leadT1ad

বাবা-ছেলের দ্বন্দ্বে বন্ধ ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, বিপাকে হাজারো শিক্ষার্থী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯: ৫৯
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ক্যাম্পাস। সংগৃহীত ছবি

বাবা ও ছেলের মধ্যে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে রাজধানীর গাবতলীতে অবস্থিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। গত কয়েকদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সশরীরে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখার পর শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ ফরহাদ খান। ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর বাবা মকবুল আহমেদ খানকে সরিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন ফরহাদ। ওই সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মকবুল আহমেদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে তাঁর অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন।

তবে নিজেকে অপসারণের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল না উল্লেখ করে নিজেকে ট্রাস্টি বোর্ডের পদ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও যৌথমূলধনী ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) আবেদন করেন মকবুল আহমেদ খান। হাইকোর্টে এ নিয়ে রিট আবেদনও করেন তিনি।

ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক আদেশে বলেন, মকবুল আহমেদ খান ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে কোনও দাপ্তরিক কাজের জন্য নয়, তিনি ভিজিটর হিসেবে যেতে পারবেন এবং দুয়েকজনকে নিজের সঙ্গে নিতে পারবেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ২২ জানুয়ারি বেশ কয়েকজন বহিরাগত নিয়ে মকবুল আহমেদ খান ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়। ২৩ ও ২৪ জানুয়ারিও একই ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়।

এর আগে, গত ২৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে দুই দিনের জন্য পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ওই দুই দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয়। ২৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। পরদিন ২৭ জানুয়ারি যথারীতি ক্লাস-পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয় ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

গত ২৬ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাকিবুল হাসানের আদালতে বাদী হয়ে একটি মামলা করেন ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (ইইউবি) লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক পরিচালক লুৎফর রহমান। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ওই মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ভয়ভীতি, হুমকি-ধামকি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান গণমাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছেন।

মামলা করার পরদিন ২৭ জানুয়ারি মকবুল আহমেদ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগতকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আবার প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এমন পরিস্থিতিতে ওইদিন এক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান রেজিস্ট্রার এসএম জোবায়ের এনামুল করিম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে চলমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়ায় শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আহমেদ ফরহাদ খান স্ট্রিমকে বলেন, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের নিয়ে মকবুল আহমেদ খান বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করছেন। তারা উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের কক্ষ ঘেরাও করছে। ২৭ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওইদিন মকবুল আহমেদ সেনাবাহিনীর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি আর এভাবে আসবেন না।

ফরহাদ খান আরও বলেন, ‘আদালত যেভাবে বলেছে, উনি সেভাবে আসতে পারেন। কিন্তু উনি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করছেন। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এই কদিনের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মকবুল আহমেদ খানের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। বার্তা লিখে পাঠালেও সাড়া দেননি।

বিপাকে শিক্ষার্থীরা

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ অনুমোদন পায়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। ২০২৩ সালের ১৫ মে মকবুল আহমেদ ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হন। পরবর্তী সময়ে মহিউদ্দীন খান আলমগীর নিষ্ক্রীয় হয়ে গেলে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে তিনটি অনুষদের অধীনে ১০টি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছেন। শিক্ষক রয়েছেন দুই শতাধিক।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর অস্থির হয়ে ওঠে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি। ঢাকার গাবতলীতে অবস্থিত এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খানের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনেও নামেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ বছরের ২৬ অক্টোবর বোর্ড অব ট্রাস্টিজ পুনর্গঠন করা হয়। নতুন চেয়ারম্যান হন মকবুল আহমদের ছেলে আহমেদ ফরহাদ খান। তখন মকবুল আহমদের পাশাপাশি ট্রাস্টি বোর্ড থেকে আরও তিনজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন, মহিউদ্দীন খান আলমগীর, নিলুফার বেগম ও ফারজানা আলম। নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হন এসএসএম সদরুল হুদা ও হেলাল চৌধুরী।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, মকবুল আহমেদ খান সরে গেলেও মাঝেমধ্যেই তিনি বহিরাগতদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। এর আগেও বেশ কয়েকবার বহিরাগতরা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ড ও আগের চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদের পক্ষে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি করতে দেখা গেছে। এতে তাঁদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী উজ্জল হোসেন রাজ ফেসবুকে লিখেছেন, ভার্সিটিতে অনেক দিন ধরে সমস্যা হচ্ছে। বাবা-ছেলের দ্বন্দ্বে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। এমন পরিস্থিতি যেন ভবিষ্যতে আর না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাটা দুঃখজনক, এটা কাম্য নয়। আমরা বিষয়টি অফিসিয়ালি ডিল করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথেও যোগাযোগ করে সমস্যা বোঝার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, ইউজিসির কার্যক্রম মেনে বাবা-ছেলের দ্বন্দ্ব সমাধান করা সত্যিকার অর্থেই চ্যালেঞ্জিং। তাদের দ্বন্দ্বে যেন শিক্ষার্থীদের কেউ ভুক্তভোগী না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসটি স্বাভাবিক অবস্থায় আনার সবরকম চেষ্টাই আমাদের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত