জ্যোতি রহমানের সাক্ষাৎকার

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আস্থার সংকট

জ্যোতি রহমান; অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ম্যাক্রো-ফিসক্যাল বিশেষজ্ঞ। তিনি মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতি, ফিসক্যাল পলিসি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখির জন্য পরিচিত। দেশের বর্তমান অর্থনীতির চিত্র, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বাজেট বাস্তবায়ন, অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ৫০
জ্যোতি রহমান। ছবি : ঢাকা স্ট্রিম

স্ট্রিম: বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির অবস্থাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এটি কি স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে, নাকি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়ে গেছে?

জ্যোতি রহমান: বর্তমান অর্থনীতিকে আমি পুরোপুরি ভঙ্গুর বলব না, তবে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা এখনো আসেনি। এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। এই সংকটকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক।

দেশীয় আস্থার সংকট মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে। একজন ব্যবসায়ী আগামী দুই, পাঁচ বা দশ বছর পর তার ব্যবসার পরিস্থিতি কেমন হবে, সেই নিশ্চয়তার অভাবে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচন হয়ে গেলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার হাত ধরে অর্থনীতিতেও স্থিতিশীলতা আসবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হয়তো কিছুটা এসেছে, কিন্তু তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে যথেষ্ট হচ্ছে না।

এর পেছনে বৈশ্বিক কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের মতো ‘এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর’ যেমন কাজ করছে, তেমনি ‘ইন্টার্নাল ফ্যাক্টর’ বা অভ্যন্তরীণ কারণও রয়েছে। অভ্যন্তরীণ কারণটি হলো ‘নীতিগত অনিশ্চয়তা’। নতুন সরকার বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা হয়তো তা এখনো পরিষ্কারভাবে বুঝে উঠতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা আস্থার অভাবে বিনিয়োগ না করলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, আর কর্মসংস্থান না হলে মানুষের আয়-রোজগারও বাড়বে না।

স্ট্রিম: দেশীয় বিনিয়োগকারী ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়টি স্পষ্ট হলো। শুরুতে আপনি আন্তর্জাতিক আস্থার সংকটের কথাও বলেছিলেন, সেই জায়গাটিতে আসলে পরিস্থিতি এখন কেমন?

জ্যোতি রহমান: আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট বেশ প্রকট। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক সরকারের শাসন পরিচালনাকে অত্যন্ত প্রশংসার চোখে দেখছেন। কিন্তু এর বিপরীতে সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তারা এখনো সন্দিহান। জ্বালানি খাত কীভাবে চলবে, ব্যাংকিং খাতের সংকট কীভাবে মিটবে কিংবা একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে—এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদাররা এখনো কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাননি। নীতিনির্ধারকদের কাছে হয়তো পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু তা এখনো দৃশ্যমান নয়। তাই আমি বলব, অন্যান্য হাজারো সমস্যার চেয়ে আস্থার সংকটটিই এখন সবচেয়ে প্রকট। এই সংকটগুলো মেটাতে পারলেই আমরা প্রকৃত স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে পারব।

স্ট্রিম: দেশের অর্থনীতিতে অন্যান্য সংকটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সরকার পরিবর্তনের পরও এটি টেকসইভাবে কমানো যাচ্ছে না কেন? আমরা কি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছি না?

জ্যোতি রহমান: এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। অনেকেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের দুর্বলতার কথা বলেন। বিগত পতিত সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তথ্যে ঘাটতি থাকার দাবিটি অমূলক নয়। কিন্তু তাই বলে মূল্যস্ফীতি যে ঘটছে না, এমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ বাজারে গেলেই এর উত্তাপ টের পাচ্ছেন।

মূল্যস্ফীতিকে মূলত দুটি ভাগে দেখা যায়—খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বা সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন, আবহাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। সরকার এই সরবরাহ ব্যবস্থা মোটামুটি ভালোভাবে সামলাতে পারছিল বলেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি একপর্যায়ে কমে আসছিল। সম্প্রতি যেটুকু বেড়েছে, তা মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা ইরান যুদ্ধের প্রভাব।

যেকোনো পরিকল্পনায় কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা জরুরি, নইলে বড় লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। কিন্তু এই মুহূর্তের প্রধান সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার হয়তো সংকট উত্তরণের বিষয়ে নিজেরা স্পষ্ট, কিন্তু তারা সেই রূপরেখাটি মানুষের বা বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারছে না।

তবে আসল সমস্যাটা হচ্ছে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি সরাসরি প্রভাব ফেলে। এখানেই একটি বড় ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে (মার্চের ডেটা অনুযায়ী মাত্র ২.২%) থাকা সত্ত্বেও তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ জন্য তারা সুদের হার বেশি রাখার ঘোষণাও দেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘোষণার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে জানায় যে, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সুদের হার এবং আমানতের সুদের হারের মধ্যে ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এর ফলে বাস্তবে যা হলো—ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার না বাড়িয়ে উল্টো ঋণের সুদহার কমিয়ে দিল।

অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাগজে-কলমে বলছে তারা সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ের প্রসার ঘটাতে ও ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ঋণের সুদহার কমানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। অর্থনীতিতে তো একসঙ্গে দুটি বিপরীতমুখী পদক্ষেপ সফল হতে পারে না। অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি হয়তো বলতাম যে, এই মুহূর্তে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব নীতিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই পথে হাঁটতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসার প্রসার—দুটিই করতে চাইছে, যা অসম্ভব। নীতি-নির্ধারকদের এই সদিচ্ছায় আমার সন্দেহ নেই, কিন্তু তাদের এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণেই মূলত ‘নীতিগত অনিশ্চয়তা’ তৈরি হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্ট্রিম: সম্প্রতি আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে পে-স্কেল বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকা এবং রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আলাদা করার মতো সংস্কারের কথা রয়েছে। আইএমএফের এসব শর্ত এবং বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অবস্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আমরা কি সঠিক পথে এগোচ্ছি?

জ্যোতি রহমান: আইএমএফের ভূমিকাটা আসলে অনেকটা চিকিৎসকের মতো। একটি দেশ সাধারণত দুটি কারণে আইএমএফের কাছে যায়। প্রথমত, যখন দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে—যেমন রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়া বা মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় সামষ্টিক অর্থনীতি ভালো থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে আইএমএফের কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। এটি অনেকটা চিকিৎসকের কাছ থেকে 'ক্লিন বিল অব হেলথ' বা সুস্থতার সনদ নেওয়ার মতো।

এখন কোনো নির্বাচিত সরকার যদি পূর্বপ্রস্তুতি বা যথাযথ হোমওয়ার্ক ছাড়া আইএমএফের কাছে যায় এবং পরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা জনঅসন্তোষের ভয়ে তাদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না করে, তবে তা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। ধরুন, আমাদের অর্থনীতির অবস্থা হয়তো ততটা খারাপ নয়, ব্যাংকিং খাত বা রাজস্ব নীতি নিয়ে সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনাও রয়েছে। সেই জায়গা থেকে সরকার হয়তো ভেবেছিল আইএমএফের কাছে গেলে একটি ইতিবাচক সনদ পাওয়া যাবে। কিন্তু আইএমএফ যখন কিছু নির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেয় এবং সরকার তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আন্তর্জাতিক মহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বার্তা যায়।

তখন রেটিং এজেন্সি, বিদেশি বিনিয়োগকারী বা উন্নয়ন সহযোগীদের মনে হয়—সরকার আসলে সংস্কারের বিষয়ে আন্তরিক নয় এবং তাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি নেই। এর ফলে অর্থনীতিতে আস্থার সংকট আরও বাড়ে। আমরা বর্তমান পরিস্থিতি থেকে কীভাবে স্থিতিশীলতায় পৌঁছাব, সেই রূপরেখাটি এখনো পরিষ্কার নয়। এখানেই বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

স্ট্রিম: আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার করে যাবে, যা তারা নির্বাচিত না হওয়ায় হয়তো পুরোপুরি পারেনি। গত ছয় মাসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার কি অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহী বলে আপনার মনে হয়েছে?

জ্যোতি রহমান: প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়ে বলি। তারা সত্যিকার অর্থেই একটি 'আপৎকালীন' সরকার হিসেবে চমৎকার দায়িত্ব পালন করেছে। তারা মূলত তাৎক্ষণিক সংকটগুলো অত্যন্ত সফলভাবে সামাল দিয়েছে। রিজার্ভের পতন ঠেকানো, ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের আস্থার সংকট রোধ করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধস ঠেকানোর ক্ষেত্রে তারা বেশ সফল। এ জন্য আমি তাদের বেশ ভালো নম্বর দেব।

তবে তারা দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই কোনো সংস্কার কাজে হাত দেয়নি। তারা বিগত সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং ব্যাংকিং খাতে অধ্যাদেশ জারি করেছে—কিন্তু বাস্তবায়নের দিকে যায়নি। আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, তারা সচেতনভাবেই এটি করেছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর ফলে অর্থনীতিতে কেউ লাভবান হয়, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভার তারা নির্বাচিত সরকারের জন্যই রেখে গেছে।

২০১৬-১৭ সালের পর বিগত পতিত সরকার ব্যাপক লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে এবং টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানোর ধ্বংসাত্মক পথে হাঁটে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার সেই পথে যাবে না। তারা আমাদের সেই পুরোনো মডেলেই ফিরে যাবে, যেখানে আয় অনুযায়ী ব্যয় কমানো হবে। এর ফলে সরকারের অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা হয়তো পূর্ণতা পাবে না। কিন্তু অন্তত বিগত সরকারের আমলের মতো টাকা ছাপানো, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বা অর্থপাচারের মতো ভয়ংকর পরিণতিগুলো এড়ানো যাবে।

এখন বর্তমান নির্বাচিত সরকারের এই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। সরকারের সদিচ্ছা বা প্রতিশ্রুতির কোনো অভাব নেই বলে আমি মনে করি। আগামী ৫, ১০ বা ২০ বছর পর তারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চায়, সেই দর্শন বা ভিশন তাদের ইশতেহার ও পরিকল্পনায় স্পষ্ট। কিন্তু মূল সংকটটা হলো বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথনকশায়। কিন্তু, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা জানা গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে স্থিতিশীল করা হবে, তার সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা সরকার এখনো দেখাতে পারেনি।

স্ট্রিম: অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকটের জায়গা হলো ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। মানুষের বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মূল ভরসা এই খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে আমরা কি সঠিক পথে হাঁটছি বলে আপনি মনে করেন?

জ্যোতি রহমান: আমরা আসলে এখনো হাঁটাই শুরু করিনি। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আমরা অন্তত তাৎক্ষণিক বড় কোনো বিপর্যয় বা 'ব্যাংক রান' (সব গ্রাহক একসাথে টাকা তুলতে আসা) এড়াতে পেরেছি। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার উভয়েই এই ক্ষেত্রে সফল। কিন্তু সংকট সমাধানের মূল পথে আমরা এখনো যাইনি।

ব্যাংকিং খাতের এই সংকট সমাধানে সরকারকে মূলত তিনটি বিষয়ে পরিষ্কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির দায় কে নেবে? কোনো ম্যাজিক দিয়ে এই ক্ষতি পূরণ হবে না। যারা ব্যাংক লুট করে পালিয়েছে, তাদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে এমন অপরাধের জন্য ‘লাইসেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। দ্বিতীয়ত, আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমানতকারীরা টাকা না পেলে ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা পুরোপুরি ধসে পড়বে। তৃতীয়ত, ক্ষতির সমন্বয় বা 'হেয়ার কাট' কীভাবে হবে? এই দায় কি শেয়ারহোল্ডাররা নেবে, নাকি সাধারণ করদাতাদের টাকায় বেইলআউট করা হবে?

আমাদের দেশে আশির দশক থেকে শুরু করে ৯৬ ও ২০০৩ সালেও ব্যাংকিং কমিশন বা কমিটি গঠন করে সফলভাবে কাজ করার ইতিহাস আছে। তাই আমি মনে করি না আমাদের টেকনিক্যাল বা কারিগরি সমাধানের কোনো অভাব আছে। ঘাটতিটা হলো রাজনৈতিক স্পষ্টতার। সরকারকে আগে রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা এই ক্ষতি কীভাবে সামাল দেবে।

স্ট্রিম: এবার বাজেটের প্রসঙ্গে আসি। ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। যেখানে গত বছর বড় ঘাটতি ছিল, সেখানে এবারের এই বাজেট কি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য?

জ্যোতি রহমান: এই বাজেটকে আমি তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব। প্রথমত, আমরা যদি গত জানুয়ারিতে আইএমএফের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার সাথে তুলনা করি, তবে এই বাজেট আসলে কম উচ্চাভিলাষী। আইএমএফের ওই প্রোগ্রামে রাজস্ব, ব্যয় ও ঘাটতির যে লক্ষ্য ছিল, বাজেটে তার চেয়ে কমই ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাজেটটি বাস্তবসম্মত কি না? সম্ভবত না। বাজেটে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, অথচ আমাদের বর্তমান প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২ শতাংশ। বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে এত বড় লাফ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রবৃদ্ধি না বাড়লে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসবে না, আর রাজস্ব না এলে সরকার খরচ করবে কীভাবে?

তৃতীয়ত, তাহলে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে? বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নে ৪০ বছরের একটি ঐতিহাসিক ধারা আছে। ২০১৬-১৭ সালের আগ পর্যন্ত আমরা দেখেছি, সরকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে নিজেদের ব্যয় কমিয়ে দিত। প্রথমে উন্নয়ন বাজেট কমানো হতো, এরপর অন্যান্য খাতের কেনাকাটা বা প্রশিক্ষণের মতো খরচগুলো কাটছাঁট করা হতো। ফলে ঘাটতি সীমার মধ্যেই থাকত এবং টাকা ছাপানোর প্রয়োজন হতো না।

আমাদের মোট রাজস্বের বিশাল অংশ আসে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক) থেকে, যার চাপ মূলত সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর পড়ে। অথচ তাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা খুবই সীমিত। অন্যদিকে, সমাজের উচ্চবিত্ত বা এলিট শ্রেণি—যাদের কর দেওয়ার প্রকৃত সক্ষমতা আছে—তারা রাষ্ট্রকে যথাযথ কর দেন না। এই সক্ষম শ্রেণিকে যতক্ষণ পর্যন্ত বোঝানো না যাবে যে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, ততক্ষণ রাজস্ব আদায় বাড়বে না। আর রাজস্ব না বাড়লে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থও থাকবে না।

কিন্তু ২০১৬-১৭ সালের পর বিগত পতিত সরকার ব্যাপক লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে এবং টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানোর ধ্বংসাত্মক পথে হাঁটে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার সেই পথে যাবে না। তারা আমাদের সেই পুরোনো মডেলেই ফিরে যাবে, যেখানে আয় অনুযায়ী ব্যয় কমানো হবে। এর ফলে সরকারের অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা হয়তো পূর্ণতা পাবে না, যা খুব একটা ভালো লক্ষণ নয়। কিন্তু অন্তত বিগত সরকারের আমলের মতো টাকা ছাপানো, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বা অর্থপাচারের মতো ভয়ংকর পরিণতিগুলো এড়ানো যাবে।

স্ট্রিম: বাজেটের সময় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে 'থ্রি-আর' (পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন) কৌশলের কথা বলা হয়েছিল। এই নীতি কাঠামোকে আপনি কতটা বাস্তবসম্মত মনে করেন?

জ্যোতি রহমান: আমি মনে করি এটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত একটি কাঠামো। তবে এটি সফল হতে হলে সবার আগে ওই 'আস্থার সংকট' দূর করতে হবে। যেকোনো পরিকল্পনায় কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা জরুরি, নইলে বড় লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। কিন্তু এই মুহূর্তের প্রধান সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার হয়তো সংকট উত্তরণের বিষয়ে নিজেরা স্পষ্ট, কিন্তু তারা সেই রূপরেখাটি মানুষের বা বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারছে না।

স্ট্রিম: সরকারকে ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ধার করতে হচ্ছে। এদিকে রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও হতাশাজনক। রাজস্ব খাতের মূল সমস্যাটা আসলে কোথায়?

জ্যোতি রহমান: রাজস্ব আদায়ের মূল সমস্যাটি কেবল কারিগরি (যেমন: ডিজিটাইজেশন বা করের হার পরিবর্তন) নয়, এর শেকড় মূলত 'রাজনৈতিক অর্থনীতি' বা পলিটিক্যাল ইকোনমির গভীরে প্রোথিত।

আমাদের মোট রাজস্বের বিশাল অংশ আসে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক) থেকে, যার চাপ মূলত সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর পড়ে। অথচ তাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা খুবই সীমিত। অন্যদিকে, সমাজের উচ্চবিত্ত বা এলিট শ্রেণি—যাদের কর দেওয়ার প্রকৃত সক্ষমতা আছে—তারা রাষ্ট্রকে যথাযথ কর দেন না। এর কারণ হলো, তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে তেমন কোনো সেবা নেন না। তাদের সন্তানরা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে না, তারা সরকারি হাসপাতাল বা সাধারণ গণপরিবহন ব্যবহার করেন না। রাষ্ট্রের কাছে তাদের মূলত একটাই চাওয়া ছিল—'নিরাপত্তা'। বিগত হাসিনা সরকার তাদের সেই নিরাপত্তাই নিশ্চিত করেছিল এবং বিনিময়ে এলিটরা সরকারের সব অন্যায় মেনে নিয়েছিল। এটি ছিল একটি অলিখিত চুক্তি বা 'ডেভিলস বার্গেন'।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেই চুক্তির অবসান ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু উচ্চবিত্তের মানসিকতা বদলায়নি। সক্ষম শ্রেণিকে যতক্ষণ পর্যন্ত বোঝানো না যাবে যে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, ততক্ষণ রাজস্ব আদায় বাড়বে না। আর রাজস্ব না বাড়লে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থও থাকবে না।

স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বেকারত্ব। সেই জায়গা থেকে কর্মসংস্থান তৈরিতে বাজেটে কি সঠিক দিকনির্দেশনা আছে?

জ্যোতি রহমান: বাজেটে মধ্যমেয়াদি দিকনির্দেশনা আছে ঠিকই, কিন্তু কর্মসংস্থান তো সরাসরি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিনিয়োগের জন্য যে আস্থার পরিবেশ দরকার, সেটি এই মুহূর্তে দেশে নেই।

স্ট্রিম: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকার কতটা কার্যকর নীতিগত সংকেত দিতে পারছে বলে মনে করেন?

জ্যোতি রহমান: সরকার আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করছে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব প্রাচীন ও জটিল নিয়মকানুন ছিল, সেগুলো সংস্কারের চেষ্টা চলছে। মূলধনি বাজার ও বন্ড মার্কেট গোছানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছা বা নিয়তে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মূল সমস্যাটি রয়ে গেছে কমিউনিকেশনে। সরকারের চূড়ান্ত রূপরেখা কী এবং তারা ঠিক কীভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চাইছে, সেই বার্তাটি এখনো বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

স্ট্রিম: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে যে চুক্তিটি করেছে, তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এটি কি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে?

জ্যোতি রহমান: বিষয়টি বুঝতে হলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০১১ সাল পর্যন্ত যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, বাংলাদেশ তা থেকে বেশ লাভবান হয়েছিল—তা গার্মেন্টস খাত, রেমিট্যান্স বা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের মাধ্যমেই হোক না কেন। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মার্কিন নীতি এখন এতটাই পরিবর্তনশীল যে সকালে একরকম তো বিকেলে আরেকরকম। অন্যদিকে, চীন এখন অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড় শক্তি, যদিও তারা গণতান্ত্রিক নয়। আবার গত ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে বা আদৌ সেটি 'উইন-উইন' হবে কি না, তা নিয়েও এখন নতুন করে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

আমাদের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে প্রায় দেড় শতাংশ, সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে। আগামী ১০ বছরে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর এই ইস্যুটি আমরা যদি সঠিকভাবে সামলাতে না পারি, তবে তা আমাদের জন্য মারাত্মক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের জন্ম দেবে।

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তিটিকে আমি দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিষয় হিসেবে দেখছি না। বরং এটি ছিল মূলত একটি 'ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট' বা সংকট মোকাবিলার কৌশল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতাকালে আমাদের গার্মেন্টস খাতের ওপর যেন কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না আসে, সেটি ঠেকানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। সেই দিক থেকে এটি একটি সফল পদক্ষেপ।

তবে এখন যেহেতু দেশে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার আছে, তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা দেখেছি, ট্রাম্প যতটা গর্জন করেন, ততটা বর্ষণ করেন না। তাই এখন আমাদের বহুমাত্রিক বিশ্বের কথা মাথায় রেখে নীতি সাজাতে হবে। চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং 'গ্লোবাল সাউথ'-এর দেশগুলোর সঙ্গে আমরা কীভাবে যুক্ত হব, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ চাইলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য একটি আদর্শ বা উদাহরণ হতে পারে। আমাদের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার প্রক্রিয়া অন্যান্য দেশ শিখতে পারে। এছাড়া আমাদের 'সফট পাওয়ার' বা সৃজনশীল অর্থনীতির (যেমন: নাটক বা সংস্কৃতি) যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে সেটি দেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে।

স্ট্রিম: আগামী এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এবং সবচেয়ে বড় আশাবাদ কী?

জ্যোতি রহমান: সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি দিয়ে শুরু করি। আমরা সবসময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তারুণ্যের শক্তির কথা বলি। কিন্তু আমরা সামাজিকভাবে যে খুব দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছি, তা নিয়ে কেউ সেভাবে ভাবছি না। অথচ প্রতিটি পরিবারেই এটি দৃশ্যমান। আমাদের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে প্রায় দেড় শতাংশ, সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে। আগামী ১০ বছরে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর এই ইস্যুটি আমরা যদি সঠিকভাবে সামলাতে না পারি, তবে তা আমাদের জন্য মারাত্মক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের জন্ম দেবে।

আর আশাবাদের জায়গাটি হলো, আমাদের সমাজ অসম্ভব রকম 'রেসিলিয়েন্ট' বা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভয় পেতাম যে শেখ হাসিনার পতন হলে দেশের কী অবস্থা হবে! আইয়ুব খান বা এরশাদের পতনের পর ক্ষমতার হস্তান্তর ছিল বেশ গোছানো এবং প্রটোকল মেনে। কিন্তু এবার শেখ হাসিনা শুধু নিজেই হেলিকপ্টারে পালাননি, তার সাথে পুরো ক্যাবিনেট, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিবও পালিয়েছেন! এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি 'স্টেট কলাপস' বা রাষ্ট্রের ধসে পড়া।

অন্যান্য দেশে এভাবে রাষ্ট্রের পতন হলে রাস্তায় ব্যাপক রক্তপাত বা খুনাখুনি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয়নি। রাষ্ট্র যখন অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, তখন সমাজ নিজেই ঢাল হয়ে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে আমরা হয়তো খুব একটা আলোচনা করি না, কিন্তু আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য এটিই আমার সবচেয়ে বড় আশাবাদ।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

জ্যোতি রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত