মির্জা ফখরুলের আসনে মেয়ে-ভাই আলোচনায়, জামায়াতেরও সুযোগ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঠাকুরগাঁও

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপি দলীয় রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে তাঁর সংসদীয় ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই আসনে দলের সাবেক মহাসচিবের উত্তরসূরি খুঁজছে বিএনপি।

মির্জা ফখরুল স্ট্রিমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বড় মেয়ে শামারুহ মির্জার রাজনৈতিক আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বড় ভাইয়ের সঙ্গে তৃণমূল আঁকড়ে থাকা জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনও রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বিএনপি কাকে বেছে নেয়, তা দেখার। তবে উপনির্বাচনে নতুন সুযোগ দেখছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে হেরে গেলেও, সোয়া লাখের বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মির্জা ফখরুল প্রায় ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। পরে তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে উপনির্বাচনে এই আসনে বিএনপির জয় পাওয়া এতটা সহজ হবে না বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এখানে মির্জা ফখরুল আগেও হেরেছেন। ২০০৮ সাল থেকে তো আসনটি বিএনপির হাতছাড়া। অতীতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীও জয় পেয়েছেন। বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু এবং তরুণ ভোটার হিসাব পাল্টে দিতে পারেন। এজন্য প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী স্ট্রিমকে জানান, উপনির্বাচন দল যাঁকে যোগ্য মনে করবে, তাঁর পক্ষে সবাই কাজ করবেন। প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মির্জা পরিবারের দুই সদস্য এগিয়ে। মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জাকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি তুলছেন নেতাকর্মীরা। আবার জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনের পক্ষেও শক্ত আলোচনা রয়েছে।’

জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফুরাতুন নাহার প্যারিস বলেন, ‘ভোটারদের কাছে যাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাঁকে প্রার্থী করলে বিএনপির জয় সহজ হবে।’ তিনি শামারুহ মির্জাকে এগিয়ে রাখছেন বলে জানান।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজু আহমেদ বলেন, ‘মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অনেক কিছুই এখনো বাকি। তাঁর পরিবার থেকেই হয়তো প্রার্থী দেওয়া হবে। এখন দেখার, কে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার যোগ্য। আশা করছি, তৃণমূল সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।’

ভাইয়ের বিকল্প হতে চান মির্জা ফয়সাল

ভাই মির্জা ফখরুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন মির্জা ফয়সাল আমিন। জেলা বিএনপির সভাপতিও তিনি। স্থানীয় রাজনীতিতে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ভাই ছেড়ে দিলে তাই দলের হয়ে এই আসনে লড়তে চান মির্জা ফয়সাল।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে তিনিও দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করেছেন। ঠাকুরগাঁও সম্ভাবনাময় জেলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। সুযোগ পেলে তাই জনগণের সেবা করতে চান।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মূল বিজয় প্রার্থীর নয়, ভোটারের। ভোটাররা যদি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই হবে কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

জামায়াতের দেলাওয়ারও প্রস্তুত

গত নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপক্ষেও লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন। এবার উপনির্বাচন হলে সেই ভোটব্যাংক কাজে লাগাতে চান তিনি।

ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি ঠাকুরগাঁও উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ঠাকুরগাঁওবাসী অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাসন দেখেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠেনি।

নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে জয়ী হবেন দাবি করে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এরই মধ্যে তিনি বিভিন্ন ইউনিয়নে জনসংযোগ শুরু করেছেন।

সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোট

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটের হিসাব বরাবরই জটিল। এখান থেকে জামায়াত ছাড়া সব বড় দলের প্রার্থীই সংসদ সদস্য হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির খাদেমুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী এবং ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলাম এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৯৬ সালে বিএনপির ছয় মাসের সরকারে প্রথমবার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। তবে ওই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলামের কাছে হারেন তিনি। ১৯৯৭ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেন এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনে আবার জয় পান মির্জা ফখরুল। এরপর ২০০৮ থেকে টানা চার সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেন জয় পান।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আসনে ‘এক্স ফ্যাক্টর’ মূলত সংখ্যালঘু ভোটার। ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬০৯ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজারই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এ ছাড়া তরুণ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। তাদের সিদ্ধান্তও ভোটের ফলে প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।

তারা জানান, প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরই সমীকরণ স্পষ্ট হবে। বিএনপি যদি মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখতে পারে, আর জামায়াত যদি গত নির্বাচনের ভোটকে আরও সংগঠিত করতে পারে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক ভোটযুদ্ধই দেখা যাবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত