় ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু চাই’ এবং ‘খামেনির মৃত্যু চাই’ স্লোগান উঠেছে।

মারভদাশতে নিহত খোদাদাদ শিরভানির দাফনে ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোন’ স্লোগান দেওয়া হয়। শিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে পারস্যের পৌরাণিক অত্যাচারী রাজা ‘জাহাক’-এর সঙ্গে তুলনা করে স্লোগান দেন।

বিক্ষোভের নবম ও দশম দিনে স্লোগানে পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আটটি শহর ও গ্রামের ফুটেজে ‘গাজা নয়, লেবানন নয়; আমার জীবন ইরানের জন্য’—এই স্লোগানটি জোরালোভাবে শোনা যায়। হামাদান প্রদেশের চিনার-শেখ গ্রামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইলন মাস্কের করা মন্তব্যের আদলে ‘খামেনি খুনি’ স্লোগানও দেওয়া হয়।

১০ দিনের এই বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার, ইরানের জনগণ এখন আর কেবল প্রতিবাদ করছে না, তারা একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প ব্যবস্থার নাম উচ্চারণ করছে। ভিডিও ফুটেজগুলো প্রমাণ করে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিহীন এক নতুন ইরানের খসড়া এখন রাজপথেই লেখা হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত