ad
আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ–৬

চন্দ্রাহত রাত আর গ্রে হাউন্ডে চেপে ওয়াশিংটন ডিসির পথে

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর সপ্তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯: ২২
হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন। ছবি লেখকের সৌজন্যে

আমাদের গাড়ি চলছে ‘রামাপো’ নেটিভ আমেরিকানদের (রেড ইন্ডিয়ান, যাদের ফার্স্ট আমেরিকান বলা হচ্ছে সম্প্রতি) তৈরি ট্রেইল ধরে। বর্তমান নাম ‘রুট ২০২’। আশরাফ ভাইয়া জানালেন, এই সরু পথটি অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। পরে যখন আধুনিক দখলদার মানুষের প্রয়োজন হয়েছে, তখন হাঁটার পথটিকেই চওড়া করে পিচ ঢেলে গাড়ি চলার রাস্তা বানানো হয়েছে।

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো, আসল আমেরিকান কারা? কারা এই দেশটাকে নিজের বলে দাবি করতে পারে? সাইবেরিয়া থেকে আগত রেড ইন্ডিয়ানরা প্রায় ১৫-২০ হাজার বছরে ছড়িয়ে বসতি গাড়ল প্রেইরী থেকে প্যাটাগোনিয়ায়। তারপর এল ভাইকিংরা কানাডায়, কিন্তু বসতি করল না। এরপর কলম্বাসের পিছু পিছু শ্বেতাঙ্গদের মিছিল। মেরে কেটে খুলির চামড়াসহ চুল কেটে সমূলে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করা হলো সব ধরনের মোহিকানদের।

এরপর দাস হিসেবে আনা হল আফ্রিকানদের। যাদের বংশধরদের এখন বলা হয় আফ্রো-আমেরিকান বা আফ্রিকান-আমেরিকান। তারাও শত বছর পর আমেরিকায় নতুন নতুন মানুষের ভাগ্য বদলানোর আশায় আসা চলতেই থাকল। এখন পৃথিবীর ধনী দেশ বলে পরিচিত নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যাণ্ড, ইতালি সবখান থেকেই মানুষের ভীড় স্বপ্নরাজ্য অভিমুখে। আর হ্যাঁ, আরো কয়েক দশক পরে এই অর্থনৈতিকভাবে ধনী দেশে আশা শুরু করেছে চীন, ভারত, বাংলাদেশসহ সারা ল্যাতিন আমেরিকার, আফ্রিকার লোকেরা। মানে যুগে যুগে কালে কালে এখানে মানুষ এসেছে এবং আসছে, থেকে গেছে জীবিকা ও জীবনের তাগিদে।

হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এখন কোনো শ্বেতাঙ্গ যদি দাবি করে এটা শুধু তাদেরই দেশ আর বাকিরা অনাহুত, তবে তাদের ‘মাথামোটা ট্রাম্পভক্ত’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!

বাসার কাছেই চমৎকার ‘বিয়ার মাউন্টেন’ বা ভালুক-পর্বত। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সবুজের মেলা। যদিও শরতে তার শোভা আরো মোহনীয় ঝিলমিল। তারপরও এখন নেহাতই কম নয়। সেই পাহাড়শ্রেণীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে এক বাতিঘরের মতো ‘ওয়াচ টাওয়ার’ আছে, যার নাম আমেরিকান এক রাষ্ট্রপতির নামে। তিনি এই এলাকাকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। সবুজে ছাওয়া পাহাড় আর নিচেই রুপালি ফিতার মতো হাডসন নদী। যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধুই স্নিগ্ধতা। বারেক ফিরে শুধু একবার দেখলেই হয় না, তৃষিত চাতকের মতো তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। সেই যে ওস্তাদ প্রকৃতি সংরক্ষণবিদ জন মিউর জানিয়েছিলেন, ‘We can never have enough of nature.’

টাওয়ারে ওঠার তিন মিনিটের মধ্যেই মধ্যেই দেখা মিলল এক হরিণ ছানার। শরীরে সাদা সাদা ফোটার ছড়রা, সুন্দরবনের চিত্রল হরিণের মতো। এর আগে পূর্ণবয়স্ক হরিণ কয়েকবার দেখেছি—মাঝরাতে গাড়ির আলোয় কিংবা পার্কে হাঁটার সময়; কিন্তু তাদের গায়ে এমন দাগ ছিল না। পরে বই দেখে জেনে নিতে হবে এটি শুধু হরিণ শিশুদেরই রূপ কি না!

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

টাওয়ারে অনেক ছোট বাচ্চা দেখলাম। তাদের বাবা-মায়েরা প্রকৃতির কাছে নিয়ে এসেছেন। কেউ টেলিস্কোপ দিয়ে দূরের জিনিস দেখছে, কেউ বা কাছের ফুল-প্রজাপতি চিনছে। আসলেই নিসর্গ নিয়ে মুগ্ধতা, সচেতনতা, ভালোবাসা অতি শৈশবেই শুরু হওয়া দরকার।

হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন। আমরা নেমে পড়লাম হিমবাহ-হ্রদের মতো নয়মাভিরাম সুনীল জলের হেসিয়ান হ্রদ দেখতে। বিয়ার মাউন্টেইন স্টেট পার্কের ভেতরে এক ঐতিহাসিক সরাইখানা আছে Bear mountain Inn নামে, তা এই হ্রদের পাড়েই অবস্থিত। এক টুকরো ঝকঝকে নীলাকাশ যেন পড়ে রয়েছে আলগোছে পাহাড়ের পাদদেশে, কিন্তু সেখানে সাঁতারানো নিষেধ। গুচ্ছের মানুষ এসেছে সেখানে পিকনিক করতে। অবশ্য এই আবহাওয়ায় যদি এখানে না আসে, তো আর আসবে কখন!

পার্কের নানা কোণে কাঠের সুদৃশ্য বেঞ্চ বসানো। সবগুলোয় গায়েই ধাতব ফলকে এই বেঞ্চগুলো কাদের অর্থায়নে নির্মিত তা খোদাই করা আছে। কয়েক হাজার ডলার লাগে এমন একটি বেঞ্চ নিজের বা কারো নামে স্থাপন করতে। বেশ ভালো লাগলো ব্যবস্থাটা, হয়ত যার নাম লেখা, তিনি এমনই কোন বেঞ্চে বসে দু’চোখ ভরে পৃথিবীকে ভালোবাসতেন এই ভালুক-পর্বত আর হেসিয়ান হ্রদের মাধ্যমে। নিজের নাম অব্যয় করে রাখতে পারবে না কেউই মহাকালে, কিন্তু ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে এই ক্ষণস্থায়ী প্রচেষ্টা মন্দ নয়।

আমরাও বসলাম জলকিনারা ঘেঁষে এক জায়গায়। যেখানে মিনিট তিনেকের মধ্যে এসে লেজ তুলে গান গাওয়া শুরু করলো এক ‘মকিং বার্ড’। আগের রাতেই আমরা হারপার লী’র অবিস্মরণীয় উপন্যাস ‘টু কিল এ মকিং বার্ড’-এর কথা আলোচনা করছিলাম, কালো মানুষের বাঁচার অধিকার নিয়ে এর চেয়ে তীব্র সাড়া আর কোনো উপন্যাস ফেলেছিল কি? ভাইয়া মজা করে বললেন, ‘দেখো দেখো, পাখিপ্রেমীদের দেখেই পাখি এত কাছে এসে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ও তোমাদের চিনতে পেরেছে।’

সবুজের মেলা। ছবি লেখকের সৌজন্যে
সবুজের মেলা। ছবি লেখকের সৌজন্যে

আমাদের এরপর যাওয়ার কথা ছিল পেনসিলভেনিয়ার ‘অ্যামিশ’ সম্প্রদায়ের গ্রামে। সেখানে বিদ্যুৎবাতির বদলে স্নিগ্ধতা ছড়ায় টিমটিমে লন্ঠন, গাড়ীর বদলে রাস্তা জুড়ে থাকে ঘোড়ার ব্যাগিগাড়ী। কিন্তু এক অনিবার্য কারণবশত যাত্রাপথ বদলে যেতে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির দিকে (ডিসি মানে ডিসট্রিক্ট অফ কলম্বিয়া)। যাচ্ছি ‘গ্রে হাউন্ড’ বাসে চেপে।

আমেরিকা নিয়ে যে ক’জন বাঙালি লেখকের ভ্রমণকাহিনি পড়েছি। সে হোক সুনীল, হুমায়ূন বা সমরেশ, সবখানেই এই গ্রে হাউন্ডে যাত্রার বিবরণ। তাই অস্বীকার করব না যে এই যাত্রার অভিজ্ঞতাও চাইছিলাম চুপে চুপে।

বাস স্টেশনের ওয়াশরুমে গিয়ে দেখলাম সাদা, কালো, হলুদ সব বর্ণের মানুষ একসঙ্গে নিজের কাজেই ব্যস্ত। দেখেই মনে হয়ে গেল নাসায় একসময়ে কর্মরত ৩ কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অবদান নিয়ে নির্মিত অসাধারণ চলচ্চিত্র ‘Hidden figures’ এর কথা। যখন নাসায় শ্বেতাঙ্গদের টয়লেটে অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, যখন ‘Colored Toilet’ লেখা ওয়াশরুম ছিল না সব ভবনে, ফলে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে হতো তাদের।

হে আমেরিকা, তোমার সন্তানরা কী জানে তাদের আসল ইতিহাসের কথা?

আকাশে এখন বিশাল এক চাঁদ উঠেছে। গ্রে হাউন্ড বাস ছুটে চলেছে। রাজধানী পৌঁছাতে পৌঁছাতে মধ্যরাত হয়ে যাবে। সেখানে দেখা হবে আমাদের দলের তৃতীয় সদস্য রেজোয়ান আপেলের সাথে।

বাকি গল্প তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আর চাঁদের মাটি ছোঁয়ার পর শোনাব, ঠিক আছে?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত