সুন্দরবনে চোরাশিকারিরা হরিণ ধরার জন্য ব্যাপক হারে নাইলন বা জিআই তারের ফাঁদ ব্যবহার করেন। চলাচলের পথে পাতা এসব ফাঁদই বাঘের জন্য উদ্দেশ্যহীন হুমকি (নন-টার্গেট) হয়ে দাঁড়ায়।
মাইদুল ইসলাম

সুন্দরবনে চোরাশিকারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বনের যত্রতত্র নাইলন ও জিআই তারের ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করেন তারা। এই ফাঁদে প্রায়ই আটকা পড়ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বন বিভাগের কর্মীরাও এই চক্রের কাছে অসহায়।
সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শরকির খালের গহিনে ফাঁদে আটকা পড়া একটি বাঘ উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মী ও ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের সদস্যরা। চার দিন নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তারা বাঘটিকে উদ্ধারে সক্ষম হন। পরে বাঘটিকে খুলনার রেসকিউ সেন্টারে পাঠানো হয়।
দৃশ্যত এটিকে সফল উদ্ধার অভিযান মনে হলেও, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা গভীর সংকটের অশনিসংকেত। গুলির চেয়েও সুন্দরবনে বাঘের নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে শিকারিদের ফাঁদ।
বাঘ গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ স্ট্রিমকে বলেছেন, সুন্দরবন ক্রান্তিকাল পার করছে। বনদস্যু ও চোরাশিকারিরা পুরো বনে বেপরোয়া। তাদের দৌরাত্ম্য বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য নিরাপদ বনই এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে।
চোরাশিকারিদের ফাঁদ কীভাবে বাঘের জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠছে, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এসেছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘অরিক্স’–এ প্রকাশিত ‘হু ইজ কিলিং দ্য টাইগার প্যানথেরা টাইগ্রিস অ্যান্ড হোয়াই?’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনে চোরাশিকারিরা হরিণ ধরার জন্য ব্যাপক হারে নাইলন বা জিআই তারের ফাঁদ ব্যবহার করেন। চলাচলের পথে পাতা এসব ফাঁদই বাঘের জন্য উদ্দেশ্যহীন হুমকি (নন-টার্গেট) হয়ে দাঁড়ায়।
গবেষক দলের প্রধান ছিলেন সামিয়া সাইফ। সহগবেষক ছিলেন এইচ এম তৌহিদুর রহমান ও ডগলাস ক্রেইগ ম্যাকমিলান। গবেষণায় স্থানীয় ১৪১ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে বাঘ এবং হরিণ শিকারিও ছিলেন।
বাঘ রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া। আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা না নিয়ে, এটি যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা করা। ফাঁদ পাতা ও দস্যুতা বন্ধ করা না গেলে, বাঘের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। অধ্যাপক এম এ আজিজ, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষকরা উল্লেখ করেন, ফাঁদে আটকা পড়ার পর নিজেকে মুক্ত করতে বাঘ প্রাণপণ চেষ্টা করে। এতে তার হাত ও পায়ে গভীর ক্ষত হয়। অনেক সময় মাংস কেটে হাড়ে গিয়ে পৌঁছে ফাঁদের তার। পরে ক্ষতস্থানে গ্যাংগ্রিন হয়ে বাঘের মৃত্যু হয়।
২০১২ সালে ফাঁদে আটকা পড়া বাঘকে উদ্ধারের পরও কেন বাঁচানো যায়নি– তার মর্মান্তিক একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে বন বিভাগের নথিপত্রে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণে বাঘটির মৃত্যু হয়েছিল।
সুন্দরবনে ঠিক কী সংখ্যক বাঘ অপমৃত্যু বা হত্যার শিকার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং জরিপ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাঘের মৃত্যু ও হত্যার একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়।
সামিয়া সাইফ তাঁর পিএইচডি থিসিস ‘ইনভেস্টিগেটিং টাইগার পোচিং ইন দ্য বাংলাদেশ সুন্দরবনস-২০১৬’-এ উল্লেখ করেছেন, ১৯৮১ থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে বাঘ বা বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জব্দ এবং অবৈধ বাণিজ্যের ৪৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি ঘটনা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি জব্দ করা। গবেষণায় একজন শিকারির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তার দলের হাতে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ২৭টি বাঘের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন ওই ব্যক্তি।

বাঘ হত্যা ও পাচার যে থেমে নেই, তার প্রমাণ মেলে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘কনজারভেশন সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস’-এ প্রকাশিত ‘টাইগারস অ্যাট আ ক্রসরোডস’ শীর্ষক গবেষণায়। গবেষক নাসির উদ্দিন, স্যাম ইনক, অভিষেক হরিহর, রব এস এ পিকলস এবং অ্যালিস সি হিউজ দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাঘ হত্যা ও পাচার-সংক্রান্ত ১৪টি এনফোর্সমেন্ট রেকর্ড বা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ খুলনা ও ঢাকাকেন্দ্রিক। এটি প্রমাণ করে সুন্দরবন থেকে বাঘ শিকার করে তা রাজধানীতে পাচার করা হয়েছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ প্রকাশিত ‘স্ট্যাটাস অব টাইগারস ইন দ্য সুন্দরবনস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে বাঘ বেড়ে ১২৫টি হয়েছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ১১৪। তবে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রতিবেদনে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই অঞ্চলে ফাঁদ পাতা এবং অবৈধ শিকারের কারণে বাঘের ঘনত্ব কমেছে।
শুধু ফাঁদ নয়, সুন্দরবনে বাঘ হত্যার আরেকটি ভয়াবহ ও নীরব পদ্ধতি হলো বিষপ্রয়োগ। ২০১৬ সালে ‘অরিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত সামিয়া সাইফ ও তাঁর দলের গবেষণা প্রবন্ধে বাঘ হত্যার রোমহর্ষক কৌশলের বিস্তারিত এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়, পেশাদার চোরাশিকারিরা প্রথমে ফাঁদ পেতে হরিণ বা বন্য শুকর শিকার করেন। এরপর সেই মৃত প্রাণীর দেহে ‘ফুরাডান’ জাতীয় উচ্চমাত্রার কীটনাশক মিশিয়ে বনে বাঘের চলাচলের পথে রেখে দেন। বাঘ সেই বিষাক্ত মৃতদেহ খেয়ে মারা যায়।
এই পদ্ধতিতে বাঘের চামড়ায় কোনো গুলির দাগ থাকে না। ফলে পাচারকারীদের জন্য চামড়া বিক্রি করা সহজ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও পাচারকারীরা বাঘটির স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেন। ২০১৫-১৬ সালে জব্দ করা বেশ কিছু বাঘের চামড়ায় গুলির চিহ্ন না থাকায় বিষপ্রয়োগের বিষয় নিশ্চিত করেছিলেন গবেষকরা।
চট্টগ্রাম ও গাজীপুর সাফারি পার্ক ছাড়া বন বিভাগের আর কোথাও বন্যপ্রাণী চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি অফিসার নেই। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে না পারায় অনেক সময় আহত বাঘের মৃত্যু হয়। ইমরান আহমেদ, বন সংরক্ষক, খুলনা অঞ্চল
এম এ আজিজ এবং তাঁর সহযোগীরা ২০১৭ সালে ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’ জার্নালে প্রকাশিত ‘ইনভেস্টিগেটিং প্যাটার্নস অব টাইগার অ্যান্ড প্রে পোচিং ইন দ্য বাংলাদেশ সুন্দরবনস, ইমপ্লিকেশনস ফর ইমপ্রুভড ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বিষপ্রয়োগের ভয়াবহতা উল্লেখ করেছেন।

বন বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সরাসরি গুলি করে বাঘ শিকারের ঘটনা কিছুটা কমেছে। তবুও এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ বন বিভাগের ‘টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’-এর তথ্যে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড় ও দাঁতের উচ্চমূল্যের কারণে সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন। সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় এখনো সক্রিয় চক্রের সদস্যরা।
২০২৪ সালের বাঘ জরিপ প্রতিবেদনেও (স্ট্যাটাস অব টাইগার ২০২৪) চোরাশিকারকে (পোচিং) বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে স্থানীয় শিকারিদের যোগসাজশ এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে।
সুন্দরবনের লোকালয়-সংলগ্ন গ্রামে বাঘের আক্রমণে মানুষ বা গবাদিপশু মারা গেলে বিক্ষুব্ধরা দলবেঁধে বাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘বায়োলজিক্যাল কনজারভেশন’-এ প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং কার্নিভোর কিলিং বিহেভিয়ার’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে গবেষক ক্লো ইনস্কিপ ও তাঁর দল দেখিয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে লোকালয়ে আসা মোট আটটি বাঘ পিটিয়ে মারা হয়েছে।
বাঘের আক্রমণে স্বজন হারানো বা অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার মানুষ মূলত ভীতি এবং প্রতিশোধস্পৃহা থেকে বাঘ হত্যায় অংশ নেন। একই চিত্র উঠে এসেছে গবেষক সামিয়া সাইফ ও তাঁর দলের গবেষণাতেও।
তবে আশার কথা, গত এক দশকে বন বিভাগের উদ্যোগে গঠিত ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের কার্যক্রমে পিটিয়ে বাঘ হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
সুন্দরবনের বাঘ হত্যার পেছনে এক সময় জলদস্যু বা বনদস্যুদের একটি বড় ভূমিকা ছিল। গবেষক ক্লো ইনস্কিপ ও তাঁর সহযোগীদের (২০১৪) গবেষণায় জলদস্যুদের হাতে বাঘ হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে একটি দস্যু দল মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুটি বাঘ হত্যা করেছিল। ২০১৩ সালে অন্য একটি দস্যু দল পাঁচ মাসের মধ্যে দুটি বাঘ হত্যা করার কথা স্বীকার করেছিল।
গবেষণার সময় একজন উত্তরদাতা জানিয়েছেন– তিনি জলদস্যুদের আস্তানায় জিম্মি থাকাকালে ১২টি বাঘের চামড়া দেখতে পেয়েছেন। যদিও ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

পরোক্ষভাবে বাঘের মৃত্যুর অন্যতম কারণ খাদ্য সংকটকে হাজির করা হয়। আর এটি তৈরি হয় মানুষের হরিণ শিকারের প্রবণতা থেকে। ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ ও বন্য শুকর। একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের সপ্তাহে অন্তত একটি বড় শিকার প্রয়োজন। কিন্তু চোরাশিকারিরা প্রতিনিয়ত এসব প্রাণী শিকার করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০২৪-২৫) কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের একাধিক অভিযানে মণকে মণ হরিণের মাংস এবং চামড়া জব্দ হয়েছে। বন বিভাগ সূত্র জানায়, বরগুনা, পাথরঘাটা ও মোংলা এলাকায় প্রায়ই ট্রলারে অভিযান চালালে মিলছে হরিণের মাংস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনে হরিণ কমে গেলে বাঘ খাদ্যের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন তারা সহজ শিকারের আশায় লোকালয়ে আক্রমণ করে। ফলে শিকারিদের পাতা বিষাক্ত টোপ গিলতে বাধ্য হয় বাঘ। হরিণ শিকার বন্ধ না হলে বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যুহার বেড়ে যাবে এবং বাঘ-মানুষ বিরোধ প্রকট হবে।

সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারের সঙ্গে বনদস্যুদের গভীর যোগসাজশ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক এম এ আজিজ। তিনি জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে নির্বিচারে বাঘ ও হরিণ শিকার ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালের জরিপে, যখন বাঘের সংখ্যা ১০৬-এ নেমে আসে। পরবর্তীতে সরকার দস্যুতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিলে এবং দস্যুরা আত্মসমর্পণ করলে সুন্দরবনের পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এর প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
তবে গত এক-দেড় বছরের পরিস্থিতিকে গত এক দশকের মধ্যে সুন্দরবনের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ সময়’ হিসেবে অভিহিত করেন এই গবেষক। তাঁর মতে, এর মূল কারণ নতুন করে ডাকাত বা দস্যু দলের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়া।
এম এ আজিজ বলেন, ‘ডাকাতের সঙ্গে এই সমস্ত অপকর্মের একটা যোগসাজশ আছে। হরিণ শিকারিরা বা যারা বাঘ চোরাশিকার করে, তারা মূলত দুটি কারণে এই কাজগুলো করে। প্রথমত, বাঘ দেখলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা গুলি করে মেরে ফেলে, যেহেতু তাদের কাছে অস্ত্র থাকে। দ্বিতীয়ত, বনের ভেতরে খাবারের সংকট মেটাতে তারা হরিণ শিকার করে।’
এই বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের মতে, দস্যুদের ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় কিছু চোরাশিকারি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দস্যুদের সহযোগিতায় বনে বাঘ ও হরিণ হত্যা করা হয় এবং ডাঙায় থাকা ব্যবসায়ী বা সহযোগীদের মাধ্যমে সেই চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের একটি শক্তিশালী চ্যানেল তৈরি হয়। গবেষক আজিজ সতর্ক করে বলেন, ‘এই ডাকাতেরা সুন্দরবনে এখন জেঁকে বসেছে। ডাকাতের উৎপাত বা দস্যুতা যদি বন্ধ না করা যায়, তবে এই শিকার বা পাচার বন্ধ করা খুবই কঠিন।’
