নির্বাচন, কমিশন ও বিপ্লবের রূপান্তর: একটি অস্বস্তিকর সময়ের নোট

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩১
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

একটি নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়। একটি নির্বাচন আসলে রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সেই পরীক্ষার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর পরীক্ষকের নাম-নির্বাচন কমিশন। গত কয়েক দিনে যা ঘটছে, তা বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়। এগুলো একটি প্রবণতা। এগুলো একটি বিপদের ইঙ্গিত।

রোববার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পোস্টাল ব্যালট। পক্ষপাতের অভিযোগ। আর ভেতরে ভেতরে আপিল শুনানি। এই দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু মাত্রা নতুন। একদিকে কমিশন আপিল শুনানি শেষ করছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো হুঁশিয়ারি দিচ্ছে ‘অ্যাকশনের’। এই দ্বন্দ্ব শুধু রাজনৈতিক নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক।

৭২৩টি মনোনয়ন বাতিল। তারপর ৪১৭টি ফেরত। এই সংখ্যাগুলো কোনো সাধারণ ভুল নয়। এটি একটি বিশাল প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবি। প্রশ্নটা সোজা। রিটার্নিং কর্মকর্তারা কি আইন বোঝেন না? নাকি কমিশনের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ছিলই দুর্বল? যদি প্রথমটি হয়, তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাই নড়বড়ে। আর যদি দুটোই হয়—তাহলে সংকট গভীর। আইন কি নমনীয়, নাকি ক্ষমতাবান?

একজন প্রার্থী। ঋণখেলাপির মামলা। ব্যাংক আদালতে উপস্থিত। তবুও প্রার্থী বৈধ। এই দৃশ্য কি কেবল আইনি ব্যাখ্যার ফল? নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত? আইন যদি এমন হয় যে ব্যাংক সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও খেলাপি ‘খেলাপি’ থাকে না, তাহলে আইনের ভাষা আর নাগরিকের অভিজ্ঞতা এক নয়। এই ফাঁকটাই বিপজ্জনক।

আরও স্পষ্ট হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে। অভিযোগ ছিল অন্তত ২৪ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে। বাতিল হয়েছেন দুজন। বাকি সবাই টিকে গেছেন। একজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত। কাগজ দিতে বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভেতরের ভাষা বলছে, ‘নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনের বাইরে গিয়ে নমনীয়তা কিসের নাম?

আজ যদি দ্বৈত নাগরিকত্বে নমনীয়তা, কাল কি আরপিওতেও নমনীয়তা? পরশু সংবিধানেও? নমনীয়তার এই রাজনীতি রাষ্ট্রকে কোথায় নেয়—ইতিহাস তা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী বলছে, একই অপরাধে কেউ বাতিল, কেউ বৈধ। ঋণখেলাপি। দ্বৈত নাগরিকত্ব। একই অভিযোগ। ভিন্ন সিদ্ধান্ত। এটি যদি কাকতালীয় হয়, তাহলে সংখ্যাটা এত বড় কেন? আর যদি কাঠামোগত হয়, তাহলে ইসির নিরপেক্ষতার প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির অভিযোগ আরও কঠিন। তাদের ভাষায়, আপিল শুনানি ছিল নাটকের মতো। আইনি যুক্তির বাইরে আবেগ। চাপ। বাইরে হাজার হাজার মানুষ।

ভেতরে সিদ্ধান্ত। এই পরিবেশে যে রায় আসে, তা যত আইনসম্মতই হোক, তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

বিশ্বাসই তো নির্বাচনের মূলধন। আর সেই মূলধনই এখন ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। নির্বাচন কমিশন ঘেরাও। কর্মকর্তাদের বের হতে না দেওয়ার ঘোষণা। এই কৌশল কি আন্দোলনের নৈতিক উচ্চতা ধরে রাখে? রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি আসে নৈতিক বৈধতা থেকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বিপ্লব কখনো একদিনে ব্যর্থ হয় না। ব্যর্থতা আসে রূপান্তরে। হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, বিপ্লব তখনই বিপথে যায়, যখন আইন ও প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ‘উদ্দেশ্য’ বড় হয়ে ওঠে। থেডা স্কচপল দেখিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকলে বিপ্লব শেষ পর্যন্ত নতুন এক এলিট তৈরি করে। আর স্যামুয়েল হান্টিংটনের সতর্কতা ছিল স্পষ্ট—রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে, সেখানে জন্ম নেয় অস্থিতিশীলতা।

মব তৈরি হলে, চাপ তৈরি হলে, রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিক্রিয়াশীল হয়। তখন সংস্কারের দরজা বন্ধ হয়। খোলে কেবল শক্তির দরজা।

বিএনপি কি ছাত্রদলের এই কৌশলকে লাভজনক ভাবছে? নাকি এতে উল্টো বার্তা যাচ্ছে—যে প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ হতে বলা হচ্ছে, তাকেই ভয় দেখানো হচ্ছে? এই দ্বন্দ্ব খুব সূক্ষ্ম। ভুল করলে ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন আসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আর সেখানে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন। এই নির্বাচন কি ইসির এখতিয়ারে পড়ে? পড়ে না। তবুও কমিশন জড়িয়েছে। এটি নিছক একটি সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি নজির। নজির মানে ভবিষ্যতের দরজা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়। পরশু অন্য কোনো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।

রাষ্ট্রে যদি এখতিয়ার ঝাপসা হয়, তবে কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত হয়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ক্ষমতার অপব্যবহার।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বিপ্লব কখনো একদিনে ব্যর্থ হয় না। ব্যর্থতা আসে রূপান্তরে। হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, বিপ্লব তখনই বিপথে যায়, যখন আইন ও প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ‘উদ্দেশ্য’ বড় হয়ে ওঠে। থেডা স্কচপল দেখিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকলে বিপ্লব শেষ পর্যন্ত নতুন এক এলিট তৈরি করে। আর স্যামুয়েল হান্টিংটনের সতর্কতা ছিল স্পষ্ট—রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে, সেখানে জন্ম নেয় অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে। বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা আছে। সংস্কারের দাবি আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন—সেই ভার বহন করতে পারছে কি না, সেটিই এখন মুখ্য প্রশ্ন।

এই নির্বাচন কেবল একটি সংসদ গঠনের প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে আইন শক্তিশালী হবে, নাকি ‘নমনীয়তা’ শক্তিশালী হবে।

কমিশন যদি আজ আস্থাহীন হয়, আগামীকাল কোনো নির্বাচনই আস্থা ফেরাতে পারবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলো যদি চাপ আর মবের পথে হাঁটে, তাহলে বিপ্লবের স্বপ্ন রূপ নেবে আরেকটি হতাশায়।

ইতিহাস ক্ষমা করে না। বিশেষ করে তখন, যখন সুযোগ ছিল সঠিক পথে হাঁটার।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত