তালেবান শাসনের ৫ বছর, মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ২৪ লাখ মেয়ে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কাবুলে একটি বেকারির সামনে রুটির অপেক্ষায় নারীদের ভিড়ে বসে এক কিশোরী। ছবি: সিএনএন

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছরে বদলে গেছে মেয়েদের জীবন। শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, চলাফেরাসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে। ইউনেস্কোর হিসাবে, বর্তমানে দেশটির প্রায় ২৪ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে। খবর সিএনএনের।

প্রায় দুই দশক পর ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। এর আগে প্রায় ২০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে লড়াই করে তারা। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই মেয়েদের ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করে তালেবান। এর আওতায় ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের পড়াশোনাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে মেয়েদের একটি পুরো প্রজন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে না গিয়ে কৈশোর পার করছে।

এ ছাড়া নারীদের বেশির ভাগ চাকরিতে নিষেধাজ্ঞা, জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।

নারীদের ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গত মার্চে তালেবান একটি ডিক্রি জারি করে। এতে হাড় না ভাঙা বা দৃশ্যমান ও স্থায়ী ক্ষত না করার শর্তে পুরুষদের স্ত্রীদের মারধরের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ইউএন উইমেনের তথ্যানুযায়ী, আফগান নারীদের প্রায় অর্ধেকই মাসে মাত্র এক থেকে দুবার বাড়ির বাইরে যান। দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংকট আরও তীব্র করে তুলছে।

নারীদের ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গত মার্চে তালেবান একটি ডিক্রি জারি করে। এতে হাড় না ভাঙা বা দৃশ্যমান ও স্থায়ী ক্ষত না করার শর্তে পুরুষদের স্ত্রীদের মারধরের সুযোগ রাখা হয়েছে।

আরেক ডিক্রিতে নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ কঠিন করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর নির্ধারণের বিধান বাতিল করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের শিশু অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ডিক্রি শিশুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটিতে শিশুবিবাহের প্রবণতা বেড়েছে।

আফগানিস্তানকে নারীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির পুনর্গঠনবিষয়ক সাবেক বিশেষ মহাপরিদর্শক জন সোপকো। তিনি বলেন, ‘সোজা কথায়- আফগানিস্তান একজন নারীর বসবাসের জন্য নরকের মতো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু করছে না। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনকেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। বরং তারা আরও বড় সংকট তৈরি করছে।’

নারীর হেঁটে যাওয়ার সময় সড়কে তালেবান যোদ্ধারা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাদাকাসান রাজ্যের বাহারাক শহরে। ছবি: এএফপি
নারীর হেঁটে যাওয়ার সময় সড়কে তালেবান যোদ্ধারা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাদাকাসান রাজ্যের বাহারাক শহরে। ছবি: এএফপি

জন সোপকো জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে আফগানিস্তানে ইউএসএআইডির প্রায় সব মানবিক ও উন্নয়নমূলক চুক্তি বাতিল করা হয়। এর ফলে এক দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়।

সোজা কথায়- আফগানিস্তান নারীর বসবাসের জন্য নরকের মতো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু করছে না। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনকেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। জন সোপকো, আফগান পুনর্গঠনবিষয়ক সাবেক বিশেষ মহাপরিদর্শক

২০২২ সালের পর দেশটির মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। ইউএন উইমেনের হিসাবে, আফগানিস্তানের ১ কোটি ৭ লাখের বেশি নারী ও মেয়ে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে অর্থের অভাবে আগামী এক বছরের মধ্যে সংস্থাটির সব কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যেতে পারে।

এই সংকটের প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। চলতি সপ্তাহে সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রতি ১০ শিশুর একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। চলতি বছর দেশটির ১ কোটি ১০ লাখের বেশি শিশুর মানবিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পথে। ইতোমধ্যে ৬০০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। উত্তর আফগানিস্তানের একটি দুর্গম জেলায় ১০ হাজার শিশুকে একাই সেবা দিচ্ছে সেভ দ্য চিলড্রেন।

২০২১ সালের আগে আফগানিস্তানের সরকারি ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসত বিদেশি সহায়তা থেকে। সেই সহায়তা ফেরানোর বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করছেন তালেবান নেতারা। তবে পশ্চিমাদের বিভিন্ন আর্থিক চাপের পরও নারী অধিকার ও নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়ে তালেবানের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

তালেবান শাসনের ৫ বছর, মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ২৪ লাখ মেয়ে