সম্প্রতি খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের সই করা চিঠিতে বড় সংকটের কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর সাফারি পার্ক ছাড়া বন বিভাগের আর কোথাও বন্যপ্রাণী চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি অফিসার নেই।
সুন্দরবনের মতো বিশাল ও সংবেদনশীল বনাঞ্চলে বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণী আহত হলে ঢাকা থেকে চিকিৎসক দল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে না পারায় অনেক সময় আহত বাঘের মৃত্যু হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ। তিনি বলেন, বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে বন থেকে ডাকাত নির্মূল করা। আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বন্যপ্রাণী আইন ও দেশের প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ফাঁদ পেতে শিকারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সুন্দরবনে বর্তমানে বন বিভাগের পাশাপাশি র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের মতো যেসব বাহিনী সক্রিয় আছে, তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ বছর আগের মতোই কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়ে এম এ আজিজ বলেন, ‘ডাকাত নির্মূল করতে হলে অবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত। এরপর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা জরুরি। এটা আমি ১০ বছর আগেও বলেছি, এখনো বলছি—ডাকাতদের থামাতে হবে। ফাঁদ পাতা ও দস্যুতা বন্ধ করা না গেলে, বাঘের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।’

সুন্দরবনে চোরাশিকারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বনের যত্রতত্র নাইলন ও জিআই তারের ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করেন তারা। এই ফাঁদে প্রায়ই আটকা পড়ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বন বিভাগের কর্মীরাও এই চক্রের কাছে অসহায়।
সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শরকির খালের গহিনে ফাঁদে আটকা পড়া একটি বাঘ উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মী ও ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের সদস্যরা। চার দিন নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তারা বাঘটিকে উদ্ধারে সক্ষম হন। পরে বাঘটিকে খুলনার রেসকিউ সেন্টারে পাঠানো হয়।
দৃশ্যত এটিকে সফল উদ্ধার অভিযান মনে হলেও, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা গভীর সংকটের অশনিসংকেত। গুলির চেয়েও সুন্দরবনে বাঘের নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে শিকারিদের ফাঁদ।
বাঘ গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ স্ট্রিমকে বলেছেন, সুন্দরবন ক্রান্তিকাল পার করছে। বনদস্যু ও চোরাশিকারিরা পুরো বনে বেপরোয়া। তাদের দৌরাত্ম্য বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য নিরাপদ বনই এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে।
চোরাশিকারিদের ফাঁদ কীভাবে বাঘের জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠছে, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এসেছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘অরিক্স’–এ প্রকাশিত ‘হু ইজ কিলিং দ্য টাইগার প্যানথেরা টাইগ্রিস অ্যান্ড হোয়াই?’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনে চোরাশিকারিরা হরিণ ধরার জন্য ব্যাপক হারে নাইলন বা জিআই তারের ফাঁদ ব্যবহার করেন। চলাচলের পথে পাতা এসব ফাঁদই বাঘের জন্য উদ্দেশ্যহীন হুমকি (নন-টার্গেট) হয়ে দাঁড়ায়।
গবেষক দলের প্রধান ছিলেন সামিয়া সাইফ। সহগবেষক ছিলেন এইচ এম তৌহিদুর রহমান ও ডগলাস ক্রেইগ ম্যাকমিলান। গবেষণায় স্থানীয় ১৪১ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে বাঘ এবং হরিণ শিকারিও ছিলেন।
বাঘ রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া। আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা না নিয়ে, এটি যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা করা। ফাঁদ পাতা ও দস্যুতা বন্ধ করা না গেলে, বাঘের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। অধ্যাপক এম এ আজিজ, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষকরা উল্লেখ করেন, ফাঁদে আটকা পড়ার পর নিজেকে মুক্ত করতে বাঘ প্রাণপণ চেষ্টা করে। এতে তার হাত ও পায়ে গভীর ক্ষত হয়। অনেক সময় মাংস কেটে হাড়ে গিয়ে পৌঁছে ফাঁদের তার। পরে ক্ষতস্থানে গ্যাংগ্রিন হয়ে বাঘের মৃত্যু হয়।
২০১২ সালে ফাঁদে আটকা পড়া বাঘকে উদ্ধারের পরও কেন বাঁচানো যায়নি– তার মর্মান্তিক একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে বন বিভাগের নথিপত্রে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণে বাঘটির মৃত্যু হয়েছিল।
সুন্দরবনে ঠিক কী সংখ্যক বাঘ অপমৃত্যু বা হত্যার শিকার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং জরিপ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাঘের মৃত্যু ও হত্যার একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়।
সামিয়া সাইফ তাঁর পিএইচডি থিসিস ‘ইনভেস্টিগেটিং টাইগার পোচিং ইন দ্য বাংলাদেশ সুন্দরবনস-২০১৬’-এ উল্লেখ করেছেন, ১৯৮১ থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে বাঘ বা বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জব্দ এবং অবৈধ বাণিজ্যের ৪৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি ঘটনা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি জব্দ করা। গবেষণায় একজন শিকারির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তার দলের হাতে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ২৭টি বাঘের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন ওই ব্যক্তি।

বাঘ হত্যা ও পাচার যে থেমে নেই, তার প্রমাণ মেলে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘কনজারভেশন সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস’-এ প্রকাশিত ‘টাইগারস অ্যাট আ ক্রসরোডস’ শীর্ষক গবেষণায়। গবেষক নাসির উদ্দিন, স্যাম ইনক, অভিষেক হরিহর, রব এস এ পিকলস এবং অ্যালিস সি হিউজ দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাঘ হত্যা ও পাচার-সংক্রান্ত ১৪টি এনফোর্সমেন্ট রেকর্ড বা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ খুলনা ও ঢাকাকেন্দ্রিক। এটি প্রমাণ করে সুন্দরবন থেকে বাঘ শিকার করে তা রাজধানীতে পাচার করা হয়েছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ প্রকাশিত ‘স্ট্যাটাস অব টাইগারস ইন দ্য সুন্দরবনস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে বাঘ বেড়ে ১২৫টি হয়েছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ১১৪। তবে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রতিবেদনে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই অঞ্চলে ফাঁদ পাতা এবং অবৈধ শিকারের কারণে বাঘের ঘনত্ব কমেছে।
শুধু ফাঁদ নয়, সুন্দরবনে বাঘ হত্যার আরেকটি ভয়াবহ ও নীরব পদ্ধতি হলো বিষপ্রয়োগ। ২০১৬ সালে ‘অরিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত সামিয়া সাইফ ও তাঁর দলের গবেষণা প্রবন্ধে বাঘ হত্যার রোমহর্ষক কৌশলের বিস্তারিত এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়, পেশাদার চোরাশিকারিরা প্রথমে ফাঁদ পেতে হরিণ বা বন্য শুকর শিকার করেন। এরপর সেই মৃত প্রাণীর দেহে ‘ফুরাডান’ জাতীয় উচ্চমাত্রার কীটনাশক মিশিয়ে বনে বাঘের চলাচলের পথে রেখে দেন। বাঘ সেই বিষাক্ত মৃতদেহ খেয়ে মারা যায়।
এই পদ্ধতিতে বাঘের চামড়ায় কোনো গুলির দাগ থাকে না। ফলে পাচারকারীদের জন্য চামড়া বিক্রি করা সহজ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও পাচারকারীরা বাঘটির স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেন। ২০১৫-১৬ সালে জব্দ করা বেশ কিছু বাঘের চামড়ায় গুলির চিহ্ন না থাকায় বিষপ্রয়োগের বিষয় নিশ্চিত করেছিলেন গবেষকরা।
চট্টগ্রাম ও গাজীপুর সাফারি পার্ক ছাড়া বন বিভাগের আর কোথাও বন্যপ্রাণী চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি অফিসার নেই। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে না পারায় অনেক সময় আহত বাঘের মৃত্যু হয়। ইমরান আহমেদ, বন সংরক্ষক, খুলনা অঞ্চল
এম এ আজিজ এবং তাঁর সহযোগীরা ২০১৭ সালে ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’ জার্নালে প্রকাশিত ‘ইনভেস্টিগেটিং প্যাটার্নস অব টাইগার অ্যান্ড প্রে পোচিং ইন দ্য বাংলাদেশ সুন্দরবনস, ইমপ্লিকেশনস ফর ইমপ্রুভড ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বিষপ্রয়োগের ভয়াবহতা উল্লেখ করেছেন।

বন বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সরাসরি গুলি করে বাঘ শিকারের ঘটনা কিছুটা কমেছে। তবুও এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ বন বিভাগের ‘টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’-এর তথ্যে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড় ও দাঁতের উচ্চমূল্যের কারণে সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন। সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় এখনো সক্রিয় চক্রের সদস্যরা।
২০২৪ সালের বাঘ জরিপ প্রতিবেদনেও (স্ট্যাটাস অব টাইগার ২০২৪) চোরাশিকারকে (পোচিং) বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে স্থানীয় শিকারিদের যোগসাজশ এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে।
সুন্দরবনের লোকালয়-সংলগ্ন গ্রামে বাঘের আক্রমণে মানুষ বা গবাদিপশু মারা গেলে বিক্ষুব্ধরা দলবেঁধে বাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘বায়োলজিক্যাল কনজারভেশন’-এ প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং কার্নিভোর কিলিং বিহেভিয়ার’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে গবেষক ক্লো ইনস্কিপ ও তাঁর দল দেখিয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে লোকালয়ে আসা মোট আটটি বাঘ পিটিয়ে মারা হয়েছে।
বাঘের আক্রমণে স্বজন হারানো বা অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার মানুষ মূলত ভীতি এবং প্রতিশোধস্পৃহা থেকে বাঘ হত্যায় অংশ নেন। একই চিত্র উঠে এসেছে গবেষক সামিয়া সাইফ ও তাঁর দলের গবেষণাতেও।
তবে আশার কথা, গত এক দশকে বন বিভাগের উদ্যোগে গঠিত ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের কার্যক্রমে পিটিয়ে বাঘ হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
সুন্দরবনের বাঘ হত্যার পেছনে এক সময় জলদস্যু বা বনদস্যুদের একটি বড় ভূমিকা ছিল। গবেষক ক্লো ইনস্কিপ ও তাঁর সহযোগীদের (২০১৪) গবেষণায় জলদস্যুদের হাতে বাঘ হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে একটি দস্যু দল মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুটি বাঘ হত্যা করেছিল। ২০১৩ সালে অন্য একটি দস্যু দল পাঁচ মাসের মধ্যে দুটি বাঘ হত্যা করার কথা স্বীকার করেছিল।
গবেষণার সময় একজন উত্তরদাতা জানিয়েছেন– তিনি জলদস্যুদের আস্তানায় জিম্মি থাকাকালে ১২টি বাঘের চামড়া দেখতে পেয়েছেন। যদিও ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

পরোক্ষভাবে বাঘের মৃত্যুর অন্যতম কারণ খাদ্য সংকটকে হাজির করা হয়। আর এটি তৈরি হয় মানুষের হরিণ শিকারের প্রবণতা থেকে। ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ ও বন্য শুকর। একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের সপ্তাহে অন্তত একটি বড় শিকার প্রয়োজন। কিন্তু চোরাশিকারিরা প্রতিনিয়ত এসব প্রাণী শিকার করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০২৪-২৫) কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের একাধিক অভিযানে মণকে মণ হরিণের মাংস এবং চামড়া জব্দ হয়েছে। বন বিভাগ সূত্র জানায়, বরগুনা, পাথরঘাটা ও মোংলা এলাকায় প্রায়ই ট্রলারে অভিযান চালালে মিলছে হরিণের মাংস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনে হরিণ কমে গেলে বাঘ খাদ্যের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন তারা সহজ শিকারের আশায় লোকালয়ে আক্রমণ করে। ফলে শিকারিদের পাতা বিষাক্ত টোপ গিলতে বাধ্য হয় বাঘ। হরিণ শিকার বন্ধ না হলে বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যুহার বেড়ে যাবে এবং বাঘ-মানুষ বিরোধ প্রকট হবে।

সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারের সঙ্গে বনদস্যুদের গভীর যোগসাজশ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক এম এ আজিজ। তিনি জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে নির্বিচারে বাঘ ও হরিণ শিকার ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালের জরিপে, যখন বাঘের সংখ্যা ১০৬-এ নেমে আসে। পরবর্তীতে সরকার দস্যুতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিলে এবং দস্যুরা আত্মসমর্পণ করলে সুন্দরবনের পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এর প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
তবে গত এক-দেড় বছরের পরিস্থিতিকে গত এক দশকের মধ্যে সুন্দরবনের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ সময়’ হিসেবে অভিহিত করেন এই গবেষক। তাঁর মতে, এর মূল কারণ নতুন করে ডাকাত বা দস্যু দলের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়া।
এম এ আজিজ বলেন, ‘ডাকাতের সঙ্গে এই সমস্ত অপকর্মের একটা যোগসাজশ আছে। হরিণ শিকারিরা বা যারা বাঘ চোরাশিকার করে, তারা মূলত দুটি কারণে এই কাজগুলো করে। প্রথমত, বাঘ দেখলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা গুলি করে মেরে ফেলে, যেহেতু তাদের কাছে অস্ত্র থাকে। দ্বিতীয়ত, বনের ভেতরে খাবারের সংকট মেটাতে তারা হরিণ শিকার করে।’
এই বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের মতে, দস্যুদের ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় কিছু চোরাশিকারি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দস্যুদের সহযোগিতায় বনে বাঘ ও হরিণ হত্যা করা হয় এবং ডাঙায় থাকা ব্যবসায়ী বা সহযোগীদের মাধ্যমে সেই চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের একটি শক্তিশালী চ্যানেল তৈরি হয়। গবেষক আজিজ সতর্ক করে বলেন, ‘এই ডাকাতেরা সুন্দরবনে এখন জেঁকে বসেছে। ডাকাতের উৎপাত বা দস্যুতা যদি বন্ধ না করা যায়, তবে এই শিকার বা পাচার বন্ধ করা খুবই কঠিন।’
সম্প্রতি খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের সই করা চিঠিতে বড় সংকটের কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর সাফারি পার্ক ছাড়া বন বিভাগের আর কোথাও বন্যপ্রাণী চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি অফিসার নেই।
সুন্দরবনের মতো বিশাল ও সংবেদনশীল বনাঞ্চলে বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণী আহত হলে ঢাকা থেকে চিকিৎসক দল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে না পারায় অনেক সময় আহত বাঘের মৃত্যু হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ। তিনি বলেন, বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে বন থেকে ডাকাত নির্মূল করা। আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বন্যপ্রাণী আইন ও দেশের প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ফাঁদ পেতে শিকারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সুন্দরবনে বর্তমানে বন বিভাগের পাশাপাশি র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের মতো যেসব বাহিনী সক্রিয় আছে, তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ বছর আগের মতোই কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়ে এম এ আজিজ বলেন, ‘ডাকাত নির্মূল করতে হলে অবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত। এরপর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা জরুরি। এটা আমি ১০ বছর আগেও বলেছি, এখনো বলছি—ডাকাতদের থামাতে হবে। ফাঁদ পাতা ও দস্যুতা বন্ধ করা না গেলে, বাঘের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত স্ট্রিমের বিশেষ গ্রাফিক টাইমলাইন।
৬ দিন আগে
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, গ্রাহকের অজান্তে সিম রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অজান্তে এনআইডি ব্যবহার, বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) জালিয়াতি, অনুমতি ছাড়া সিম সক্রিয়করণ ও সিম রিপ্লেসমেন্ট।
২৩ জানুয়ারি ২০২৬আমবাগানের পেছনে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। তারপর বিশাল এলাকার একপাশে একাধিক ঘানি থেকে মাড়াই হচ্ছে তেল। অন্য পাশে গবাদি পশুর খামার; মাছের ঘের। সঙ্গে মুরগি ও বিদেশি কুকুরের বাণিজ্যিক ফার্ম। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর তারাইল ইউনিয়নের রাতইলে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে চলছে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ।
২০ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড তরঙ্গের (স্পেকট্রাম) নিলাম আটকে গেছে। পরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্রে একমাত্র গ্রামীণফোনের অংশ নেওয়া ও অন্যান্য অপারেটরের সরে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
১৯ জানুয়ারি ২০২৬