বিদ্যুৎ বৈষম্য দূর ও সংস্কার জরুরি

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ২৩: ০৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দুঃখজনক বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন– লোডশেডিং নেই বললেই চলে; অন্যদিকে গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। হালে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লোডশেডিংয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ‘অস্বীকারের সংস্কৃতি’ এবং শহর-গ্রামের মধ্যকার প্রকট বিদ্যুৎ-বৈষম্য আগাগোড়াই অন্যায্য। এটি রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়নের অন্তরায়ও বটে। 

গ্রামে লোডশেডিংয়ের পেছনে রয়েছে বহুমুখী ব্যর্থতা। পিডিবির প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া এবং জ্বালানি সংকটে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না। বাঁশখালী, রামপাল ও বড়পুকুরিয়ার মতো কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তার পুরোটা চাপানো হচ্ছে গ্রামীণ গ্রাহকদের ওপর। এর পেছনে যুক্তি আসলে কী, তা বোধগম্য নয়। 

বোধগম্য বিষয়টি হচ্ছে, এই সংকটের আড়ালে আছে গভীর কাঠামোগত শোষণ ও বৈষম্য। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) মধ্যকার দ্বৈত শাসনব্যবস্থা এই খাতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। আরইবি তদারকি ও কেনাকাটার দায়িত্বে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সরাসরি সেবা দেয় সমিতিগুলো। অভিযোগ রয়েছে, আরইবির সরবরাহ করা নিম্নমানের সরঞ্জাম ও ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ৬৮ শতাংশ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। অথচ গ্রাহক যখন ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামেন, তখন বলির পাঁঠা হন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাধারণ কর্মীরা। এদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি লাইনম্যান প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের নিরাপত্তা কিংবা ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে কিন্তু রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই। 

এই বৈষম্যের প্রতিবাদে এবং আরইবি-পিবিএস একীভূতকরণের দাবিতে পল্লী বিদ্যুতের ৪৬ হাজার কর্মী অভিনব প্রতিবাদ শুরু করেছেন। প্রতিদিন এক ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করে তাঁরা জাতীয় উৎপাদনে অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে নিজেদের অধিকারের দাবিও জানাচ্ছেন। দুঃখজনক হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিটির সুপারিশ কিংবা ৪৬ জন চাকরিচ্যুত কর্মীকে পুনর্বহালের নির্দেশনা—কোনোটিই আরইবি বাস্তবায়ন করেনি। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যেতে পারে, সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিদ্যুৎ খাতের এই অরাজকতা দূর করতে সবার আগে জ্বালানি সংকট সমাধান করতে হবে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সুষ্ঠুভাবে তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে ক্যাব—সব পক্ষই আরইবি ও সমিতির মধ্যকার এই দ্বৈত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একীভূতকরণের সুপারিশ করেছে। একটি আধুনিক ও আবহাওয়া-সহনশীল বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, গ্রামের গ্রাহকদের অন্ধকারে রেখে এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শোষণ করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অবিলম্বে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল এবং আরইবি-পিবিএস একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরু করাই হবে সঠিক পদক্ষেপ। অন্যথায় পুঞ্জীভূত এই জন-অসন্তোষ বড় ধরনের সামাজিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের অতিরিক্ত সক্ষমতার কথা সবার জানা। এ অবস্থায় বিশেষত বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে গ্রামের মানুষ ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে। এটা মাথায় রেখে বিদ্যুতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাটাও জরুরি ছিল না কি?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত