হুমায়ূন শফিক

লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলইডিপি) আওতায় সেরা ফ্রিল্যান্সারদের ল্যাপটপ বিতরণের কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, মেধার ভিত্তিতে এই পুরস্কার পাওয়ার কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জেলা প্রশাসকদের (ডিসির) কাছে পাঠানো গোপন চিঠিতে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, পুরস্কার গ্রহীতার ‘রাজনৈতিক আদর্শ’ যাচাই করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে, ওই তরুণ যেন ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না থাকে। যা আসলে অঘোষিতভাবে আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ যেন এই পুরস্কার না পান, তারই নির্দেশনা। মেধার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় যখন যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যে গৌণ হয়ে যায়; তার প্রমাণ মিলেছে বিগত ১৫ বছরের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রচারণার আড়ালে নেওয়া ডজন ডজন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইসিটি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত ও গবেষণার পর একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ ও অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আইসিটি খাতের প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত শ্বেতপত্রের গবেষণায়প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে যে ‘ফ্রিল্যান্সার বিপ্লব’ এবং ‘আইটি জনশক্তি’ তৈরির গল্প শোনানো হয়েছিল, তার অনেকটাই ছিল বানোয়াট তথ্য, ভুয়া হাজিরা খাতা এবং রাজনৈতিক লুটপাটের মহোৎসব।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ব্যানারে আইসিটি বিভাগ ও এর আওতাধীন সংস্থাগুলো ২১টিরও বেশি প্রশিক্ষণ-কেন্দ্রিক প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরুতে ধীরগতি থাকলেও ২০১৬ সালের পর থেকে শুরু হয় ‘প্রশিক্ষণ ধুম’ (ট্রেনিং বুম)। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ আইসিটি বিভাগের হাতে প্রশিক্ষণের উপাদানসহ ১৯টি প্রকল্প ছিল, যার সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
আইসিটি সাক্ষরতা থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ভারী ভারী নাম দিয়ে এসব প্রকল্প সাজানো হয়। কিন্তু ডিপিপি, পিসিআর, এবং অডিট রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলাফল এবং দাবিকৃত সাফল্যের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। প্রতি বছর ২০ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হলেও আইটি খাত বছরে ৮ হাজার দক্ষ কর্মী পাচ্ছে না। কারণ, গ্র্যাজুয়েটদের ৮০ শতাংশই মৌলিক কোডিং পারে না। এই ঘাটতি পূরণে সরকারের ‘স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ’ বা ‘কুইক ফিক্স’ পদ্ধতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি ছিল লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি)। লক্ষ্য ছিল ৪০ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা। খাতাপত্র বা ড্যাশবোর্ডে সাফল্যের গল্প শোনানো হলেও বাস্তবে এর ভিৎ ছিল নড়বড়ে। প্রকল্পের ভেন্ডরদের বিল পরিশোধ করা হতো প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বা আয়ের ওপর ভিত্তি করে। এই শর্ত পূরণ করতে ভেন্ডররা জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একই ব্যক্তির নাম ও ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে বিলি করা হয়েছে ভুয়া ইনভয়েস। জালিয়াতি এত চরমে পৌঁছায় যে, ডুপ্লিকেট বা নকল প্রশিক্ষণার্থী খুঁজে বের করতে আইসিটিডিকে বিশেষ ভেরিফিকেশন প্যানেল তৈরি করতে হয়।
প্রকল্পের আওতায় কেনা ডিজিটাল ট্রেনিং বাস বা ‘ক্যারাভ্যান’ নিয়ে রয়েছে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ। এই বাসগুলো কেনা হয়েছিল ‘কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে, যার মালিক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি লিয়াকত সিকদার এবং তার স্ত্রী। ডিজিটাল বাসগুলোর মাধ্যমে ১ লাখ ৮ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও তা পূরণ হয়নি, উল্টো লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়।
এছাড়া এলইডিপি-র পাঠ্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা। সেখানে শেখানো ওয়েব ডিজাইন বা ওয়ার্ডপ্রেস কাস্টমাইজেশনের মতো বিষয়গুলো বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য একেবারেই অপ্রতুল ও সেকেলে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (ইডিজিই বা এজ) প্রকল্পটিকে সফলতার অন্যতম স্মারক হিসেবে প্রচার করা হয়। বিশ্বব্যাংক দাবি করেছিল, এই প্রকল্পের ‘হায়ার অ্যান্ড ট্রেন’ (হ্যাট) প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটের চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
হ্যাট স্কিমের ট্র্যাকিং জরিপে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কর্মরত আছেন। বাকিদের হদিস নেই অথবা তারা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীদের একটি বিশাল অংশ (৩৬ শতাংশ) মাত্র তিনটি কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে ‘গোল্ডেন হারভেস্ট ইনফোটেক’ একাই ৩১টি ব্যাচ পরিচালনা করেছে। এই কোম্পানির প্রশিক্ষণার্থীদের ট্র্যাকিং রেট অন্যান্যদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম (৫১ দশমিক ৬৪ শতাংশ), যা বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিএসটিইউ) এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে ভয়াবহ দুর্নীতি ধরা পড়েছে। অডিটে দেখা গেছে, ব্যাচের আকার বাড়িয়ে দেখানো, ভুয়া হাজিরা, এবং প্রশিক্ষণ না করেই খাবারের বিল ও সম্মানী ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
প্রকল্পগুলোতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগই ছিল মুখ্য। ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমি (আইডিইএ) প্রকল্পের মূল কাজ ছিল স্টার্টআপদের সহায়তা করা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, স্টার্টআপ অনুদানের টাকা গেছে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজনদের পকেটে।
প্রকল্পের এসএমই গ্রান্টের আওতায় ২ হাজার ২৩২ জন নারীকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এদের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় অংশটি পেয়েছে ‘উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম ফাউন্ডেশন’ এবং সংসদ সদস্যদের সুপারিশকৃত ব্যক্তিরা। তৃণমূলের প্রকৃত নারী উদ্যোক্তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নামকরণও করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে, যা প্রকল্পের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আইডিয়া প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে না থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবে ‘হাসিনা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ ওয়েব প্ল্যাটফর্ম এবং ‘বিনিময়’ (ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম)-এর মতো উপাদান যুক্ত করা হয়। ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মটি একজন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত অনিয়মের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ‘freelancers.gov.bd’ ডোমেইনটি একটি প্রাইভেট কোম্পানিকে (দ্য ফ্রিল্যান্সার লিমিটেড) নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল, যদিও তাদের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশে আইসিটি প্রশিক্ষণের নামে যা হয়েছে, তাকে গবেষকরা ‘হার্ডওয়্যারের ভাগাড়’ তৈরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিসিসি, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ), এবং আইসিটি অধিদপ্তর; সবাই পাল্লা দিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ল্যাব বানিয়েছে। অথচ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাজ ছিল মূলত অবকাঠামো ও বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়।
আইনের তোয়াক্কা না করে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একের পর এক প্রশিক্ষণ প্রকল্প (যেমন- বিডিসেট) হাতে নেয়, যেখানে প্রশিক্ষণের চেয়ে ল্যাব ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। অথচ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। এনএসডিএ-এর সার্টিফিকেশন বা মানদণ্ড মানা হয়নি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ফলে হাজার কোটি টাকার ল্যাবগুলো এখন অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে, এবং প্রশিক্ষণার্থীরা পাচ্ছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিহীন সনদ।
সরকারের নীতি নির্ধারণ ছিল অনেকটাই ‘তথ্য-প্রমাণবিহীন’। প্রকল্পগুলো আসলেই কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি। এলইডিপি-র ক্ষেত্রে একটি মূল্যায়ন করা হয়েছিল বটে, তবে তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বেসলাইন সার্ভে ছাড়াই প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে সাফল্যের রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে, ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ কর্মসূচির মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের দুই বছর পরেও ৪০ শতাংশ সুবিধাভোগী বেকার। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৪ শতাংশের বেশি। অথচ এই হতাশাজনক ফলাফল ধামাচাপা দিয়ে ‘শি পাওয়ার’ এবং পরবর্তীতে ‘হার পাওয়ার’-এর মতো আরও বড় বাজেটের প্রকল্প নেওয়া হয়।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন ছিল একটি দক্ষ ও প্রযুক্তি-নির্ভর জনশক্তি গড়ে তোলা। কিন্তু গত দেড় দশকের খতিয়ান বলছে, এই স্বপ্নকে পুঁজি করে একটি শ্রেণি হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। ফ্রিল্যান্সার তৈরির নামে তৈরি হয়েছে ভুতুড়ে তালিকা, আর স্টার্টআপের নামে অর্থ গেছে রাজনৈতিক কর্মীদের পকেটে। দক্ষতা সংকটের সমাধান না করে আইসিটি প্রকল্পগুলো উল্টো রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতির নতুন নজির স্থাপন করেছে।
