ad

মালদ্বীপে রমজানের ঐতিহ্য ‘রাইভারু’

নেচে নেচে রাইভারু গাইছেন মালদ্বীপের এক তরুণ। ছবি: রোভ
নেচে নেচে রাইভারু গাইছেন মালদ্বীপের এক তরুণ। ছবি: রোভ

রমজান মাস মুসলিমদের জন্য খুবই তাৎপর্য পূর্ণ একটি মাস। পুরো বিশ্ব জুড়েই সকল মুসলিম একই নিয়মে মাসব্যাপী এই ইবাদত পালন করেন। তবে নিয়ম একই হলেও, রমজান নিয়ে প্রতিটি দেশেরই আছে নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান। বিভিন্নভাবে দেশগুলো ভিন্নধর্মী নানা আয়োজনে এই মাস বরণ করে নেন। ‘রাইভারু’ নামে এমনই এক ভিন্ন আয়োজন করেন মালদ্বীপের মানুষরা।

সারাদিনের ব্যাস্ত শহরগুলোতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই নেমে আসে নীরবতা। মাগরিবের আজানের সঙ্গেই শুরু হয় ইফতার। তবে, ইফতার শেষেই দেখা যায় মুসল্লিরা সুর করে কিছু ধর্মীয় শ্লোক আওড়াচ্ছেন। এই শ্লোককেই মালদ্বীপের মানুষেরা বলেন রাইভারু।

মালদ্বীপের জনপ্রিয় তরুণ কবি নাজা বলেন, ‘ইফতারের সময় রাইভারু গাওয়া আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য। এই শ্লোকগুলোও প্রাচীন আমলের। কে প্রথম লিখেছিলেন জানা নেই। মানুষের মুখে মুখেই শত বছর ধরে বেঁচে আছে এসব গান।’

মালদ্বীপের ভাষাবিদ হুসেইন সালাহউদ্দিন বলেন, ‘মালদ্বীপের মানুষেরা আবেগ প্রকাশের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই চার লাইন বা ছয় লাইনের কবিতা বলে আসছে। এই ছন্দবদ্ধ কবিতাগুলোই রাইভারু নামে পরিচিত।’

তবে রাইভারুরর প্রচলন নিয়ে কোনো লিপিবদ্ধ ইতিহাস নেই বলে জানান হুসেইন সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ধারণা করা হয়, সপ্তদশ শতাব্দীতে সুলতান কালাফানুর শাসনামল থেকে রাইভারু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে মালদ্বীপজুড়ে। রোজাদার মানুষেরা রোজা ভাঙার সময় ধর্মীয় রাইভারু গাইতে গাইতে ইফতার করেন। অথবা ইফতারের পরে সবাই একসঙ্গে রাইভারু আবৃত্তি করেন।’

মালদ্বীপের ধিবেহী ভাষার কবিতার আদিরূপ ‘বান্ধি’ ও ‘কা’ থেকে রাইভারুর উৎপত্তি বলে মনে করেন হুসেইন সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আদিকালে যোগাযোগ, বিনোদন, শিক্ষাদান, উপদেশ, প্রশংসা এবং এমনকি ঠাট্টা-বিদ্রুপের প্রয়োজনেও মানুষ রাইভারু কবিতার শ্লোক ব্যবহার করত।

রাইভারুর আরও যত ব্যবহার

শুধু রমজান মাসে ইফতারের সময়েই রাইভারু গাওয়া হয় না, বরং এটি একসময় তাদের প্রতিদিনের কথ্য ভাষার মতো ছিলো। মালদ্বীপের ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদিকালে নারীরা বনে–জঙ্গলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের সময়ও নিজেদের যোগাযোগের জন্যও রাইভারু আওড়াতেন।

অতীতে অনেক শিক্ষক ছিলেন যাঁরা রাইভারু মুখস্ত বলতে পারতেন। এ ছাড়া মালদ্বীপের শিশুদের ঘুম পাড়াতেও এর চল ছিল। আমাদের দেশের পুঁথি পাঠের আসরের মতো গাছের নিচে সমবেত হয়ে রাইভারু পাঠের আসর বসাতেন পুরুষরা।

হুসেইন সালাহউদ্দিন বলেন, ‘মালদ্বীপের সুলতানের সভাকবিরাও দরবারে সুলতানের প্রশংসাসূচক রাইভারু আবৃত্তি করতেন বলে জানা যায়। মূলত সুলতানদের মনোরঞ্জনের জন্য তারা রাইভারু আবৃত্তি করতেন।

এখন কী অবস্থা

হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী রাইভারুর সেই অবস্থা এখন আর নেই। মালদ্বীপের কিছু স্কুলে রাইভারু পড়ানো হলেও সেকেলে সংস্কৃতি ভেবে শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে তা খুব একটা চর্চা করে না। সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বরা মনে করেন, রাইভারু ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। এখন রাইভারু মূলত রমজান মাসের ইফতার সংস্কৃতির মধ্যেই টিকে আছে।

তবে মালদ্বীপের প্রবীণ ব্যক্তিরা প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিশুদের রাইভারু শেখান। ভাষাবিদ হুসেইন সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এদের হাত ধরেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে মালদ্বীপের রাইভারু। কারণ এটি রোজার ঐতিহ্য। যতদিন মালদ্বীপে রোজা থাকবে, ইফতার থাকবে, ততদিন রাইভারু থাকবে।’

তথ্যসূত্র: হাওয়াজ নিউজ এজেন্সি, রিভাইভ আর্টস ও দ্য মুসলিম ভাইবস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত