
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে ঋণখেলাপির সংসদ বলে আখ্যা দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর আনা বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা তাঁর বক্তব্যে বাধা দেন এবং হট্টগোলের সৃষ্টি করেন।
সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলীতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাব করেন যে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ সংশোধনকল্পে আনীত বিলটি ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত আকারে অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক।
অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের পর সংসদে স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, এ বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন ১৫ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে বিরোধী দলের ১৩ জন সংসদ সদস্য তাঁদের প্রস্তাব উত্থাপন করবেন না মর্মে জানিয়েছেন। বাকি দুজন সংসদ সদস্য হলেন রুমিন ফারহানা ও শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। এরপর তিনি রুমিন ফারহানাকে কথা বলার সুযোগ দেন।
এ সময় রুমিন ফারহানা বলেন, প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না, সারের দায়িত্বে থাকা গরিব কৃষকরা গিয়ে সার কারখানায় তা লুট করবেন না, এটাও হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, এটাও অসম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপি হয়ে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, এটাও হতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণখেলাপি হওয়া, ছয় লাখ কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি।
এ সময় থেকেই সংসদে হট্টগোল শুরু হয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা তাঁকে এ ধরনের বক্তব্য দিতে বাধা দিতে থাকেন। স্পিকার তাঁদের থামানোর চেষ্টা করলেও তাঁরা থামেননি। এই হট্টগোলের মধ্যেই রুমিন ফারহানা বলেন, এত অসহিষ্ণু সংসদ মনে হয় একেবারে আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তাঁরাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপিকে দিয়ে একই ধরনের আচরণ করছি আমরা। আরও খারাপ আচরণ যদি বলি।
হট্টগোল বাড়তে থাকায় সংসদ সদস্যদের স্লোগানও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তিনি এই সংসদকে ঋণখেলাপির সংসদ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই আইনটিতে ১৮-এর ক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছিল ১৮ক রাখা হবে না। ১৮ক আছে—কারণ হচ্ছে এ সংসদে বেশিরভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপ হিসেবে পরিচিত। ওই নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহু দেখেছি। ইলেকশনের আগে তাড়াহুড়ো করে ঋণখেলাপি থেকে বাদ দেয় আর ইলেকশনটা যেই শেষ হয়, অমনি...।
এরপরই রুমিন ফারহানার মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় পুরো কক্ষজুড়ে হট্টগোল চলতে থাকে।
বারবার হট্টগোল থামানোর জন্য ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ‘অর্ডার, অর্ডার’ বলে সবাইকে চুপ করতে বলেন। এ সময় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি দাঁড়ালে ডেপুটি স্পিকার তাঁকে বসতে বলেন। এরপরও হট্টগোল চলতে থাকে। হট্টগোলের মধ্যে রুমিন ফারহানাকে হাত নেড়ে ‘না, না’ বলতে দেখা যায়।
ডেপুটি স্পিকার একাধিকবার অনুরোধ করার পরও যখন হট্টগোল থামে না, তখন চিফ হুইপের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন সদস্য বক্তব্য রাখছেন। তিনি যেকোনো ধরনের বক্তব্যই রাখতে পারেন। কিন্তু অন্যান্য সদস্যরা তাঁর বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান করছেন, এটা কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে। আপনাদের যখন সুযোগ আসবে, তখন আপনারা তাঁর বক্তব্য খণ্ডাবেন। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এরপরও হট্টগোল থামেনি। হট্টগোলের মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে কথা বলতে বলেন কায়সার কামাল। পরে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল কথা বলা শুরু করলে হট্টগোল থেমে যায়।
শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলা শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে কথা বলার সুযোগ দেন ডেপুটি স্পিকার। এ সময় তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য কথা বলতে দাঁড়িয়েছেন। হতে পারে তাঁর কথাগুলোর সবগুলোর সঙ্গে আমরা সম্মত নই। আবার হতে পারে কথাগুলো তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা তো কিছুই শুনতে পারলাম না। কী উনি বললেন, সব তো হারিয়ে গেল। এখন তাঁর কথাগুলো শোনার যেমন দায়িত্ব আমাদের আছে, বলারও অধিকার তাঁর আছে। এখন উনি কী বললেন, আমরা তো একেবারেই বুঝতে পারলাম না। এ জন্য বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি বলে আমরা মনে করি।
এরপর আবার রুমিন ফারহানা কথা বলার সুযোগ চাইলে তাঁকে সুযোগ না দিয়ে চিফ হুইপকে সুযোগ দেন স্পিকার। তখন চিফ হুইপ বলেন, সংসদে আমরা সবাই কথা বলতে এসেছি। আর আমরা চাই সংসদে সব সমস্যার সমাধান হোক। কিন্তু সমস্যার সমাধানের চাইতে আমরা নিজেরাই সমস্যা তৈরি করি। আমরা চাই এখানে গঠনমূলক ও স্বাস্থ্যকর আলোচনা হোক, যে আলোচনা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়।
চিফ হুইপের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমি তো বিষয়বস্তু কী, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কী বললাম আর আলোচনা কী হলো, আমি বিষয়বস্তুই ভুলে গেছি। একদম একটা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা এখানে চলে আসছে। তারপরে একটা হট্টগোল চলে আসছে, এটা তো হতে পারে না। আমরা থিয়েটার করতে এখানে আসি নি। এটা কোনো থিয়েটার নয়, এটা বিল। ফলে আমরা বিলের ওপর কনসার্ন করি।
এরপর তিনি প্রস্তাব করেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ সংশোধনকল্পে আনীত বিলটি ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করা হোক। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর স্পিকার বিষয়টি কণ্ঠভোটে দিলে তা পাস হয়।
এর আগে বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন কার্যপ্রণালী-বিধির ২১১ বিধির (১) উপবিধি অনুযায়ী স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট উপস্থাপন করেন।
.png)
-028855-256x144.webp)





