ফিরে দেখা ‘দ্রোহযাত্রা’

জনতার ঢল, অভ্যুত্থানের মোড় পরিবর্তন থেকে ইতিহাস মোছার লড়াই

দ্রোহযাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ঢল। স্ট্রিম ছবি
দ্রোহযাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ঢল। স্ট্রিম ছবি

দুই বছর আগের সকাল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। চারদিকে দমবন্ধ পরিস্থিতি, কারফিউ আর দমন-পীড়নের রক্তচক্ষু। তার মধ্যে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে নামতে শুরু করেছিল মানুষ। লক্ষ্য একটাই—জুলাইয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং আটক সব শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকের মুক্তি। সময়টা ২০২৪ সালের ২ আগস্ট।

প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়েছিল আলাদা দল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের ব্যানারে ‘শিক্ষার্থী-জনতার শোকযাত্রা’, সাংস্কৃতিক কর্মী ও অধিকারকর্মীদের ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ’ এবং বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন।

ঘড়ির কাঁটা যত গড়াতে থাকে, প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা রূপ নিতে থাকে বিশাল জনসমুদ্রে। কে কোন দল বা সংগঠনের, সেই দেয়াল মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আলাদা আলাদা কর্মসূচিগুলো মিলিয়ে তৈরি হয় এক একক ও অবিচ্ছেদ্য গণকর্মসূচি—‘দ্রোহযাত্রা’।

সেই ঐতিহাসিক গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ আনু মুহাম্মদ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দাবি করে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি যখন ‘দ্রোহযাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন, তখন চারপাশ উত্তাল। কদম ফোয়ারা, হাইকোর্ট মোড়, দোয়েল চত্বর হয়ে মিছিল যখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছায়, ততক্ষণে ঢাকা দেখেছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যপট। ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ কিংবা ‘খুনি সরকারের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’—হাজারো কণ্ঠে তোলা স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল ‘দ্রোহযাত্রা’

দ্রোহযাত্রার পেছনে ছিল একাধিক ছোট ছোট কর্মসূচির ধারাবাহিক সমন্বয়। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ও নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) সদস্য বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘জুলাইয়ের পুরোটা সময় আমাদের এক ধরনের কো-অর্ডিনেশন ছিল। ধানমন্ডি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় যে ছোট ছোট মুভ হচ্ছিল, সেখানে আমাদের ফোর্স ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।’

কারফিউ জারির পর যখন যোগাযোগের পথ কঠিন হয়ে পড়ে, তখনো সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ সমন্বয় গড়ে ওঠে। বাকী বিল্লাহর মতে, ২৬ জুলাইয়ের ‘গানের মিছিল’ এবং ৩০ জুলাইয়ের নূর হোসেন স্কয়ারের কর্মসূচির ধারাবাহিকতাই দ্রোহযাত্রার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ওই দুই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকার মিডল ক্লাস, সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রোগ্রেসিভ আরবান একটা গোষ্ঠী এক নেটওয়ার্কে চলে আসে। ফলে দ্রোহযাত্রার দিন চার-পাঁচ হাজার সংগঠিত মানুষের একটি বলয় তৈরি হয়েছিল, যা মানুষকে রাজপথে নামার ভরসা দিয়েছিল।’

তবে এই জমায়েত যে এমন বিশাল রূপ নেবে, তা আয়োজকদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কবি, লেখক ও সংগীতশিল্পী অরূপ রাহী সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আয়োজকদের ধারণা ছিল না যে এই পরিমাণ লোক হবে দ্রোহযাত্রায়। পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক উদ্যোক্তাও আমাকে বলেছিলেন, হাজার হাজার মানুষের এই ঢল তাদের ধারণার অতীত ছিল।’

এক দফা দাবি

দ্রোহযাত্রার দিন রাজপথের মেজাজ তৈরি হয়েছিল ঘটনার আকস্মিকতায় ও মানুষের তীব্র ক্ষোভে। সেদিন রাজপথে ছিলেন অ্যাক্টিভিস্ট আফজাল হোসেন। তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এতটাই তুঙ্গে ছিল যে স্লোগান থামানোর সুযোগ ছিল না।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘ওই সময় আমার বন্ধু আরিফ নূর স্লোগান দিচ্ছিল। একপর্যায়ে আমি মাইক নিয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করি। সময়, আন্দোলনের মেজাজ, দ্রোহযাত্রার উপস্থিতি এবং হাসিনাশাহির হত্যাযজ্ঞ—সবকিছু মিলেই সেদিন সরকারের পদত্যাগের স্লোগান দাবি করছিল।’

মিছিল যখন শহীদ মিনারের দিকে এগোচ্ছিল, শিক্ষা ভবনের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের ভ্যান দেখে জনতা তেড়ে যায়। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শহীদ মিনার রূপ নেয় জনতার মহাসমুদ্রে। সেই দিন ডিবি হেফাজত ও আত্মগোপন থেকে আসা ছাত্রনেতারাও শহীদ মিনারে এসে সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উত্তাপের সঙ্গে সংহতি জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

নতুন বাংলাদেশ

অরূপ রাহী মনে করেন, দ্রোহযাত্রার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর ভাষায়, ‘তখন গণ-অভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর দেশটাকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া দরকার, দ্রোহযাত্রায় তার এক ধরনের পরিষ্কার ডিরেকশন ছিল।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সমাজ গঠনের যে ঘোষণা দ্রোহযাত্রা থেকে এসেছিল, তা ছিল অত্যন্ত সুসংহত। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ—অধিকারকর্মী, আদিবাসী, নারী, নন-বাইনারি কমিউনিটি থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। এই কর্মসূচি গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্ত তৈরি করতে এবং সরকার পতনের ধাপকে ত্বরান্বিত করতে অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে।’

‘মালিকানা’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পরিস্থিতি মোড় নিতে থাকে ভিন্ন দিকে। ক্ষমতার রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসার পর অভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক ইতিহাসকে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী বা দলের নিজস্ব সম্পত্তি বানানোর এক প্রবণতা দেখা যায়।

অ্যাক্টিভিস্ট আফজাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) যখন গঠিত হয়, সংসদ ভবনের সামনে তারা একটি ডকুফিকশন দেখায়। সেখানে কিন্তু দ্রোহযাত্রার কোনো চিহ্নই ছিল না। তারা আসলে গণ-অভ্যুত্থানকে নিজেদের সম্পত্তি করতে চেয়েছিল।’

বামপন্থীদের রাজনৈতিক দুর্বলতার কথা স্বীকার করেই বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী ক্ষমতার রাজনীতিতে বার্গেনিং করার মতো সুসংগঠিত বাম রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি ছিল। তবে কেউ চাইলে সাময়িক ন্যারেটিভ তৈরি করে দ্রোহযাত্রাকে ছোট করে রাখতে পারে, কিন্তু ইতিহাস থেকে একে মোছা অসম্ভব। দ্রোহযাত্রার মতো প্রভাবশালী ঘটনা ইতিহাসে তার যোগ্য জায়গা পাবেই।’

ইতিহাস গায়েব করার এই চক্রান্তকে ‘ফ্যাসিবাদী মনোভাব’ বলে আখ্যা দেন অরূপ রাহী। তিনি বলেন, ‘১৫-১৬ বছর ধরে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বামপন্থী, নারী অধিকারকর্মী, অধিকারকর্মী, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী, বিএনপি, মাদ্রাসা কমিউনিটি—সমাজের বহু ধারের মানুষের লড়াই ছিল। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানকে যখন কোনো একক আদর্শ বা পক্ষের বয়ানে আটকে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখন পুরো দেশের জনগণের ত্যাগকে অস্বীকার করা হয়।”

অরূপ রাহী আরও বলেন, ‘কোনো সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের একক প্রচেষ্টায় এই অভ্যুত্থান ঘটেনি। এই একচক্ষু প্রবণতা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। দ্রোহযাত্রা কিংবা অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে যদি কেউ মুছে ফেলতে চায়, তবে তা হবে গণতন্ত্র ও অভ্যুত্থানের চেতনার ওপর এক ধরনের ফ্যাসিস্ট অ্যাপ্রোচ।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত