বলিভিয়ায় সাত সপ্তাহের অবরোধ প্রত্যাহার, কাটেনি সংকট

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

বলিভিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। সংগৃহীত ছবি

বলিভিয়ায় সাত সপ্তাহের তীব্র সড়ক অবরোধের অবসান হলেও কাটেনি রাজনৈতিক ও বিচারিক সংকট। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল কৃষিশিল্পের অভিজাতদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ ‘আইন ১৭২০’ স্বাক্ষর করেন।

সরকারর দাবি, আদিবাসী কৃষকরা যেন যৌথ জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিতে পারেন- এই উদ্দেশ্যেই এই আইন হয়েছে। তবে আদিবাসী ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ছিল, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্পোরেট ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের পৈতৃক জমি দখল করে নেবে।

তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে এই সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র কৃষক ইউনিয়ন, খনি শ্রমিকদের ফেডারেশন এবং শ্রমিক সংগঠন ‘বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল’ মে ও জুন মাসজুড়ে এই গণবিক্ষোভ ও ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়। পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের সমর্থকেরাও এই আন্দোলনে যোগ দেন।

বিক্ষোভের মুখে গত ১৩ মে প্রেসিডেন্ট পাজ বিতর্কিত আইন বাতিল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, পরের ৬০ দিনের মধ্যে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মত নতুন ভূমি সংস্কার আইন হবে। তবে এতে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। উল্টো আন্দোলনের পরিধি আরও বেড়ে গিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং গত নভেম্বর মাসে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট পাজের পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ নেয়।

বলিভিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। সংগৃহীত ছবি
বলিভিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। সংগৃহীত ছবি

টানা ৫৩ দিন দেশজুড়ে প্রায় ১০০ পয়েন্টে চলা এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রাজধানী লা পাজসহ বলিভিয়ার প্রধান শহরগুলো খাদ্য, জ্বালানি এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট প্যালেস ঘিরে ফেললে ২৫ মে পাজ রাজধানী ছেড়ে ‘সুক্রে’ শহরে সরকারি কার্যক্রম স্থানান্তর করতে বাধ্য হন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০ জুন প্রেসিডেন্ট পাজ দেশজুড়ে ৯০ দিনের জন্য 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করে সাধারণ মানুষের সভা-সমাবেশের অধিকার স্থগিত করেন এবং সেনাবাহিনী নামানোর নির্দেশ দেন। রক্তক্ষয় এড়াতে কৃষক নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস এই আন্দোলনকে ‘সাময়িক স্থগিত’ ঘোষণা করে পিছু হটেন।

সড়কগুলো খুলে দেওয়ার পর বর্তমানে বাস চলাচল শুরু হয়েছে এবং দোকানপাটে ধীরে ধীরে খাদ্যসামগ্রী ফিরতে শুরু করেছে। জরুরি অবস্থার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকার দেশের অর্থনীতি সচল করতে এবং জ্বালানি, খনি ও লিথিয়াম খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন কিছু বিতর্কিত অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব করেছে।

কিন্তু রাস্তা সচল হলেও মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বলপ্রয়োগ করে অবরোধ প্রত্যাহার করানো হলেও বলিভিয়ার গভীর অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি সমস্যা ও শাসনব্যবস্থার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। যেকোনো সময় এই সুপ্ত অসন্তোষ আবারও বড় বিক্ষোভে রূপ নিতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বলিভিয়ার এই গণবিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে দেশটির ভেঙে পড়া বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের অবক্ষয়। বর্তমানে বলিভিয়ার মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ আদালতের ওপর আস্থা রাখেন। কনস্টিটিউশনাল কোর্টে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি মামলা ঝুলে রয়েছে, যেখানে একজন বন্দির আটকাদেশের বৈধতা যাচাই করতেই অন্তত তিন বছর সময় লেগে যায়। তদুপরি, কোরাম সংকটের কারণে সাংবিধানিক আদালত কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা যাচাই করার ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে আইনি পথে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ না থাকায় ক্ষুব্ধ জনগণ দাবি আদায়ে রাজপথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। সংগৃহীত ছবি
বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। সংগৃহীত ছবি

সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বলিভিয়ার বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সাংবিধানিক আদালতের পাঁচজন বিচারক সংবিধান লঙ্ঘন করে তাঁদের মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে নেন। এই বিচারকদের পাশাপাশি অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তাঁরা ঘুষের বিনিময়ে সুবিধামতো মামলা নিষ্পত্তি করতেন। সান্তা ক্রুজ ডি লা সিয়েরার একজন আইনজীবী জানান, বিচারব্যবস্থায় নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞপ্তির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজেই ঘুষ দিতে হয়, যা মামলার গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়।

বিচারক ও আইনজীবীদের মতে, বিচার বিভাগের এই ভঙ্গুর অবস্থার অন্যতম কারণ সম্পদের চরম সংকট। ২০২৪ সালে বলিভিয়া সরকার মোট বাজেটের মাত্র ০ দশমিক ৪৬ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেয়। এই বাজেট সংকটের কারণে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য বিচারিক কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ না পেলে গত ৬ জুলাই থেকে দেশব্যাপী ধর্মঘটের হুমকি দেন।

তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় অর্থ ঢালা অপচয় মাত্র। বিচারব্যবস্থার এই ব্যর্থতা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

Ad 300x250

সম্পর্কিত