জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ: কৌশলগত পরিসর বাড়বে না কমবে?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

চীনের কাছ থেকে ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। একে শুধু বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের একটি সাধারণ ধাপ হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তৈরি প্রতিবেদনে বিমানগুলোর মূল্য, প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও রসদ সহায়তা, পূর্তকাজ, বীমা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে প্রস্তাবিত ক্রয়ের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ২.৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। প্রতিটি বিমানের মূল্য ৬২.৭ মিলিয়ন ডলার হলেও আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত হলে প্রতি বিমানের গড় ব্যয় প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

এখনো চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি; আলোচনার জন্য একটি খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই বিষয়টি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা, চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পর্ক, ভারতের নিরাপত্তা-ভাবনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের একটি সুস্পষ্ট সামরিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বহরের একটি বড় অংশ এখনো পুরোনো চীনা এফ-৭-এর ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক আকাশযুদ্ধ ক্রমেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত রাডার ও সেন্সর, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ এবং সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু পুরোনো বিমান প্রতিস্থাপন নয়, বরং সামগ্রিক আকাশযুদ্ধ সক্ষমতায় প্রজন্মগত পরিবর্তনও প্রয়োজন।

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জে-১০সিই একটি এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট, সব ধরণের আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যা দূরপাল্লায় একাধিক আকাশ লক্ষ্য মোকাবিলা এবং স্থলভাগে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম। ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘর্ষের পর বিমানটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্স-কে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানের জে-১০ যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল, যার অন্তত একটি ছিল রাফাল। পরে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ভারতীয় বিমান হারানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও পাকিস্তানের দাবি করা সংখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন।

অবশ্য একটি নির্দিষ্ট সংঘর্ষের ফলাফল দিয়ে কোনো যুদ্ধবিমানের সামগ্রিক সামরিক কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সমীচীন নয়। যুদ্ধের ফলাফল বিমান ছাড়াও পাইলটের দক্ষতা, গোয়েন্দা তথ্য, রাডার-সহায়তা, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। তারপরও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে জে-১০-এর ব্যবহার যে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিমানটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের একটি সুস্পষ্ট সামরিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বহরের একটি বড় অংশ এখনো পুরোনো চীনা এফ-৭-এর ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক আকাশযুদ্ধ ক্রমেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত রাডার ও সেন্সর, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ এবং সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কেবল কোন যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর—সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানও।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের গুরুত্ব শুধু তার সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার, বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং তাদের মধ্যে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতা একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে তার বস্তুগত শক্তির তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের সন্নিকটে অবস্থিত। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূল এবং ভারত মহাসাগরীয় নৌপথে বাংলাদেশের সরাসরি প্রবেশাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে। এই ভৌগোলিক অবস্থানই বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বকে তার সামরিক সক্ষমতার তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের আগে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তাঁর মার্কিন সিনেটের মনোনয়ন শুনানির লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে একটি উন্মুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বিচার করলে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপেক্ষিত থেকে যায়। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের সামনে এমন একটি কৌশলগত পরিসর উন্মুক্ত করেছে, যেখানে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই গভীর স্বার্থ রয়েছে।

ঠিক এখানেই জে-১০সিই ক্রয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্বটি নিহিত। এই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে পারে; আবার ভুলভাবে পরিচালিত হলে একই ক্রয় দীর্ঘমেয়াদে নতুন নির্ভরতাও সৃষ্টি করতে পারে।

যদি এই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করে, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের জন্য সামরিক চাপ প্রয়োগের ব্যয় বাড়ায় এবং কোনো বৃহৎ শক্তির নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভর না করেই বাংলাদেশ নিজের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে এটি বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো—নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য এমন কোনো একক বৃহৎ শক্তির ওপর নির্ভর না করা, যার বিনিময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীনতার একটি অংশ বিসর্জন দিতে হয়।

কিন্তু এর বিপরীত ঝুঁকিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধবিমান শুধু একটি উড়োজাহাজ নয়; এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, সফটওয়্যার, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ আধুনিকায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা যুক্ত থাকে। এসব ক্ষেত্রে যদি বাংলাদেশ একটি মাত্র সরবরাহকারী রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সামরিক সক্ষমতা বাড়লেও পররাষ্ট্রনীতিতে বিকল্পের পরিসর সংকুচিত হতে পারে।

অতএব, এখানে প্রকৃত লাভ-ক্ষতির হিসাব ‘চীন না পশ্চিম’—এই সরল দ্বৈততায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গিয়ে বাংলাদেশ কি একক সরবরাহকারীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের গুরুত্ব শুধু তার সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার, বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং তাদের মধ্যে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতা একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে তার বস্তুগত শক্তির তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে।

বাংলাদেশের অস্ত্র ক্রয়ের ইতিহাস এই প্রশ্নকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। এসআইপিআরআই-এর ২০১৫–১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র আমদানির প্রায় ৭২ শতাংশই এসেছিল চীন থেকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব ইতিহাসেও এমবিটি-২০০০ এবং এফএম-৯০ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির তথ্য রয়েছে। বিমানবাহিনীতে এফ-৭ ও কে-৮, নৌবাহিনীতে চীনা ফ্রিগেট, করভেট এবং দুটি মিং-শ্রেণির সাবমেরিন—সব মিলিয়ে চীনা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বাংলাদেশের সামরিক কাঠামোয় বহু আগেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

তাই জে-১০সিই ক্রয় বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন সূচনা নয়; বরং বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও উন্নত প্রযুক্তিগত স্তরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বহন করে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, প্রস্তাবিত ক্রয় প্যাকেজে প্রায় ৮৮৮ মিলিয়ন ডলার প্রশিক্ষণ, অপরিহার্য পরিচালন সরঞ্জাম, কারিগরি ও রসদ সহায়তা এবং পরিবহনের জন্য ব্যয় হওয়ার কথা রয়েছে। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়—আধুনিক যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল বিমানের মূল্যই সব নয়। একটি যুদ্ধবিমানকে কার্যকর রাখার জন্য যে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন, সেগুলোই দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার প্রকৃত কাঠামো তৈরি করে।

জে-১০সিই যদি বাংলাদেশের প্রধান সম্মুখসারির যুদ্ধবিমানে পরিণত হয়, তাহলে চীনা প্রযুক্তি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের বর্তমান নির্ভরতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই একটি আপাতবিরোধী বাস্তবতা দৃশ্যমান: যে যুদ্ধবিমান বাংলাদেশকে সামরিকভাবে অধিক সক্ষম করবে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতার নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।

ভারত এই ক্রয়কে শুধু বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর স্বাভাবিক আধুনিকায়ন হিসেবে দেখবে—এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়।

বাংলাদেশ ২০১৩ সালে চীন থেকে দুটি সাবমেরিন কেনার সিদ্ধান্ত নিলে ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবমেরিন সরবরাহের পর ভারতের কৌশলগত মহলের একটি অংশ বিষয়টিকে বঙ্গোপসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে।

ভারতের সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স-এর একটি বিশ্লেষণেও বঙ্গোপসাগরে চীনা জাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতিকে ভারতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তবে এই উদ্বেগের পাশাপাশি আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সিঙ্গাপুরের আরএসআইএস-এর একটি বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের সাবমেরিন সংগ্রহকে শুধু ভারত-চীন প্রতিযোগিতার আলোকে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়; বাংলাদেশের নৌবাহিনীর নিজস্ব আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

জে-১০সিই-এর ক্ষেত্রে ভারতের উদ্বেগ আরও তীব্র হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ একই ধরনের যুদ্ধবিমান পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ভারতবিরোধী না হলেও নিরাপত্তা-রাজনীতিতে শুধু একটি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; প্রতিবেশী রাষ্ট্র সেই সামরিক সক্ষমতাকে কীভাবে উপলব্ধি করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বিচার করলে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপেক্ষিত থেকে যায়। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের সামনে এমন একটি কৌশলগত পরিসর উন্মুক্ত করেছে, যেখানে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই গভীর স্বার্থ রয়েছে।

ঢাকার কাছে জে-১০সিই হতে পারে জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি উপকরণ। কিন্তু দিল্লির নিরাপত্তা-পরিকল্পনায় একই বিমানকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা সামরিক প্রযুক্তির আরও গভীর প্রবেশ হিসেবেও দেখা হতে পারে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক জে-১০ ব্যবহারের অভিজ্ঞতার কারণে ভারতীয় কৌশলগত মানসে বিমানটি শুধু একটি চীনা যুদ্ধবিমান নয়; এটি চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতার সঙ্গেও যুক্ত।

ফলে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার চেষ্টাও বাড়াতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, বাংলাদেশের চীনা অস্ত্র সংগ্রহ কখনো কখনো ভারতের বাংলাদেশমুখী প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে আরও সক্রিয় করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের একটি অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত শুধু তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাই পরিবর্তন করে না; এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর বাংলাদেশের প্রতি নীতি ও আচরণকেও প্রভাবিত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এ ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটি-তে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মনোনয়ন শুনানিতে সিনেটর পিট রিকেটস সরাসরি বাংলাদেশের পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটি এবং সম্ভাব্য ২০টি জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি উত্থাপন করেন। সিনেটের সরকারি শুনানির প্রতিলিপি অনুযায়ী, ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশ সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের কাছে চীনা সামরিক সম্পৃক্ততার ঝুঁকি তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুবিধা ব্যাখ্যা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর বক্তব্যে সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি রয়টার্স-কে জানান, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের কাছে চীনা সামরিক সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুলে ধরতে আগ্রহী। দেশীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রয়টার্স-এর প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, জে-১০সিই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ একটি নির্দিষ্ট অস্ত্র বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশে চীনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রভাব এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নও যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে ‘থিংক টোয়াইস অ্যাক্ট’-ও প্রাসঙ্গিক। মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে এস.২৪২৪—থিংক টোয়াইস অ্যাক্ট অনুমোদন করে। এর লক্ষ্য ছিল চীনা অস্ত্র বিক্রির প্রভাব মূল্যায়ন করা এবং তৃতীয় দেশগুলোকে নতুন চীনা অস্ত্র কেনা থেকে নিরুৎসাহিত করার জন্য একটি সমন্বিত মার্কিন কৌশল গড়ে তোলা।

তবে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে সতর্কতা প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে জে-১০সিই কিনলেই বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে। বরং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, ওয়াশিংটন চীনা অস্ত্র বিক্রিকে আর নিছক সামরিক বাণিজ্য হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করছে।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্ভাব্য এই বিক্রি শুধু ২০টি যুদ্ধবিমান রপ্তানির বিষয় নয়। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ জে-১০সিই গ্রহণ করলে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উন্নত যুদ্ধবিমানভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি ও সহায়তা ব্যবস্থার পরিসর আরও বিস্তৃত হবে। চীনা সামরিক সূত্রগুলো জে-১০সিই রপ্তানির সঙ্গে পাইলট প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং সমন্বিত সামরিক সহায়তার কথাও উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন চীনা অস্ত্রকে উচ্চমানসম্পন্ন ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য চীনের অস্ত্র কূটনীতির বাণিজ্যিক যুক্তির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভিত্তিও নির্দেশ করে।

তবে তুলনামূলকভাবে কম দাম কখনোই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতার প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না। প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং ভবিষ্যৎ আধুনিকায়ন একই উৎসের ওপর নির্ভরশীল হলে সরবরাহকারী রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।

জে-১০সিই যদি বাংলাদেশের প্রধান সম্মুখসারির যুদ্ধবিমানে পরিণত হয়, তাহলে চীনা প্রযুক্তি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের বর্তমান নির্ভরতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই একটি আপাতবিরোধী বাস্তবতা দৃশ্যমান: যে যুদ্ধবিমান বাংলাদেশকে সামরিকভাবে অধিক সক্ষম করবে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতার নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।

অর্থনৈতিক হিসাবটিও তাই ২.৩০২ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। প্রস্তাবিত অর্থায়ন ২০৩৫–৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ বর্তমান সিদ্ধান্ত পরবর্তী এক দশকের জাতীয় বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আধুনিকায়নের ওপর প্রভাব ফেলবে। টাকার অবমূল্যায়ন, খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা, ক্ষেপণাস্ত্র পুনঃসংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ব্যয়—সবই প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের অংশ।

ফলে চূড়ান্ত আলোচনায় শুধু বিমানটির মূল্য নয়, স্থানীয়ভাবে রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, খুচরা যন্ত্রাংশের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা এবং পরিচালনাগত তথ্যের ওপর বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এগুলো কেবল বাণিজ্যিক শর্ত নয়; এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে কার্যকর পথ ‘চীনকে বেছে নেওয়া’ কিংবা ‘চীন থেকে দূরে থাকা’—এই দুই মেরুর কোনো একটিতে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন সক্ষমতাভিত্তিক অস্ত্র ক্রয় এবং বহুমুখী প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব।

চীন থেকে জে-১০সিই কেনা হলে তার পাশাপাশি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমান বা অস্ত্রব্যবস্থা পুরো নিরাপত্তা সম্পর্ককে একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল করে না ফেলে।

উন্নত যুদ্ধবিমান একটি রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু অস্ত্র নিজে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে না। প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন তখনই সৃষ্টি হয়, যখন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত বিকল্পের পরিসরও বিস্তৃত হয়।

জে-১০সিই যদি বাংলাদেশের প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করে, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির সামর্থ্য বাড়ায় এবং একই সঙ্গে ঢাকা- ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে স্বাধীনভাবে সম্পর্ক পরিচালনার সুযোগ ধরে রাখতে পারে, তাহলে এই ক্রয় ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সফল উদাহরণ হতে পারে।

কিন্তু যদি এই ক্রয় দীর্ঘমেয়াদে একটি মাত্র সরবরাহকারীর ওপর নতুন ও গভীর নির্ভরতা সৃষ্টি করে, তাহলে অধিক শক্তিশালী বিমানবাহিনী অর্জন করেও বাংলাদেশ কৌশলগত জায়গায় তুলনামূলকভাবে কম স্বাধীন হয়ে পড়তে পারে। তাই মূল প্রশ্নটি কোন যুদ্ধবিমান বেশি শক্তিশালী—সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো: জে-১০সিই কেনার পর বাংলাদেশের কৌশলগত পছন্দের পরিসর প্রসারিত হবে, নাকি সংকুচিত হবে?

  • মো. এমদাদুল হক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, শানডং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন; গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত