
দেশজুড়ে জ্বালানির যে সংকট চলছে, তার চেয়েও বড় বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে সারের জন্য হাহাকার। এই মুহূর্তে চলছে আমনের ভরা মৌসুম। ঠিক এ সময়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সারের তীব্র সংকটের খবর আসছে। পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যম খুললেই দেখা যাচ্ছে, কৃষকরা অনেক স্থানে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও সার পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে বাড়তি দামে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ডিলারের গুদামের তালা ভেঙে কৃষকদের সার লুটের মতো ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিক্ষুব্ধ কৃষকরা ১৯৬ বস্তা সার নিয়ে যায়, যদিও পরে প্রশাসন ১০০ বস্তার মতো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে মাঠপর্যায়ে সারের সংকট এবং কৃষকের সারের চাহিদা পূরণ করতে না পারা।
সার ও বিদ্যুতের এই সংকটকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সারের সংকট বা সারের দাবিতে কৃষকের অসন্তোষ যেকোনো সরকারের জন্যই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। অতীতে সার সংকটের কারণে সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয়েছিল। সার নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক হতে হবে। সংকটটি প্রকৃত হোক বা কৃত্রিম—মাঠপর্যায়ে যে একটা অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
বর্তমান সংকটের শেকড় কোথায়, তা খুঁজতে গেলে আমাদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদনের জন্য যে ৭টি কারখানা রয়েছে, তার প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে বর্তমানে ৭টির মধ্যে ৫টি কারখানাই বন্ধ। অর্থাৎ আমাদের দেশীয় উৎপাদন প্রায় তলানিতে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও ইউরিয়া সারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ফলে একদিকে দেশের ভেতরে গ্যাসের ঘাটতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম—সব মিলিয়ে দ্বিমুখী চাপের সৃষ্টি হয়েছে। আর আমন ও বোরো মৌসুমে আমাদের কৃষিতে ইউরিয়া সারের যে বিশাল চাহিদা থাকে, তা পূরণ করা এখন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরো বিষয়টি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। গ্যাস নেই বলে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার গ্যাস নেই বলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গিয়েছে। সম্প্রতি ভারত থেকে আসা বিদ্যুতের ওপর নতুন করে বাড়তি চার্জ আরোপের খবরও আমরা জেনেছি, যা আমাদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট নিয়ে ঢাকা শহরেও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার—এই তিনটি বিষয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বেঁচে থাকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এগুলোর ঘাটতি হলে তার প্রভাব প্রতিটি নাগরিকের জীবনে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে সরকারের প্রতি জনমনে অসন্তোষের জন্ম দেয়।
সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। যেকোনো সরকারই সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এমন আশ্বাসমূলক কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মজুত যদি পর্যাপ্ত থাকে, তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না কেন? কেন তাদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে অথবা কেন তারা বাধ্য হয়ে গুদামে হামলা চালাচ্ছেন?
ইউরিয়া সার তো কোনো খোলাবাজারের পণ্য নয় যে, কেউ চাইলেই ইচ্ছেমতো মজুত করতে পারবে। এটি সরকার নির্ধারিত ডিলার এবং উপজেলা পর্যায়ের সার ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কথা। কোন উপজেলায় কতজন কৃষক আছেন এবং কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে থাকে। সেই অনুযায়ীই ডিলারদের সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। যদি মজুত সত্যিই পর্যাপ্ত থাকে, তবে এই সুনির্দিষ্ট সরকারি বিতরণ ব্যবস্থায় গলদটা কোথায়? এর দেখভালের দায়িত্ব তো সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেই নিতে হবে।
আমাদের দেশে কোনো সংকট দেখা দিলেই ঢালাওভাবে 'কৃত্রিম সংকট' বা 'সিন্ডিকেটের কারসাজি' বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা আছে। আমার ধারণামতে, সারের ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি সহজ নয়। কারণ পুরো বিতরণ ব্যবস্থাটি কমিটির নজরদারিতে থাকে। ডিলাররা মূলত সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করে নির্দিষ্ট কমিশন পেয়ে থাকেন। হয়তো পরিবহন খরচ বা অন্যান্য কারণে হাতেগোনা কিছু ডিলার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০ পয়সা বা ১ টাকা বেশি রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ হাজার ডিলারের মধ্যে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন অনিয়ম করতে পারে। কিন্তু সেই গুটিকয়েক মানুষের উদাহরণ টেনে দেশজুড়ে কৃত্রিম সংকটের কথা বলে মূল সমস্যাকে আড়াল করলে সেটি সরকারের জন্যই নেগেটিভ পয়েন্ট। আসল সমস্যাটি হলো দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ঠিক করা।
যেহেতু এখন আমন মৌসুম চলছে, তাই সংকট উত্তরণে সরকারকে অবিলম্বে দুটি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, দেশীয় সার কারখানাগুলো সচল করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যতই বেশি হোক, খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সার আমদানি করা।
দেশে অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ কিছুটা ধীরগতিতে চললেও সাময়িকভাবে ক্ষতি নেই; কিন্তু কৃষকের সার ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় কোনোভাবেই আপোশ করা যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছি, যার প্রভাব কৃষিতে পড়েছে। এখন আমন উৎপাদন যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তা জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।
ইউরিয়া সারের বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের নজির খুব একটা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে হয়তো সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু কৃষকের হাত পর্যন্ত সার পৌঁছেছে। বর্তমান সরকারকেও ঠিক এই জায়গাটিতে মনোযোগ দিতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকলে দেশের অন্য সব সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
- ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক
.png)