গবেষকদের মতে, এখনই যদি এই খাতের সংস্কার না করা হয়, তবে আইসিটি খাতে রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা, তা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলইডিপি) আওতায় সেরা ফ্রিল্যান্সারদের ল্যাপটপ বিতরণের কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, মেধার ভিত্তিতে এই পুরস্কার পাওয়ার কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জেলা প্রশাসকদের (ডিসির) কাছে পাঠানো গোপন চিঠিতে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, পুরস্কার গ্রহীতার ‘রাজনৈতিক আদর্শ’ যাচাই করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে, ওই তরুণ যেন ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না থাকে। যা আসলে অঘোষিতভাবে আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ যেন এই পুরস্কার না পান, তারই নির্দেশনা। মেধার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় যখন যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যে গৌণ হয়ে যায়; তার প্রমাণ মিলেছে বিগত ১৫ বছরের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রচারণার আড়ালে নেওয়া ডজন ডজন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইসিটি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত ও গবেষণার পর একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ ও অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আইসিটি খাতের প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত শ্বেতপত্রের গবেষণায়প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে যে ‘ফ্রিল্যান্সার বিপ্লব’ এবং ‘আইটি জনশক্তি’ তৈরির গল্প শোনানো হয়েছিল, তার অনেকটাই ছিল বানোয়াট তথ্য, ভুয়া হাজিরা খাতা এবং রাজনৈতিক লুটপাটের মহোৎসব।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ব্যানারে আইসিটি বিভাগ ও এর আওতাধীন সংস্থাগুলো ২১টিরও বেশি প্রশিক্ষণ-কেন্দ্রিক প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরুতে ধীরগতি থাকলেও ২০১৬ সালের পর থেকে শুরু হয় ‘প্রশিক্ষণ ধুম’ (ট্রেনিং বুম)। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ আইসিটি বিভাগের হাতে প্রশিক্ষণের উপাদানসহ ১৯টি প্রকল্প ছিল, যার সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
আইসিটি সাক্ষরতা থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ভারী ভারী নাম দিয়ে এসব প্রকল্প সাজানো হয়। কিন্তু ডিপিপি, পিসিআর, এবং অডিট রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলাফল এবং দাবিকৃত সাফল্যের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। প্রতি বছর ২০ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হলেও আইটি খাত বছরে ৮ হাজার দক্ষ কর্মী পাচ্ছে না। কারণ, গ্র্যাজুয়েটদের ৮০ শতাংশই মৌলিক কোডিং পারে না। এই ঘাটতি পূরণে সরকারের ‘স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ’ বা ‘কুইক ফিক্স’ পদ্ধতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি ছিল লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি)। লক্ষ্য ছিল ৪০ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা। খাতাপত্র বা ড্যাশবোর্ডে সাফল্যের গল্প শোনানো হলেও বাস্তবে এর ভিৎ ছিল নড়বড়ে। প্রকল্পের ভেন্ডরদের বিল পরিশোধ করা হতো প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বা আয়ের ওপর ভিত্তি করে। এই শর্ত পূরণ করতে ভেন্ডররা জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একই ব্যক্তির নাম ও ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে বিলি করা হয়েছে ভুয়া ইনভয়েস। জালিয়াতি এত চরমে পৌঁছায় যে, ডুপ্লিকেট বা নকল প্রশিক্ষণার্থী খুঁজে বের করতে আইসিটিডিকে বিশেষ ভেরিফিকেশন প্যানেল তৈরি করতে হয়।
প্রকল্পের আওতায় কেনা ডিজিটাল ট্রেনিং বাস বা ‘ক্যারাভ্যান’ নিয়ে রয়েছে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ। এই বাসগুলো কেনা হয়েছিল ‘কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে, যার মালিক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি লিয়াকত সিকদার এবং তার স্ত্রী। ডিজিটাল বাসগুলোর মাধ্যমে ১ লাখ ৮ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও তা পূরণ হয়নি, উল্টো লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়।
এছাড়া এলইডিপি-র পাঠ্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা। সেখানে শেখানো ওয়েব ডিজাইন বা ওয়ার্ডপ্রেস কাস্টমাইজেশনের মতো বিষয়গুলো বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য একেবারেই অপ্রতুল ও সেকেলে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (ইডিজিই বা এজ) প্রকল্পটিকে সফলতার অন্যতম স্মারক হিসেবে প্রচার করা হয়। বিশ্বব্যাংক দাবি করেছিল, এই প্রকল্পের ‘হায়ার অ্যান্ড ট্রেন’ (হ্যাট) প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটের চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
হ্যাট স্কিমের ট্র্যাকিং জরিপে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কর্মরত আছেন। বাকিদের হদিস নেই অথবা তারা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীদের একটি বিশাল অংশ (৩৬ শতাংশ) মাত্র তিনটি কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে ‘গোল্ডেন হারভেস্ট ইনফোটেক’ একাই ৩১টি ব্যাচ পরিচালনা করেছে। এই কোম্পানির প্রশিক্ষণার্থীদের ট্র্যাকিং রেট অন্যান্যদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম (৫১ দশমিক ৬৪ শতাংশ), যা বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিএসটিইউ) এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে ভয়াবহ দুর্নীতি ধরা পড়েছে। অডিটে দেখা গেছে, ব্যাচের আকার বাড়িয়ে দেখানো, ভুয়া হাজিরা, এবং প্রশিক্ষণ না করেই খাবারের বিল ও সম্মানী ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
প্রকল্পগুলোতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগই ছিল মুখ্য। ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমি (আইডিইএ) প্রকল্পের মূল কাজ ছিল স্টার্টআপদের সহায়তা করা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, স্টার্টআপ অনুদানের টাকা গেছে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজনদের পকেটে।
প্রকল্পের এসএমই গ্রান্টের আওতায় ২ হাজার ২৩২ জন নারীকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এদের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় অংশটি পেয়েছে ‘উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম ফাউন্ডেশন’ এবং সংসদ সদস্যদের সুপারিশকৃত ব্যক্তিরা। তৃণমূলের প্রকৃত নারী উদ্যোক্তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নামকরণও করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে, যা প্রকল্পের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আইডিয়া প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে না থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবে ‘হাসিনা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ ওয়েব প্ল্যাটফর্ম এবং ‘বিনিময়’ (ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম)-এর মতো উপাদান যুক্ত করা হয়। ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মটি একজন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত অনিয়মের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ‘freelancers.gov.bd’ ডোমেইনটি একটি প্রাইভেট কোম্পানিকে (দ্য ফ্রিল্যান্সার লিমিটেড) নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল, যদিও তাদের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশে আইসিটি প্রশিক্ষণের নামে যা হয়েছে, তাকে গবেষকরা ‘হার্ডওয়্যারের ভাগাড়’ তৈরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিসিসি, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ), এবং আইসিটি অধিদপ্তর; সবাই পাল্লা দিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ল্যাব বানিয়েছে। অথচ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাজ ছিল মূলত অবকাঠামো ও বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়।
আইনের তোয়াক্কা না করে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একের পর এক প্রশিক্ষণ প্রকল্প (যেমন- বিডিসেট) হাতে নেয়, যেখানে প্রশিক্ষণের চেয়ে ল্যাব ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। অথচ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। এনএসডিএ-এর সার্টিফিকেশন বা মানদণ্ড মানা হয়নি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ফলে হাজার কোটি টাকার ল্যাবগুলো এখন অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে, এবং প্রশিক্ষণার্থীরা পাচ্ছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিহীন সনদ।
সরকারের নীতি নির্ধারণ ছিল অনেকটাই ‘তথ্য-প্রমাণবিহীন’। প্রকল্পগুলো আসলেই কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি। এলইডিপি-র ক্ষেত্রে একটি মূল্যায়ন করা হয়েছিল বটে, তবে তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বেসলাইন সার্ভে ছাড়াই প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে সাফল্যের রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে, ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ কর্মসূচির মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের দুই বছর পরেও ৪০ শতাংশ সুবিধাভোগী বেকার। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৪ শতাংশের বেশি। অথচ এই হতাশাজনক ফলাফল ধামাচাপা দিয়ে ‘শি পাওয়ার’ এবং পরবর্তীতে ‘হার পাওয়ার’-এর মতো আরও বড় বাজেটের প্রকল্প নেওয়া হয়।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন ছিল একটি দক্ষ ও প্রযুক্তি-নির্ভর জনশক্তি গড়ে তোলা। কিন্তু গত দেড় দশকের খতিয়ান বলছে, এই স্বপ্নকে পুঁজি করে একটি শ্রেণি হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। ফ্রিল্যান্সার তৈরির নামে তৈরি হয়েছে ভুতুড়ে তালিকা, আর স্টার্টআপের নামে অর্থ গেছে রাজনৈতিক কর্মীদের পকেটে। দক্ষতা সংকটের সমাধান না করে আইসিটি প্রকল্পগুলো উল্টো রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতির নতুন নজির স্থাপন করেছে।
গবেষকদের মতে, এখনই যদি এই খাতের সংস্কার না করা হয়, তবে আইসিটি খাতে রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা, তা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সাংবাদিক নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ডিজিটাল পদ্ধতিতে না গিয়ে কমিশন আগের মতো ম্যানুয়ালি নিবন্ধন করবে।
৯ মিনিট আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের শরিক প্রার্থীদের সমর্থনে সাতটি আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রত্যাহারের আবেদন করেছিল জামায়াতে ইসলামী। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর প্রতীক প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।
১৬ মিনিট আগে
গণভোটের বিষয়গুলো অনুমোদন পেলে রাজনৈতিক দলগুলো জনতার প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পুরাতন বন্দোবস্তে ভাঙন, সংস্কার এবং গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা: ক্রান্তিকালে দুঃসহ পথচলা’
৩১ মিনিট আগে
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হত্যা মামলার তিন আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে আনিস মিয়া, রাশেদুল ইসলাম ও জাকিরুল ইসলাম কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কারাগার ছাড়েন। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দার তারাটি এলাকায়।
৩ ঘণ্টা আগে