কয়লার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য পথেই থাকতে হবে

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার ফুলবাড়ীসহ অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছে।
নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে আসা এ ধরনের বক্তব্য স্পর্শকাতর বলে বিবেচিত হতে পারে। ফুলবাড়ীর মানুষ জানেন, এটি তাঁদের ভিটামাটি, কৃষিজমি, পানির উৎস তথা অস্তিত্বের প্রশ্ন। এ ইস্যুতে পূর্বসূরি বিএনপি সরকার ২০০৬ সালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে চুক্তি করে এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল—এই মাটিতে আর কখনো উন্মুক্ত খনন হবে না।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিরাট সমাবেশে বিডিআরের গুলিতে প্রাণ গিয়েছিল তিনজনের। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর তৎকালীন সরকার চুক্তি সই করে। চুক্তির শর্ত ছিল, ফুলবাড়ীসহ দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হবে না; এশিয়া এনার্জিকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
সেই চুক্তির অনেক শর্ত এখনো অবাস্তবায়িত। এশিয়া এনার্জি নাম বদলে জিসিএম রিসোর্সেস হয়ে এখনো তৎপর। এ অবস্থায় পুনরায় উন্মুক্ত খননের পক্ষে বক্তব্য দেওয়াটা পুরনো সংকটের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারে। এটা ফুলবাড়ীর বেদনাদায়ক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হওয়া চুক্তির বরখেলাপ বলেও বর্ণিত হতে পারে।
দেশ বড় জ্বালানি সংকটে আছে, সন্দেহ নেই। গ্যাসভিত্তিক থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি জোর দিতে হচ্ছে সরকারকে, সেটাও জানা। বছরে ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন টন কয়লার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র সাড়ে সাত লাখ টন। বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। উন্মুক্ত খনন চালু হলে বছরে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এর আড়ালে যে মূল্য দিতে হবে, তার হিসাবও তো কষতে হবে।
ফুলবাড়ীর কয়লার স্তরের ওপরে রয়েছে ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। উন্মুক্ত খনন করতে হলে সেই পানির স্তর শূন্য করতে হবে। যার ফলে আশপাশের ৩১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার নলকূপ ও পাম্প থেকে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থায় নেমে আসবে ধস।
সরকার নিয়োজিত একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি অনেক আগেই এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছে। এশিয়া এনার্জির নিজস্ব হিসাবেও অন্তত ৫৪ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করতে হবে। অন্য কমিটির মতে, সংখ্যাটি ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় খনন কোম্পানি বিএইচপি ফুলবাড়ীর কয়লা আবিষ্কার করেও এখানে খনন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা বুঝেছিলেন, এই ভূতাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতায় উন্মুক্ত খনন অনুপযোগী।
এশিয়া এনার্জির উত্তরসূরি জিসিএম রিসোর্সেসের কাছে এখন কোনো কার্যকর লাইসেন্স নেই। তবুও তারা ফুলবাড়ীর সম্পদ দেখিয়ে লন্ডনের শেয়ারবাজারে কোটি কোটি পাউন্ড তুলছে। কয়লা না তুলেই কোম্পানিটি লন্ডনের বিনিয়োগকারীদের কাছে সেটি ‘বিক্রি’ করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। সরকারি পর্যায় থেকে ইতিবাচক বক্তব্য এই শেয়ার কারবারকে আরও চাঙা করলে হয়তো বিব্রতকর প্রশ্নও উঠবে।
জ্বালানি সংকটের সমাধান জরুরি বৈকি। কিন্তু সেটি বাড়িঘর উজাড় করে, কৃষিজমি ধ্বংস করে এবং পানির উৎস বিপন্ন করে হতে পারে না। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে কয়লাখনির দেখা মিললেও আর সেগুলো থেকে উত্তোলনের চাহিদা থাকলেও গ্রহণযোগ্য পথেই সরকারকে এগোতে হবে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়াটাই এ ক্ষেত্রে সঠিক পথ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
.png)


