‘ফ্রি ডেলিভারি’ কতটা ফ্রি, নাকি ‘গোল গ্রেডিয়েন্ট ইফেক্টে’র কবলে আপনিও
আপনি হয় ডেলিভারি চার্জ পে করবেন, অথবা আরও কিছু টাকা খরচ করে অন্য একটি পণ্য কিনবেন যাতে শিপিং ফি না লাগে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। তাঁরা ভাবেন, শিপিং ফি বাবদ টাকা ‘নষ্ট’ করার চেয়ে আরও কিছু কেনা ভালো।

অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা শার্ট পছন্দ হলো। দাম ১২০০ টাকা। কার্টে নিলেন, কিন্তু চেক-আউটে গিয়ে দেখলেন ডেলিভারি চার্জ আরও ২০০ টাকা। মেজাজটা খারাপ হয়ে যায় না? অথচ এই একই শার্টের দাম যদি ১৪০০ টাকা হতো আর পাশে লেখা থাকতো ‘ডেলিভারি চার্জ ফ্রি’, আপনি হয়ত এক সেকেন্ডও না ভেবেই সেটা কিনে ফেলতেন।
এই যে মাঝখানের মনস্তাত্ত্বিক খেলা, এটাই আসলে বিশ্বব্যাপী বড় বড় অনলাইন শপিং সাইটের আসল চাল। কোভিডের পর থেকে আমাদের অনলাইনে কেনাকাটার অভ্যাস যেমন বেড়েছে, তেমনি সবকিছুর ওপর ‘ফ্রি শিপিং’ পাওয়ার প্রত্যাশাও বেড়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে খরচ তো হবেই, সেটা কখনোই ‘ফ্রি’ নয়। বিক্রেতারা কেবল মার্কেটিংয়ের কিছু কৌশল আর আমাদের মনের ওপর প্রভাব ফেলে এই খরচটা আড়াল করে রাখেন।
‘শূন্য’ বা ফ্রি-এর মনস্তাত্ত্বিক জাদু
অর্থনীতিতে ‘শূন্য’ বা ‘ফ্রি’ শব্দটির ক্ষমতা অপরিসীম। এটা আমাদের মস্তিস্কের ভেতর বিশেষ এক ‘মনস্তাত্ত্বিক সুইচ’ অন করে দেয়। যখন কোনো লেনদেনে টাকা খরচ হয়, আমরা স্বাভাবিকভাবেই তার ভালো-মন্দ বা লাভ-ক্ষতির হিসেব করি।
কিন্তু যখনই কিছু ‘পুরোপুরি ফ্রি’ পাওয়া যায়, তখন আমাদের মনে এক ধরনের ইতিবাচক আবেগ কাজ করে। আমরা তখন অংকের হিসেব ভুলে সেই অফারটাকে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান মনে করি।
অনলাইন বিক্রেতারা খুব ভালো করেই জানেন, কোনো ক্রেতাকে কেনাকাটা করতে রাজি করানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এই ‘ফ্রি শিপিং’। এটি মূলত ক্রেতাকে মাঝপথে কেনাকাটা ছেড়ে দেওয়া বা ‘কার্ট অ্যাবানডনমেন্ট’ থেকে বিরত রাখে। ফ্রি’র এই মায়াজালে পড়ে আমরা অনেক সময় পণ্যের গুণগত মান বা আসল দামের চেয়ে ডেলিভারি চার্জ বাচানোকেই বড় জয় মনে করি।
অতিরিক্ত কেনাকাটার ফাঁদ ও লুকিয়ে থাকা খরচ
বিক্রেতাদের সবচেয়ে সাধারণ কৌশল হলো ‘ফ্রি শিপিং থ্রেশহোল্ড’ বা নির্দিষ্ট অংকের কেনাকাটা করার শর্ত। যেমন ‘৩০০০ টাকায় কেনাকাটা করলে ডেলিভারি চার্জ ফ্রি’। আপনার কার্টে যদি ২২০০-২৫০০ টাকার পণ্য থাকে, তবে আপনি এক কঠিন দোলাচলে পড়েন।
আপনি হয় ডেলিভারি চার্জ পে করবেন, অথবা আরও কিছু টাকা খরচ করে অন্য একটি পণ্য কিনবেন যাতে শিপিং ফি না লাগে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। তাঁরা ভাবেন, শিপিং ফি বাবদ টাকা ‘নষ্ট’ করার চেয়ে আরও কিছু কেনা ভালো।

এই কৌশলে বিক্রেতারা ‘গোল গ্রেডিয়েন্ট ইফেক্ট’ ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, আমরা লক্ষ্যের যত কাছাকাছি পৌঁছাই, সেটি পূরণ করতে তত বেশি পরিশ্রম বা অর্থ খরচ করতে রাজি হই। এতে বিক্রেতার পণ্যের বিক্রি বাড়ে এবং কার্টের আকার বড় হয়।
অনেক সময় আবার কোনো শর্ত ছাড়াই ফ্রি শিপিং দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সেক্ষেত্রে অনেক সময় শিপিংয়ের খরচটি আগে থেকেই পণ্যের মূল দামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অনেক সময় আবার স্টক ক্লিয়ারেন্স অফার চলে তাই ডেলিভারি চার্জ মওকুফ করা হয়।
মেম্বারশিপের মায়া এবং সচেতন ক্রেতা হওয়ার উপায়
অপ্রত্যাশিত ডেলিভারি চার্জ সামলাতে বিশ্বব্যাপী অনেক প্রতিষ্ঠান এখন মেম্বারশিপ বা সাবস্ক্রিপশন মডেলের দিকে ঝুঁকছে, যেমন অ্যামাজন প্রাইম। এখানে ক্রেতা বছরের শুরুতে এককালীন ফি দেন এবং বিনিময়ে সারা বছর ‘ফ্রি’ শিপিং সুবিধা পান।
এতে আমাদের ‘মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং’ বা মানসিক হিসেব ওলটপালট হয়ে যায়। যেহেতু মেম্বারশিপ ফি আগেই দেওয়া হয়ে গেছে, তাই প্রতিটি কেনাকাটাকে আমরা একেকটি বাড়তি পাওনা বা ‘ফ্রি পার্ক’ হিসেবে দেখি। সেই ‘টাকার মান উসুল’ করার নেশায় আমরা তখন বারবার ওই নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকেই কেনাকাটা করতে থাকি।
তবে এই অফুরন্ত ফ্রি শিপিংয়ের যুগ হয়ত শেষ হতে চলেছে। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়ায় বিক্রেতারা এখন তাদের ‘মিনিমাম স্পেন্ড’ সীমা বাড়িয়ে দিচ্ছে অথবা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তাই সচেতন ক্রেতা হিসেবে আমাদের উচিত এই তাৎক্ষণিক তৃপ্তির লোভ সামলানো।
- দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে
.png)








